Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Friday, 17 Jul 2026 19:55
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

কর্পোরেট সেক্টরে সুসাশন প্রতিষ্ঠায় কোম্পানি সেক্রেটারী (সিএস) অতি আবশ্যকীয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ বলে মনে করেন মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের ডেপুটি কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ জামান এসিএস।

তিনি বলেন, দেশ-বিদেশে ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আগামী দিনে এ পেশার সম্ভাবনা অনেক উজ্জল। আর দেশে পেশাদার কোম্পানি সচিব প্রতিষ্ঠায় ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলেও মনে করেন তিনি। বিনিয়োগবার্তা’র কর্পোরেট ক্যারিয়ারে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে এমন সম্ভাবনার কথাই বলেন তিনি। নিম্নে তার বৃত্ত্বান্ত তুলে ধরা হলো।

জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক অবস্থা:

ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) এর ৭ম সমাবর্তনে চার্টার্ড সেক্রেটারি (সিএস) প্রফেশনের সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন মোহাম্মদ জামান এসিএস। রাজধানীর মিরপুরে জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ জামানের পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার পরানপুর গ্রামে। তাঁর পিতা হাফেজ আব্দুল মোনায়েম এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন এবং গৃহীনি মাতা নাজমা আক্তার। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে জামান সবার বড়। মেঝভাই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পদস্থ কর্মকর্তা এবং ছোট ভাই মোহাম্মদ হাছিব ডাক্তারী পাশ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে বিসিএস ক্যাডার হিসেবে জরুরি বিভাগে ও বোন ফাতেমা আক্তার এমবিবিএস পাশ করে বর্তমানে ইন্টার্ণী করছেন। পারিবারিক জীবনে জামান এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। স্ত্রী ইসফাত আরা ফেরদৌস নর্দার্ণ ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত।

শিক্ষাজীবন:

মোহাম্মদ জামান শিক্ষাগত জীবন শুরু করেন রাজধানী ঢাকার মিরপুরস্থ বশির উদ্দিন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে। এ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি এবং নিউ মডেল ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে বি.কম (পাস) এবং ঢাকা কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে (এম. কম) এবং একই সাথে সরকারী বাংলা কলেজ থেকে একাউন্টিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। পরবর্তীতে ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) থেকে চার্টার্ড সেক্রেটারিজ সদন অর্জন করেন। কর্মক্ষেত্রের সাথে দেশের প্রচলিত আইন যেহেতু সম্পর্কিত, তাই কোম্পানি কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠভাবে সম্পাদন করার জন্য তিনি সেন্ট্রাল ল’কলেজ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন। তারই আলোকে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তিনি ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে এলএলএম ডিগ্রী সম্পন্ন করছেন।

ক্যারিয়ার:

আসার ক্যারিয়ার শুরু হয় মাস্টার্স পড়াকালীন সময়ে একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে। ২০০৮ সালে একটি আন্তর্জাতিক ডেভেলপার কোম্পানিতে ম্যানেজার, একাউন্টস পদে যোগ দেই। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেড এ বোর্ড সেক্রেটারি পদে যোগদান করি। বর্তমানে আমি একই প্রতিষ্ঠানে ডেপুটি কোম্পানি সেক্রেটারি হিসেবে কর্মরত।

পেশাগত ক্ষেত্রে আইসিএসবি’র অর্জন:

আমি আইসিএসবিতে ভর্তি হই ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে এবং শেষ করি ২০১৭ সালের জুন মাসে। এ সময় আমার কর্মস্থলে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। তবে সকলের চোখে ঈর্শ্বান্বিত ছিলাম। সিএস ডিগ্রী অর্জনের ফলে আমার বর্তমান কর্মস্থলে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং বিষয়টিকে আমি এনজয় করছি।

আইসিএসবিতে অধ্যায়নের আগ্রহী হওয়ার কারণ:

আমি মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেডে বোর্ড সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার সুবাদে আইসিএসবিতে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার কাজের গন্ডির মধ্যে যে সকল কাজ রয়েছে তার সাথে মিল রয়েছে। আইসিএসবিতে পড়ার সময় সিলেবাসের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।

কর্পোরেট সেক্টরে আইসিএসবির ভূমিকা:

কর্পোরেট সেক্টরে দেশে এবং দেশের বাইরে সিএস প্রফেশনের মূল্যায়ন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে চাকুরির ক্ষেত্র। সুষ্ঠভাবে একটি কোম্পানি পরিচালনার জন্য কোম্পানি সেক্রেটারির কোন বিকল্প নেই। আর কোম্পানি সেক্রেটারির দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আইসিএসবি’র ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রসংশার দাবিদার। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রাইভেট এবং পাবলিক সকল ক্ষেত্রে কোম্পানি সেক্রেটারি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব ইন্ডিয়া (আইসিএসআই) থেকে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক সুনাম রয়েছে। আমাদের দেশেও এর প্রবণতা ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারিভাবে কোম্পানি আইনের অভ্যন্তরে আইসিএসবি হতে সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ এখতিয়ার প্রদান করা যেতে পারে।

আইসিএসবি’র সফল দিক:

১। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর কর্পোরেট গর্ভনেন্স কোড এ আইসিএসবি’র ভূমিকা অনেক বেশি;

২। বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই এবং আরজেএসসি কর্পোরেট আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আইসিএসবি’র পরামর্শ গ্রহণ করে থাকে;

৩। সেক্রেটারিয়েল স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন এবং তা কর্পোরেট গর্ভনেন্স এ অন্তর্ভূক্তকরণ;

৪। সিপিডি প্রোগ্রামের মাধ্যমে রেগুলেটরদের মাঝে সাড়া জাগানো;

৫। কর্পোরেট গর্ভনেন্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান এবং কর্পোরেট সেক্টরে এর বিশেষ পরিচিতি;

৬। দক্ষ কোম্পানি সেক্রেটারি প্রস্তুতকরণ এবং মেধা বিকাশে আইসিএসবি’র কার্যকরি ভূমিকা;

৭। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আইসিএসবি’র উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের আশ^াস;

৮। পেশাগত উন্নয়নে কর্পোরেট লোকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা;

৯। আইসিএসবি’র মাসিক ও পাক্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করে বিশেষ সুনাম কুঁড়িয়েছে।

আইসিএসবির দুর্বল দিক:

১। আইসিএসবি’র আবাসন সমস্যা দৃশ্যমান;

২। প্রচারণার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে, অন্যান্য ইনস্টিটিটিউটের মতো চাকুরির বাজারে সিএস প্রফেশনে আইসিএসবি তথা এর সদস্যরা নিজেদের তেমনভাবে তুলে ধরতে পারছে না;

৩। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতে প্রাইভেট এবং পাবলিক উভয় সেক্টরে কর্পোরেট গর্ভনেন্স নিশ্চিত করার জন্য সিএস প্রফেশনের লোকদের নিয়োগ রেগুলেটরদের মাধ্যমে আইন করে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সে দিক থেকে আমরা অনেক বেশি পিছিয়ে রয়েছি;

৪। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সিএস প্রফেশনের লোকদের যোগাযোগে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে;

৫। নিজস্ব ভবন না থাকায় আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে আইসিএসবি;

৬। কর্পোরেট গর্ভনেন্স অ্যাওয়ার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির স্বেচ্ছায় ও স্বপ্রণোদিতভাবে অ্যাওয়ার্ডে অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি তার প্রমাণ;

৭। প্রতি বছর আইসিএমএবি এবং আইসিএবি প্রফেশনদের একাউন্টিং প্রফেশনের অগ্রযাত্রার জন্য তারা সারা দেশে বিশাল র‌্যালী, সমাবেশ, আলোচনা সভা ইত্যাদি আয়োজন করে। অন্যদিকে সিএস প্রফেশনের জন্য সেরকম কোন সুযোগ নাই বলে মনে হয়। দিবসটি থাকলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা উদ্্যাপন করা যেতো, যা আইসিএসবি-তে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতো;

৮। অন্যান্য প্রফেশনের প্রতিষ্ঠানে সদস্যদের মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে আন্তরিকতা বৃদ্ধি করার সুযোগ রয়েছে, যেক্ষেত্রে আইসিএসবি পিছিয়ে রয়েছে।

দেশে সিএস প্রফেশনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:

সিএস প্রফেশন অন্যান্য দেশে খুব উচু ও সম্মাজনক পেশা বিশেষ করে অন্যান্য দেশের সরকার কর্পোরেট গর্ভনেন্স নিশ্চিত করার জন্য সিএস প্রফেশনের লোকদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সে তুলনায় আমাদের দেশে এই পেশার ব্যক্তিরা সম্মানজনক চাকুরির ক্ষেত্রে যে পিছিয়ে আছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে আইসিএসবি যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতে করে খুব শীঘ্রই সিএস পেশার ব্যক্তিদের জন্য একটা নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে সক্ষম হবে।

আইসিএসবি সম্পর্কে পরামর্শ:

যদিও এ বিষয়ে আমি নবীন, আমি সদ্য পাস করেছি, তবুও এ বিষয়ে আমার কিছু অভিব্যক্তি রয়েছে- যেমন: আইসিএসবি’র সিলেবাস হওয়া উচিত এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ; শিক্ষাদানের জন্য আরো বেশি অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া জরুরী, যাতে শিক্ষার মান আরো বেশি উন্নত হয়; পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য আরো বেশি দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া দরকার যাতে করে তারা সময় উপযোগী পলিসি তৈরি করে সে আলোকে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন।

আইসিএসবির কর্পোরেট গর্ভনেন্স অ্যাওয়ার্ড সম্পর্কে:

আইসিএসবি’র কর্পোরেট গর্ভনেন্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান বর্তমান কর্পোরেট জগতে একটি অতি পরিচিত বিষয়। কিন্তু আইসিএসবি শুধুমাত্র পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে এই অ্যাওয়ার্ড প্রদান করছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাইরের কোম্পানিকেও এই পুরষ্কারের আওতায় আনলে আইসিএসবি’র সুনাম আরো বৃদ্ধি পাবে। কারণ, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাইরে এমন অনেক কোম্পানি আছে, যারা ব্যবসায়িকভাবে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে এবং আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রেও নিজেদের এগিয়ে রেখেছে। সুতরাং, অ্যাওয়ার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে বিষয়টির প্রতি আইসিএসবি দৃষ্টি দিতে পারে।

এই পেশাকে আরো সম্ভাবনাময় করার জন্য পরামর্শ :

সিএস প্রফেশনের ক্ষেত্রে ৩ মাসের ইন্টার্ণশীপ যথেষ্ট, যদি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থাকে। এর ব্যত্যয় হলে সময় বাড়ানো হলেও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে হয় না। আর আমার মনে হয়, সিএ প্রফেশনের মতো আর্টিক্যালশীপ কোর্স বাধ্যতামূলক করার সময় এখনো হয়নি। কারণ, সিএ পেশার মতো ব্যাপক পরিসরে এখনো সিএস পেশার ফার্ম গড়ে ওঠেনি, যার ফলে আর্টিক্যালসীপ কোর্স করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। সিএস পেশা একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পেশা। বর্হি:বিশ্বের সাথে সাথে বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরে এ পেশার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ, সরকারিভাবে এ পেশার মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে কর্পোরেট সেক্টরে সুসাশন প্রতিষ্ঠায় সিএস একটি অতি আবশ্যকীয় পদ। সুতরাং, আগামী প্রজন্ম এ পেশার প্রতি আগ্রহী হবে বলে মনে করছি।

পরিশেষে বলতে চাই, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর যে সোনার বাংলার স্বপ্ন ছিল, তা বাস্তবায়ন বা পূরণে কাজ করছে আইসিএসবি এবং সিএস প্রফেশনের সদস্যরা।

(শাহরিয়ার/শামীম/ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯)