
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই। এ পরিস্থিতিতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে দেশটির সার্বিক অর্থনীতি। বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা কারখানা ও ক্রেতাহীন বাজার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিকে সংকটে ফেলে দিয়েছে। এরই মধ্যে চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বিশ্বের বহু দেশ। বন্ধ রয়েছে জনপ্রিয় বিনোদন ও ব্যবসা কেন্দ্র। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কেন্দ্র শিল্পসমৃদ্ধ হুবেই প্রদেশ। গত সপ্তাহে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে পূর্বাঞ্চলের শিল্পসমৃদ্ধ এলাকায়, যার মধ্যে রয়েছে টেক জায়ান্ট আলিবাবার শহরও। সব মিলিয়ে চীনের অর্থনৈতিক সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খবর এএফপি
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি বেশ টালমাটাল অবস্থার মধ্যে পড়বে। এরই মধ্যে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতেও বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। মূলত চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে দেশটিতে যে পরিমাণ ব্যবসা হওয়ার কথা ছিল, ভাইরাসের কারণে তা ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। অনেকেই বলছেন, চীনের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব সার্সকেও (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) ছাপিয়ে যেতে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের লুইস কুইজস বলেন, যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তখন চীনের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল। কারণ ওই সময় চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে দেশটিতে প্রচুর পর্যটকের সমাগম হওয়ার কথা ছিল, যা চাঙ্গা করে তুলত দেশটির ব্যবসায়িক যোগাযোগ। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উৎপাদন খাতেও ব্যাপক মন্দা দেখা দেয়। তাছাড়া আগে থেকেই কম বৈদেশিক চাহিদা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলেছিল। এ অবস্থায় চীনের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি সংকটের মধ্যে তো রয়েছেই, একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর ধারাবাহিক প্রভাব পড়বে।
এছাড়া মুডি’সের বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ভাইরাসের প্রভাব চীন ও বিশ্বের দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতির ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করেছে। আপাতত এ বিষয়ে কোনো শুভ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
চীনে নববর্ষের ছুটি উপলক্ষে বহু শিল্প-কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সেগুলো খুলতে দেরি হচ্ছে। কারণ সরকার চাচ্ছে না, সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যে বড় ধরনের জনসমাগম হোক। এ অবস্থায় দেশটির শিল্প উৎপাদন খাত ঝিমিয়ে পড়েছে। অথচ এ খাতের ওপরই চীনের অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশ নির্ভরশীল। এ পরিস্থিতিতে গাড়ি নির্মাণ খাতও বেশ বড় ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে।
গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ডের এক মুখপাত্র বলেন, আগামী সপ্তাহে হয়তো তাদের উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু ভাইরাসের কারণে এরই মধ্যে ভোক্তা চাহিদা বহুলাংশে কমে গেছে।
উহানকেন্দ্রিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডংফেং মোটর করপোরেশন জানায়, তারা কবে নতুন করে উৎপাদন শুরু করবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সবকিছু নির্ভর করছে ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর।
রেটিং এজেন্সি এসঅ্যান্ডপি পূর্বাভাস দিয়েছে, কারখানা খুলতে দেরি হওয়ায় চীনের গাড়ি উৎপাদন অন্তত ২ শতাংশ কমে যাবে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, হুবেই প্রদেশের কারখানাগুলোয় শ্রমিকরা পুনরায় কাজে যোগ দেবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে এ প্রদেশের উহান শহর থেকে। আর এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ২৪ হাজারের মধ্যে অধিকাংশ মূলত এ প্রদেশের।
অক্সফোর্ডের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভাইরাসের কারণে প্রথম প্রান্তিকে চীনের প্রবৃদ্ধি অন্তত শতাংশীয় ২ পয়েন্ট কমে যাবে। এরপর দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ফের চাঙ্গা হবে কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তাছাড়া চলতি বছর দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে দেশটির অর্থনীতি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে অভ্যন্তরীণ ক্রেতাদের কাছ থেকে। গত বছর চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে চীনে খুচরা ও খাদ্য পরিবেশন সংস্থার মোট বিক্রি হয়েছিল ১৫ হাজার কোটি ডলার। অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ থেকে আয় হয়েছিল ৭ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। কিন্তু এর বিপরীতে এবারের নববর্ষে দেশটির শপিং মল, খাবারের দোকান, সিনেমা হল ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো একেবারেই নীরব।
(এসআর /০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০)