
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বড় দুর্ঘটনা কিংবা বিপর্যয়ে অনুদান দিয়ে বিভিন্ন সময় সরকার ও সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে দেখা গেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে। যদিও বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাস সংকটে তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না ব্যাংকগুলোর। নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশও (এবিবি)।
এর আগে কখনই জাতীয় সংকট কিংবা সরকারের কোনো উদ্যোগে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে এমন নির্লিপ্ত হতে দেখা যায়নি। চলতি বছরের শুরুতেও মুজিব বর্ষ উদযাপনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টে ২২৭ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। শীতার্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দিয়েছিল ২৭ লাখ কম্বল। চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের সময় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দিয়েছিল ৩০ কোটি টাকা। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট কিংবা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে শতকোটি টাকা অনুদান দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। এসব তহবিল জোগানোর ক্ষেত্রে সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিল বেসরকারি ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি। যদিও করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংগঠনটি।
জানতে চাইলে বিএবি চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, অতীতে দেশের যেকোনো দুর্যোগে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করেছে। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও আমরা বসে থাকব না। এরই মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে আমি নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছি। দেশের অন্য ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান বা পরিচালকরাও ব্যক্তি পর্যায়ে সাহায্য সহযোগিতা শুরু করেছেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সবাই একত্র হওয়া সম্ভব নয়। এজন্য ভার্চুয়ালি মিটিং করার বিষয়টি আমরা ভাবছি।
এক্সিম ব্যাংকের এ চেয়ারম্যান এও বলেন, দেশের নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ শতভাগ বেকার হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের সব সামর্থ্যবান মানুষ ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের একার পক্ষে সব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছান সম্ভব নয়।
একই অবস্থা ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এবিবিরও। করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি সংগঠনটি থেকে। দুর্যোগ মোকাবেলায় নগদ অর্থ কিংবা মেডিকেল সরঞ্জাম নিয়ে সরকারকে সহায়তার কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় নিজেদের মধ্যে কোনো বৈঠকও করেননি ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা। যদিও করপোরেট কর কমানোর দাবি কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো নীতি স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই এবিবির পক্ষ থেকে ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়া হয়। দলবেঁধে গভর্নরের কাছে ছুটে যান ব্যাংক নির্বাহীরা।
যোগাযোগ করা হলে এবিবি সম্পাদক ও প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাহেল আহমেদ বলেন, করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক ঝড় হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে। এ ঝড়ের ধাক্কা বাংলাদেশে মাত্রই লাগতে শুরু করেছে। ঝড় থামলে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য কী উদ্যোগ নেয়া যায়, তা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে।
করোনাভাইরাস ইস্যুতে এবিবির কোনো বৈঠক এখনো হয়নি বলেও জানান রাহেল আহমেদ। তিনি বলেন, বৈঠক হওয়ার মতো কোনো পরিবেশও বর্তমানে নেই। তবে সবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে।
করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোকে সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের অর্থ ব্যয় করার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সিএসআরের অর্থে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সহযোগিতার কথাও বলা হয় নির্দেশনায়। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তবে বিএবি ও এবিরির তৎপরতা না থাকলেও করোনা সংকট মোকাবেলায় এগিয়ে এসেছেন তরুণ ব্যাংকাররা। এরই মধ্যে তাদের সংগঠন ‘ব্যাংকার্স ক্লাব’-এর পক্ষ থেকে তহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিলে অবসরে যাওয়া ব্যাংকাররাও অনুদান দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশের ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে মোট ৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ৪২৬ কোটি, ২০১৬ সালে ৪৯৬ কোটি, ২০১৭ সালে ৭৪৩ কোটি ও ২০১৮ সালে ৯০৪ কোটি টাকা ব্যয় করে ব্যাংকগুলো। সর্বশেষ ২০১৯ সালে সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় ছিল ৬৪৭ কোটি টাকা।
(এএইচএন/ ২৮ মার্চ, ২০২০)