Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Wednesday, 22 Jul 2026 04:46
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: পহেলা বৈশাখ ও ঈদ এবার প্রায় পিঠাপিঠি। বছরের অন্যতম বড় দুটি উৎসবকে করোনাভাইরাস গিলে ফেলেছে। কারণ, উদ্‌যাপনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফলে, অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে অন্য সব শিল্প খাতের মতো বাংলাদেশের দেশীয় ফ্যাশনশিল্পও চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে বাংলাদেশের দেশীয় ফ্যাশনশিল্প খাত। তীব্র সংকটে পড়বে পাঁচ হাজার উদ্যোক্তা এবং এই শিল্প খাতের ওপর নির্ভরশীল প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ।

বিলীয়মান বৈশাখ
অন্য বছরের মতো এ বছরও বৈশাখের প্রস্তুতি উল্লেখযোগ্য ছিল বলে মন্তব্য করে ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি এবং অঞ্জন’স-এর শীর্ষ নির্বাহী শাহীন আহম্মেদের ব্যাখ্যা, এর দুটো কারণ: এক. এ বছর ঈদ আর বৈশাখের মধ্যে এক মাসের কিছু বেশি ব্যবধান। দুই. বসন্ত, বিজয় দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারির বিক্রি সন্তোষজনক। ফলে বৈশাখ আয়োজনে কেউ কার্পণ্য করেনি।

অন্য বছরে এপ্রিলের এই সময়ে মানুষ মুখিয়ে থাকে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের জন্য, যেখানে নতুন পোশাকের আয়োজন থাকে সবিশেষ গুরুত্বে। ফ্যাশন হাউসগুলোরও তাই ছিল প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি। এমনকি অনেক হাউস মার্চের প্রথম সপ্তাহেই বৈশাখ সংগ্রহ শাখাগুলোয় সাজানো শুরু করে। কিন্তু ৮ মার্চ করোনা রোগী শনাক্তের পর উদ্বেগ ছড়াতে থাকে। ২০ মার্চের মধ্যে বিক্রি নামে গতবারের তুলনায় অর্ধেকে। এর পরের পাঁচ দিনে একেবারে শূন্যে পরিণত হয়। এরপর ২৬ মার্চ থেকে সব শপিং মল, ব্র্যান্ড স্টোর বন্ধ। এ কারণে মার্চেই অন্তত ১২৫ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে বলে জানিয়েছে এফইএবি। এবারের অবরুদ্ধ বৈশাখের উদ্‌যাপনে পোশাক কেনার অবকাশ থাকছে না।

বৈশাখ উপলক্ষে ৩ ও ৪ এপ্রিল ফ্যাশন শো এবং প্রদর্শনীর পরিকল্পনা করে ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশ (এফডিসিবি)। সংস্থার নির্বাহী সদস্য লিপি খন্দকার জানালেন, এফডিসিবির ৪০ জন সদস্যের সবার আউটলেট নেই। কিন্তু প্রত্যেকেরই ছিল প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি। এ কারণে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন প্রত্যেকেই। চট্টগ্রামেও ডিজাইনার ও ফ্যাশন হাউসগুলো মহাসংকটে রয়েছে বলে চট্টগ্রাম ডিজাইনারস কাউন্সিলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

অনিশ্চয়তার ঈদ
অন্যদিকে অবস্থার নিরিখে ঈদ বাজারের কি হাল হবে তা নিয়ে সংগত কারণেই উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা। কারণ, দুটো উৎসবের ব্যবধান মাত্র দেড় মাসের। ফলে বৈশাখের আয় ঈদের পণ্য উৎপাদনে ব্যবহারের সুযোগ এ বছর এমনিতেই ছিল না। উপরন্তু, নিজেদের সঞ্চয়ের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ, এমনকি নানাভাবে সংগৃহীত পুঁজির সবটাই বিনিয়োগ করেন উদ্যোক্তারা। এখন অসমাপ্ত কাজ যেমন থেকে গেছে, তেমনি আটকেছে সম্পূর্ণ পুঁজি।

সমান্তরালে জমছে নানা ব্যয়। বাড়িভাড়া, ইউটিলিটি বিল, ব্যাংকঋণের কিস্তি, কর্মীদের বেতন, প্রোডিউসারদের মজুরি, ভ্যাট–ট্যাক্স; এর সঙ্গে আরও যোগ হবে ঈদের বোনাস। অথচ বিপরীতে আয় শূন্য। পক্ষান্তরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর উৎসব উদ্‌যাপন করার মতো মানসিক অবস্থায় সবাই থাকবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অমিলের অঙ্ক
বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি বৈশিষ্ট্যগতভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে আলাদা। পৃথিবীর অন্য দেশ মৌসুমনির্ভর হলেও এখানে তা মূলত উৎসব আর উপলক্ষ্যভিত্তিক। তা ছাড়া এত বেশি কারুশিল্প এবং লোকশিল্পের পৃষ্ঠপোষণা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর দেশীয় ফ্যাশনশিল্প খাতে হয় না। এখানে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সব কটি বয়নশিল্প (টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, জামদানি, বেনারসি, মণিপুরি, নৃগোষ্ঠীর বয়ন), সূচিশিল্প (নানা ধরনের হ্যান্ড এমব্রয়ডারি), রঞ্জকশিল্প (প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক রঙের শিল্পী কারিগর), ছাপাইশিল্প (স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক প্রিন্ট)। এই শিল্প খাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে আরও যুক্ত রয়েছে মৃৎশিল্প, চামড়াশিল্প, ধাতবশিল্প, অলংকারশিল্প, পাটশিল্পসহ বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী অন্যান্য কারুশিল্প।

এ ছাড়া আছে মেশিন এমব্রয়ডারি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি তৈরি পোশাকশিল্প। কোনো সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সংকট মানে এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব খাতের সার্বিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া। ফলে, ক্ষতির পরিমাণ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয় বলেই মন্তব্য করেন কে ক্র্যাফটের পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান।

দেশের সবচেয়ে বড় লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড আড়ংয়ের হেড অব মার্কেটিং তানভীর হোসেন জানালেন, প্রতিষ্ঠানের গত বছরের টার্নওভার ছিল এক হাজার কোটি টাকা। বৈশাখের বিক্রি থেকে আসে ১০ ভাগ অর্থ; আর ঈদে আসে ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ। অর্থাৎ দুটো উৎসব থেকে আড়ংয়ের আয় অন্তত ৪৫০ কোটি। স্বাভাবিকভাবে এবার এই অঙ্ক আরও বাড়ারই কথা। তবে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলে তাঁরা অনলাইনে বিক্রিতে জোর দিতে চান। সেই পরিকল্পনা চলছে। এমনকি তানভীর জানালেন, সব বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে তাঁদের অনলাইনে বিক্রি আগের তুলনায় অন্তত ১০০ ভাগের বেশি বেড়েছিল।

আড়ংয়ের মোট ৬৫০ জন স্বাধীন প্রোডিউসারের অধীনে অন্তত ৩০ হাজার কর্মী কাজ করেন। এ ছাড়া আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনের ১৪টি শাখায় আছে আরও ২৫ হাজার কর্মী। পাশাপাশি ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সব শাখা আর হেড অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে ৫ হাজার ২০০ জন। নানাভাবেই পরিস্থিতি উতরানোর চেষ্টা করছে এই প্রতিষ্ঠান। এমনকি কারুশিল্পীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন তানভীর।

কে ক্র্যাফট, অঞ্জনস, সাদাকালো, সেইলর, লা রিভ, রঙ বাংলাদেশ, নিপুণ, বিবিয়ানা, বিশ্বরঙ, দেশাল, বাংলার মেলা, ক্যাটস আইসহ আড়ংয়ের পরের সারির ফ্যাশন হাউসের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫। এদের প্রত্যেকের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন অন্তত ৪০০ জন। এ ছাড়া প্রত্যেকেরই আছে ২০০ থেকে ২৫০ প্রোডিউসার ও তাদের চার হাজার কর্মী বাহিনী। এমনকি মাঝারি ও ছোট হাউসগুলোরও আছে প্রয়োজন অনুসারে জনশক্তি।

(এএইচএন/ ১২ এপ্রিল, ২০২০)