
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রেক্ষাপটে সামাজিক দূরত্বের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বৈশ্বিক রোস্তোরাঁ ব্যবসা।
একান্তই ক্রেতানির্ভর এ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী সামাজিক দূরত্ব মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে আদতে তাদের সামনে সর্বস্বান্ত হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ থাকবে না। কারণ এ ব্যবসার টিকে থাকার মূলমন্ত্রই হলো ক্রেতাদের ভিড় ও প্রচুর বিক্রি। খবর সিএনএন বিজনেস।
যেকোনো ব্যবসার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্রেতা চাহিদা। ক্রেতাদের মধ্যে চাহিদা যত বাড়বে, সংশ্লিষ্ট ব্যবসার উন্নতিও তত ত্বরান্বিত হবে। বিশেষ করে রেস্তোরাঁ ব্যবসার জন্য বিষয়টি আরো বেশি সত্য। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী নভেল করোনাভাইরাস এরই মধ্যে রেস্তোরাঁয় বিক্রি প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনেছে। অনেক স্থানে পুনরায় রেস্তোরাঁ খোলার অনুমতি মিললেও জুড়ে দেয়া হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার শর্ত। ব্যবসায়ীদের ঢেলে সাজাতে হচ্ছে তাদের রেস্তোরাঁর আসনসহ পুরো বিন্যাস। অনেক ক্ষেত্রেই আসন কিংবা সেবা প্রদানের সক্ষমতার সীমা নামিয়ে আনতে হচ্ছে এক-চতুর্থাংশে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ২৭ এপ্রিল থেকে পুনরায় রেস্তোরাঁ খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এখানে উদ্যোক্তা রায়ান পার্নিসের রেস্তোরাঁ রয়েছে তিনটি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সুযোগ পেয়েও রায়ান তার একটি রেস্তোরাঁও খোলেননি। ফলে গত ১৬ মার্চ থেকেই বিক্রিশূন্য তার টেবল অ্যান্ড মেইন, ওস্টেরিয়া ম্যাটন ও কোয়ালিশন ফুড অ্যান্ড বেভারেজ। রায়ান মূলত এখনো তার কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু এর সঙ্গে আরো একটি বিষয় তাকে রেস্তোরাঁগুলো চালু করা থেকে বিরত রাখছে। তার মতে, পুনরায় ব্যবসা চালুর শর্ত হিসেবে যে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে, তা মানতে গেলে তিনি কোনো মুনাফা করতে পারবেন না।
রায়ান পার্নিস বলেন, আপনি যদি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রেস্তোরাঁ মালিকদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের ভাষা হয়তো ভিন্ন হবে। কিন্তু তাদের বক্তব্যে কোনো পার্থক্য পাবেন না। সবখানেই বর্তমানে একই অবস্থা বিরাজ করছে। সবাই একই হিসাব কষছেন—সামাজিক দূরত্ব মেনে এ ব্যবসা সম্ভব নয়। কারণ রেস্তোরাঁ ও বারের ক্ষেত্রে সীমিত গুটি কয়েক ক্রেতা নয়, আপনি চাইবেন উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে নেই। বাধ্য হয়ে রায়ান তার ১২০ কর্মীর মধ্যে ৮০ জনকে সাময়িক ছুটিতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন।
শুধু রায়ানের রেস্তোরাঁর কর্মীরাই নন, বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে নেয়া লকডাউন পদক্ষেপের কারণে চাকরি হারিয়েছেন রেস্তোরাঁ ও বারের লাখ লাখ কর্মী। অনেক দেশেই ধীরে ধীরে লকডাউন তুলে নেয়া বা শিথিল করা হচ্ছে। কিন্তু সম্ভাব্য জনসমাগম এড়াতে এক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা হচ্ছে রেস্তোরাঁ ও বার চালু করার বিষয়ে।
এ অবস্থায় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ও ব্যবস্থাপকরা উদ্ভূত পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণ করতে গিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছেন। দীর্ঘদিন টিকে থাকতে হলে তাদের চাই প্রচুর ক্রেতা ও বিক্রি। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব মেনে কীভাবে তা সম্ভব হবে, হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। জর্জিয়ার আরেক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ব্লেইস নোয়াক বলেন, এ ব্যবসার কাঠামোই এমন যে তা সামাজিক দূরত্বের সঙ্গে খাপ খায় না। কারণ এখানে মানুষ দলবেঁধে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে খাবার খেতে আসে। ফলে শুধু খাওয়াই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আছে সম্মিলিত আনন্দ। তাছাড়া সীমিত ক্রেতার কাছে খাবার বিক্রি করে কিংবা সেবা দিয়ে মুনাফা অর্জন সম্ভব নয়। কিন্তু আগে যেখানে প্রতি রাত তার রেস্তোরাঁয় ২০০ জনকে সেবা দেয়ার ব্যবস্থা ছিল, তা এখন ৫০ জনে নামিয়ে আনতে হয়েছে। তবে অনেকেই আছেন, যারা আসলে আর ব্যবসা চালু করার মতো অবস্থায় নেই।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, একই বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছেন ইউরোপের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরাও। ইতালির কয়েক হাজার ব্যবসায়ী সরকারের সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার শর্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। দেশটিতে এ শর্ত মেনে আগামী ১ জুন থেকে রেস্তোরাঁ খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাজ্যের তিন-চতুর্থাংশ বার ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে ব্যবসায় টিকে থাকার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী নন। এ অবস্থায় অনেকেই পুনরায় রেস্তোরাঁ না খোলার বিষয়ে ভাবছেন।
(এসএএম/১৮ মে ২০২০)