
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা: নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় ঝুকিপূর্ণভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অবৈধ গ্যাস সংযোগ গুলোর ফলে যেকোন সময় ঘটতে পারে বড় ধরণের দূর্ঘটনা। দীর্ঘ দিন ধরে সরকার নতুন সংযোগ বন্ধ রাখায় জেলার বিভিন্ন এলাকার লোকজন অনৈতিকভাবে স্থানীয় প্রভাবশালী দালালদের সহায়তায় অবৈধভাবে বাসা-বাড়ীতে গ্যাস সংযোগ নিচ্ছেন। অবৈধ সংযোগ হওয়ায় একটা ঝুকি থেকেই যায়। যার ফলে নারায়নগঞ্জের মত যেকোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা করছে জেলাবাসী।
তিতাস গ্যাস নরসিংদী অফিস সূত্রে জানা যায়, নরসিংদী জেলায় মোট শিল্প-বানিজ্য খাতে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ রয়েছে ৬২৮টি, আবাসিক খাতে বিভিন্ন বাসা-বাড়ীতে গ্যাস সংযোগ রয়েছে ২৭ হাজার ১১৭টি। এছাড়াও জেলায় অবৈধ সংযোগ রয়েছে ৫ হাজারেরও বেশী।
জানা যায়, দীর্ঘ দিন ধরে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন সংযোগের অনুমতি না থাকায় জেলার বিভিন্ন এলাকার লোকজন গ্যাস সংযোগ পেতে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, ঠিকাদার ও লাইনম্যানদের হাত ধরে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে সুবিদা ভোগ করছে। এতে করে ওই মহলটি সরকারকে ফাঁকি দিয়ে প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা।
শুধুমাত্র অবৈধ সংযোগই নয় অনুমতি না পেয়ে অনেকে চোরা (অতিরিক্ত চুলা) সংযোগও ব্যবহার করছে। যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বার বার অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেও এর কোন সুরাহা করতে পারছে না। একদিকে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও কিছুদিন পর পূনরায় তা আগের রূপে ফিরে আসে। তবে বর্তমানে বেশ কয়েক মাস যাবৎ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে তেমন কোন সফল অভিযান বা ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালিত হয়নি। এক কথায় বলা যায় নরসিংদী তিতাস গ্যাস কার্যালয়ের সাবেক উপ মহা ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী তৌহিদুর রহমান এ জেলা ছেড়ে যাওয়ার পর আর কোন ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালিত হয়নি। বর্তমান উপ মহা ব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলাম নরসিংদীতে দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর দুই একটি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও তার নজরে আসার মত নয়।
জানা যায়, নরসিংদীতে অবৈধ সংযোগের হিড়িক পড়ে ২০১৪ সালে।ওই বছরের ৫ নভেম্বর নরসিংদীর ভাটপাড়া এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংয়োগ উচ্ছেদে ভ্রাম্যমান আদালতের উপর এলাকাবাসী হামলা চালায়। সেসময় সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকা সাংবাদিকসহ ভ্রাম্যমান আদালতের সদস্যরা হামলার শিকার হন এবং কয়েকজন সাংবাদিক মারাত্মকভাবে আহত হয়। এছাড়াও সাংবাদিকদের ক্যামেরা ভাংচুর ও মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০১৭ মাধবদীর ভগিরথপুরেও এলাকাবাসীর হামলার শিকার হন ভ্রাম্যমান আদালতে সদস্যরা। এসময় এলাকাবাসী প্রায় দুই ঘন্টা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে রাখে।

অবৈধ সংযোগের উপরের অংশে রাবারের পাইপ এবং নিচে ঘরের ভিতরের প্রবেশ মুখে তা জিআই পাইপে সংযুক্ত করা হয়েছে। রাবারের পাইপ ধারালো জিনিস দিয়ে সহজে কেটে ফেলা যায়। যা গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ।
মঙ্গলবার সরেজমিনে নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকাঘুরে দেখা গেছে, জেলা শহরের সংগীতা মোড়, হাজীপুর, ভরতেরকান্দী, পাঁচদোনা ইউনিয়নের নলুয়া গ্রামের বাবুরবাড়ী এলাকা, পাঁচদোনা বাজারের পশ্চিমপার্শ্ব এলাকা, মাধবদী পৌরসভার বিরামপুর, দড়িপাড়া, মেন্ডতলা, কান্দাপাড়া, কতোয়ালিরচর, আলগী খুসপাড়া (নতুনবাজার), মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিবিরকান্দি, মেনুরকান্দি, দড়িকান্দি, নূরালাপুর ইউনিয়নের ছোট রামচন্দ্রি ও শিমুলেরকান্দি গ্রাম জুড়েই রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। এসময় এলাকাবাসী জানায়, বিরামপুর ও দড়িপাড়া এলাকায় অবৈধ এই সংযোগগুলো নিয়ন্ত্রন করে দড়িপাড়া গ্রামের আতাউল্যাহর ছেলে আয়নাল। সে প্রতি চুলার বিপরীতে মাসে মাসে ৭০০/= টাকা করে নেয়। সম্প্রতি মধাবদী পৌর মেয়র এলাকা পরিদর্শে গেলে তিনি বিষয়টি অবগত হন এবং পরবর্তীতে আয়নালকে পৌরসভায় ডেকে এনে এব্যাপারে শাষিয়ে দেন। পৌর শহরের কান্দাপাড়া নিয়ন্ত্রন করে স্থানীয় কথিত যুবলীগ নেতা মোশারফ ও শৈবাল। কতোয়ালিরচর এলাকাটি নিয়ন্ত্রন করে এলাকার কথিত আওয়ামী লীগ নেত্রী সুফিয়া বেগম। কতোয়ালিরচরের অবৈধ সংযোগগুলো মূলত আলগী খুসপাড়া (নতুন বাজার) এলাকা থেকে সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
এব্যাপারে আয়নালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তবে যেভাবে বিপুল সংখ্যক বাড়ীর কথা বলা হয়। আসলে গুটিকয়েক বাড়ীতে আমরা গ্যাস সংযোগ দিয়েছি। আর টাকা আমার একার পকেটে যায় না। স্থানীয় কমিশনারের হাত দিয়েই সবাইকেই দেওয়া হয়।
মহিষাশুড়া ইউনিয়নবাসী জানায়, বিবিরকান্দিতে আসাদুজ্জামান মিয়ার একটি কাপড়ের মিল ও মেনুরকান্দি এলাকায় হাজী জলিল মিয়ার মালিকানাধিন লাকী ড্রাইং মিলে সরকারীভাবে গ্যাস সংযোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। মাধবদী থেকে বিবিরকান্দি ও মিনুরকান্দি এলাকার এই দুইটি মিলে মোটা পাইপ দ্বারা প্রধান সংযোগ লাইন টানা হয়। সেই সংযোগ লাইনের দড়িকান্দি ব্রীজের নিচ থেকে অবৈধ সংযোগের লাইনগুলো দেয়া হয়।
এব্যাপারে লাকি ডাইং মিলে উপস্থিত হয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান হাবিবের কাছে গ্যাসে চাপ সঠিক ভাবে তারা পাচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, তাদের ড্রাইং মিলে গ্যাসের চাপ পূর্বের মতই আছে। গ্যাসের চাপের কোন ঘাটতি তারা অনুভব করছেনা। অবৈধ সংযোগগুলো তাদের মেইন লাইন থেকে নয় বরং পুরাতন সংযোগ লাইন থেকে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন বলে জানান।
মাধবদীর মহিয়াশুড়া ইউনিয়নের বিবিরকান্দি গ্রাম ঘুরে বিভিন্ন বাসা-বাড়ীতে ঝুকিপূর্ণ অবৈধ গ্যাস সংযোগ নজরে আসে এই প্রতিবেদকের। সংযোগগুলো এতোই ঝুকিপূর্ণ যে ধারালো কিছুর ছোয়া লাগলেই যেকোন সময় বড় ধরণের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তিতাস গ্যাস নরসিংদী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক শাকিলুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তবে জেলাব্যাপী অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিছিন্ন করার অভিযান খুব শীঘ্রই শুরু হবে। তাছাড়া আমাদের জানা মতে যে সকল অবৈধ গ্রাহক রয়েছে খবর পাওয়া মাত্র আমরা বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি।
(এসএইচআর/এসএএম/৮ সেপ্টেম্বর ২০২০)