
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা: বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ঘরোয়া টি-২০ আসর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) কে ঘিরে নরসিংদীতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাজিকররা। চা স্টল থেকে শুরু করে বিলাস বহুল হোটেলেও চলছে হরদম বাজি। ‘আইপিএল জুয়া’এখন ছড়িয়ে পড়েছে জেলার গ্রামেগুলোতেও। একে কেউ কেউ বলে টাকা লাগানো। আবার কেউ বলেন বাজি। ম্যাচের ফলাফল বাজি, ওভার বাজি, রান বাজিসহ বিভিন্ন ধরনের জুয়াবাজির ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেকেই।
আইপিএল খেলা চলাকালে রাস্তার মোড়ের দোকানগুলোতে ভালোভাবে চোখ রাখলেই দেখা যায়, সেখানে চলছে বাজির দর কষাকষি। তবে যারা বাজি ধরে তাদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছর।
জানা যায়, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ক্রিকেটে সারা নরসিংদীতে রমরমা জুয়া খেলা চলছে। জুয়া আর নেশা একই সূত্রে গাথা দুটি ধ্বংসলীলা। বিপিএল কিংবা আইপিএলের মত স্বল্প সময়ের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলার আসরের শুরুতে সেই জুয়ার নেশা মহামারী আকার ধারণ করে।
আইপিএলকে কেন্দ্র নরসিংদী শহরের ভেলানগর, ব্রাহ্মন্দী, বৌয়াকুর, বানিয়াছল, পশ্চিম কান্দা পাড়া, বাসাইল, নরসিংদী বড় বাজার, মধ্য কান্দা পাড়া, দত্তপাড়া, কাউরিয়াপাড়া, সাটিরপাড়া, ইউএমসি মিল গেইট এলাকাসহ সর্বত্র চলছে আইপিএল এর রমরমা জুয়া।
শুধু জেলা শহর নয় জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন মোড়ের দোকানগুলোতে চলছে জুয়ার বাজি। দলগত হার-জিত নির্ধারণ ছাড়া পাশাপাশি চলছে ওভার বা ‘বল বাই বল’ বাজি। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বাজিকররা মাঠে গিয়ে বাজি ধরেন; কিন্তু আমাদের দেশে জুয়াড়িরা বাজি ধরেন টিভির স্ক্রিনে খেলা দেখে।
সরেজমিন আইপিএলের একটি খেলা চলাকালে ভেলানগর এলাকার একাধিক চায়ের দোকানে গেলে দেখা যায় উপচেপড়া ভিড়। লক্ষ্য করতে বোঝা যায় বাজির দর কষাকষি এবং দেখা যায় টাকা হাতবদলের দৃশ্য। অনেক রিকশা চালককেও এমন জুয়ায় মাততে দেখা গেছে।
এদিকে শহর ও গ্রামে গড়ে উঠেছে জুয়ার বাজির ডিলার। এ ডিলাররাই মূলত বাজি নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন ম্যাচকে ঘিরে ডিলাররা জুয়ার একটা রেট দিয়ে দেন। ম্যাচটি যদি সমান সমান কোনো দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় সে ক্ষেত্রে বাজির দরের হেরফের হবে ২০০ টাকা পর্যন্ত। আর শক্তিশালী দলের সঙ্গে দুর্বল দলের খেলা হলে বাজির দরের হেরফের নিম্নে ৫০০ টাকা থেকে কয়েকগুণ বেশি হয়ে থাকে। ডিলার যত বেশি বেশি ম্যাচের ডিল করে দিতে পারবেন তার লাভের অঙ্কটা তত বেশি। যে সব ডিলার লাখ লাখ টাকা ডিল করেন তাদের আবার থাকে কয়েকজন সাব-ডিলার। এরা মূলত ডিলারের কাছে কয়েকটি ম্যাচের ডিল নিয়ে তা মাঠ পর্যায়ে দিয়ে দেন।
জুয়ার ধরন সম্পর্কে ধারণা দিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জুয়াড়ি জানান, কোনো ম্যাচে বাজির রেট ১৫-২০। অর্থাৎ কেউ যদি শক্তিশালী দল নিতে চান তাহলে তাকে ১ হাজার টাকা জিততে হলে ২ হাজার টাকা খাটাতে হবে। অন্যদিকে কেউ অপেক্ষাকৃত কম শক্তির দল নিলে সে ১ হাজার টাকা খাটিয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা জিততে পারবেন। এই যে মাঝখানে ৫০০ টাকার হেরফের এটাই মূলত ডিলারের লাভ। তিনি শুধু বাজি ধরিয়ে দিয়েই ৫০০ টাকা লাভ করছেন। ডিলারদের লাভ সবচেয়ে বেশি হয় ছোট দল জিতলে। আর বড় দল জিতলেও কোনো লোকসান নেই, কেননা বাজির নিয়ম অনুযায়ী, জয়ী বাজিকরের কাছ থেকে প্রতি হাজারে পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা কেটে নেন ডিলার।
জুয়া নামক নেশার কবলে পড়ে মানুষজন তাদের ঘর-সংসার সব খুয়াচ্ছে। জুয়ার নেশায় মত্ত ব্যক্তি ঘরের সম্পদ বিক্রি করেও বাজিতে টাকা লাগিয়েছে। ফলে সামাজিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে হুমকির মধ্যে পরছে ।
এদিকে জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। পথে বসেছে অনেক পরিবারে সদস্যরা। আর জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে অনেক অপরাধও সংগঠিত হয়েছে। বিশেষ করে জুয়ার টাকা লেনদেন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে নানা অঘটন ঘটেছে। আর সেই অঘটনে হাতাহাতি থেকে শুরু করে মারামারি, হামলা-মামলায় এমনকি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আইপিএল জুয়াকে কেন্দ্র করে যে কোন সময় বড় ধরণের অঘটন ঘটতে পারে বলে মনে করেন জেলার সচেতন মহল।
এ বিষয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব দত্ত বলেন, নরসিংদীর কোথায় আইপিএল জুয়া চলছে এবিষয়ে আমাদের কাছে এখনও কোন ইনফমেশন নেই। এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে । অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে ।
(এসএইচআর/এসএএম/২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০)