
নিজস্ব প্রতিবেদক,বিনিয়োগবার্তা : নরসিংদী রায়পুরা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জোনায়েদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম,ঘুষ ও বদলী বানিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর শিক্ষা কর্মকর্তার ওই সকল অনিয়মের সহযোগী হিসেবে উপজেলার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ইসহাক মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮ জন প্রধান শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ এনে প্রথমে জেলা প্রশাসক পরবর্তীতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সচিব এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগে বলা হয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নব নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সুবিদাজনক জায়গায় পদায়ন করে দেবে বলে তাদের কাছ থেকে ইসহাক মিয়ার সহযোগিতায় মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। সহকারী বদলীর নীতিমালাকে তোয়াক্কা না করে শিক্ষকদের প্রতিস্থাপন বদলীর আদেশ জারী করেন। জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের টাইম স্কেলের নামে বেতন নির্ধারনের বকেয়া বেতন প্রাপ্য বেতনের ৫০% অর্থ ঘুষের বিনিময়ে প্রদান করেন। প্রতিটি বিদ্যালয়ের স্লিপ ফান্ড থেকে ৪ হাজার টাকা করে মোট ৮ লাখ টাকা জোর পূর্বক শিক্ষকদের কাছ থেকে আদায় করেন ওই শিক্ষা কর্মকর্তা। ওয়াস ব্লকের বরাদ্ধকৃত টাকা হতে ২ হাজার টাকা এবং রুটিন মেইন্টেইন্স বাদ ৩ হাজার টাকা করে আদায় করেছেন। ক্ষুদ্র মেরামত বাবদ বরাদ্ধকৃত টাকা ১৫% হারে আদায় করে নিচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। বিনামূল্যে বিতরণকৃত বই প্রাপ্তির জন্য কিন্ডার গার্ডেন প্রতি ৫ শ’ টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে ওই দূর্নিতীবাজ কর্মকর্তাদ্বয়। কাব, স্কাউট, ও ক্ষুদে ডাত্তারদের পোশাক তৈরী করার বিধান স্কুল কর্তৃপক্ষের থাকলেও ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্য হাসিল করার স্বার্থে বিদ্যালয় প্রতি পোশাক প্রদানের নামে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে নিয়ে নিম্ন মানের পোশাক সরবরাহ করছে। ওয়ানডে ওয়ান ওয়ার্ড খাতা প্রতিটি বিদ্যালয়ে জোর পূর্বক চাপিয়ে দিয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা অংকের কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছে। এছাড়াও অনৈতিকভাবে বদলীয় বানিজ্যে লিপ্ত থেকে টাকার পাহাড় গড়ছে ওই দুই অসাধু কর্মকর্তা।
অভিযোগকারীরা এসকল অভিযোগ এনে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগকে দূর্নীতির রাহু মুক্ত করতে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারী জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দাখিল করেন। এতে কোন কাজ না হওয়ায় ২৭ ফেব্রুয়ারী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সচিব বরাবর অভিযোগ করেন। অভিযোগের কয়েকদিন পর করোনা পরিস্থিতির কারণে সারাদেশ লকডাউনের আওতায় চলে আসলে প্রত্যেকটি দপ্তরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। লকডউনে সারাদেশ অচল হয়ে থাকলেও রায়পুরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জোনায়েদ ও তার সহযোগী সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ইসহাক মিয়ার দূর্নীতি ও বদলী বানিজ্য থেমে থাকেনি। ওই সময়ে তাদের বদলী বানিজ্যের মধ্যে সবার নজরে আসে ৩ নং নজরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সাবিকুনাহারের বদলী হয়ে আসার বিয়য়টি। ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোসা: ফরিদা বেগম চাকুরী মেয়াদকাল শেষ করে পিআরএলে যান ৩ মে অথচ মার্চ মাসে তার পদকে শূণ্য দেখিয়ে শিবপুর উপজেলার শিপুলিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সাবিকুনাহারকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ওই পদে পদায়িত করা জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর প্রস্তাবনা পাঠায়। তারই প্রেক্ষিতে ২৫ মার্চ ৫৯০ নং স্বারকে সাবিকুনাহারকে ফরিদা বেগমের স্থলে পদায়িত করে আদেশ জারি করেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। একজন পদে থাকা অবস্থায় ওই পদকে শূন্য দেখিয়ে অপর আরেকজনকে পদায়িত করার বিষয়টি করোনা পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহন করেছেন বলে মনে করছেন উপজেলার শিক্ষক মহল। তাই বিষয়টি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের নজররে আনতে মহা পরিচালক বরাবর আরেকটি অভিযোগ দাখিল করেন শিক্ষকরা। অভিযোগের প্রেক্ষিতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তদন্তের নির্দেশনা দেয়। চলতি মাসের ১ অক্টোবর ওই তদন্ত হওয়ার কথা থাকলেও অসাধু কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জোনায়েদ অধিদপ্তরে উপস্থিত হয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তা বাতিল করেন।
জানা যায়, দেশের করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা না হলেও সরকারী দপ্তরগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে আসায় শিক্ষকদের অভিযোগের তদন্ত করতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাাসরিন আক্তারকে দায়িত্ব দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়। তিনি গত ১৪ সেপ্টেম্বর অভিযোগের তদন্তে এসে অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য শুনেন।
এদিকে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্ত নিরপেক্ষ হবে না বলে দাবী করছেন অভিযোগকারী প্রধান শিক্ষকগণ। তারা মনে করেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অধিনস্থ সহকর্মী হওয়ায় তার কৃতকর্মের ফল অনেকটাই জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার উপর বর্তায়। সে কারণে উপজেলা কর্মকর্তার দোষক্রটিগুলো জেলা কর্মকর্তা ঢাকতে চেষ্টা করবেন বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। তাছাড়া সাবিকুনাহার বদলীর বিষয়ে জেলা কর্মকর্তা সম্পৃক্ত থাকতে পারেন বলে তারা মনে করছেন। কেননা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা প্রস্তাবনা পাঠানোর পর এ বিষয়ে খতিয়ে না দেখে তড়িগড়ি করে লক ডাউনের ঠিক আগের পদায়নের আদেশ জারি করেন। তাই তারা মন্ত্রনালয়ের কোন কর্মকর্তা দ্বারা বিষয়টি পূন:তদন্তের দাবী করেন।
অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে উপজেলার সাধারণ শিক্ষকদের সাথে কথা বলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার অনেকগুলো অনিয়ম ও দূর্নীতির সত্যতা মেলে। এছাড়া সরেজমিনে শিক্ষকদের কাছ থেকে আরও নতুন কিছু অভিযোগও পায় এ প্রতিবেদক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন বাবদ কোন অর্থ আদায়ের বিধান না থাকলেও ওই অসাধু কর্মকর্তাদ্বয় বাধ্যতামূলক ৫০ টাকা করে আদায় করছে। এছাড়া জানা যায়, সকল কাজে ওই দুই শিক্ষা কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত না হয়ে মাঠ পর্যায়ে কয়েকজন দালাল শিক্ষকদের দিয়ে অপকর্মগুলো করিয়ে থাকেন। তাদের মধ্যে মধ্যপাড়া আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: জাকারিয়া অন্যতম।
এ ব্যাপারে রায়পুরা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জোনায়েদের সাথে যোগাযোগ করলে তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো মিথ্যা বানোয়াট বলে উল্লেখ করেন। পরে জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের টাইম স্কেলের নামে বেতন নির্ধারনের বকেয়া বেতন প্রদানের বিষয়টি এই প্রতিবেদক জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রনালয় একটি পরিপত্র জারি করেছেন যার বলেই তাদেরকে টাইম স্কেল প্রদান করা হয়েছে। সাবিকুনাহারের বিষয়টি টেনে এনে কিভাবে মে মাসে পিআরএলে যাওয়া ফরিদা বেগমের পদটি শূণ্য দেখিয়ে ওই পদে মার্চ মাসে সাবিকুনাহারকে পদায়িত করা হয়েছে তা জানতে চাইলে প্রথমে তিনি কোন সদোত্তর দিতে না পারলেও পরে বলেন, আসলে বদলীর আদেশ আমি দেইনা। শূন্য পদের বিষয়ে জেলা অফিসকে আমাদের অবহিত করতে হয়। আর সে কারণে শূণ্য হবে উল্লেখ করে আমরা প্রস্তাবনা পাঠিয়ে ছিলাম। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ওই পদে বদলীর আদেশ জারি করেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে বদলী বানিজ্যের এ সুযোগ নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। টাইম স্কেলে সুবিদা প্রাপ্ত ১৪ জন শিক্ষকদের বকেয়া বেতন হিসেবে প্রায় যে ১ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে, তাদের টাইম স্কেল অবৈধ উল্লেখ করে অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য ১২ আগস্ট নোটিশ জারি করে অর্থ মন্ত্রনালয়। প্রায় দেড় মাসেও সে অর্থ আদায় না হওয়ায় ২৪ সেপ্টেম্বর পূণরায় আদেশ জারি করা হয়, বিষয়টি জানতে পরবর্তীতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, নোটিশের প্রেক্ষিতে টাইম স্কেল প্রাপ্ত শিক্ষকরা হাইকোর্টে রিট করেছেন। তাদের রিটে জবাবে হাইকোর্ট কেন অর্থ ফেরত চাওয়া হয়েছে অর্থ মন্ত্রানালয়কে তার কারণ দর্শানো জন্য এবং ছয় মাসের জন্য অর্থফেরতের বিষয় স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেন।
এ সময় সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ইসহাক মিয়া তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাদের উপজেলা কর্মকর্তা একজন সৎ ও ন্যায়-নীতিবান। তিনি সৎ বলেই তার বিরুদ্ধে এসকল অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিন আক্তারের যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ৩ নং নজরপুর স্কুলের ওই পদটি শূণ্য ছিল, তা আমি জানতাম না।
(এসএইচআর/এসআর/১২ অক্টোবর ২০২০)