
ড: মিহির কুমার রায়: কোভিড-১৯ সংক্রমনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা, উত্তরন এবং ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, রুপকল্প ২০২১, এসডিজি ২০৩০ বাস্তবায়ন ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ এর লক্ষ্য সামনে রেখে যথাক্রমে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে উত্তরনের অনুসঙ্গ হিসাবে, যেখানে উচ্চ প্রবৃদ্ধি (৮.২%), মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশ, জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে বিনিয়োগের হার ৩৩.৫৪ শতাংশ, ইত্যাদি ধরে বর্তমান বছরের বাজেট ঘোষনা করেছে সরকার। কিন্তু কোভিড-১৯ সংকট উত্তরন বর্তমান বছরে সম্ভব কিনা এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্লোবাল ইকোনমিক প্রস্পেক্টাস ২০২০ প্রকাশ করেছে, যাতে বলা হয়েছে ৮০ বছরের মধ্যে সমচেয়ে বেশী মন্দায় পড়বে বিশ্ব, ৭ থেকে ১০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্রতায় পতিত হবে এবং বর্তমান বছর বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৬ শতাংশ হতে পারে। তবে আমরা কিছুটা আশাবাদি হতে পারি যে, যেহেতু গত জানুয়ারী পর্যন্ত দেশে ভাল প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেহেতু বছর শেষে ৩০ জুন, ২০২০ পর্যন্ত আশাপ্রদ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.২৪% । সেই হিসাবে প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৮ শতাংশ এবং গেল বছরের তুলনায় প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা বেশী, আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা – যা জিডিপির ১১.৯১ শতাংশ ও ঘাটতি দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির ৫.৫ শতাংশ, উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা আর অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা এবং জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩১ লাখ ৭১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সাম্প্রতিককালে রাজস্বনীতিতে অনেক সংস্কার সাধন করেছে সরকার। যার মধ্যে কর ব্যবস্থাপনা অন্যতম, যেমন – মূল্য সংযোজন কর (মুসক) ব্যবস্থার বাস্তবায়ন, কর আপাতন হ্রাস করন, মুসকের পরিধি বৃদ্ধি ও সম্পোরক শুল্ক আরোপ (উৎস : জাতীয় রাজস্ব বোর্ড)। এরই মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে আয়কর রহিত সীমা ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, সাধারন কর দাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ টাকা, মহিলা ও সিনিয়র সিটিজেন কর দাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা/প্রতিবন্ধী/উপজাতীদের জন্য করসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ক্ষুদ্র করদাতাদের সুবিধার্থে ৫ হাজার টাকার পরিবর্তে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার বিধান করা হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে করদাতাদের সুবিধার্থে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং পাশাপাশি আয়কর মেলারও আয়োজন রয়েছে। এই সকল উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো নেয়ার উদ্দেশ্য হলো সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ঘাটতি বাজেট কমানো ও আয়-ব্যয়ের মধ্যে সুষ্ঠ্য সমন্বয় সাধন করা।
এখন সামষ্টিক অর্থনীতির বিবেচনায় রাজস্বনীতি কতটুকু প্রভাব রাখছে তা নিয়ে আলোচনা যা সরকারের গত জুন মাসে মহান জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ এর বাজেট উপস্থাপনার সাথে সম্পৃক্ত। বর্তমান অর্থবছরের পাঁচ মাস অতিবাহিত হতে চলছে এবং এই সময়ে সরকারের প্রকৃত আয-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশিত না হলেও সরকারের গত জুনের ঘোষিত বাজেটে যে প্রাক্কলন করা হয়েছে তাতে দেখা যায় যে, মোট আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা (যা জি,ডি,পি এর ১১.৯১%) যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ( এন,বি,আর) নিয়ন্ত্রিত কর কাঠামো থেকে আসবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, এন,বি,আর বহির্ভূত কর কাঠামো থেকে আসবে ১৫ হাজার কোটি টাকা, কর বহির্ভূত কাঠামো থেকে আসবে ৩৩ হাজার কোটি টাকা, বাজেট ঘাটতি দেখানো হয়েচে ১ লাথ ৯০ হাজার কোটি টাকা (যা জি,ডি,পি এর ৫.৫%), উন্নয়ন বাজেট দেখানো হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ টাকা (যা জি,ডি,পি এর ৬.৮%) যার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী ( এ,ডি,পি) খাতে বরাদ্দ ধরা আছে ২ লাখ ৫ হাজার ১ শত ৮৫ কোটি টাকা (যা জি,ডি,পি এর ৬.৫%) ও অনান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৭ শত ৬৭ কোটি টাকা (যা জি,ডি,পি এর ১.৩%)। এখন প্রশ্ন আসে এই বিশাল অংকের ঘাটতি বাজেট কোন উৎস থেকে পূরন করা হবে ? বাজেট ঘোষনায় বলা হয়েছিল বৈদেশিক সাহায্য থেকে আসবে ৮০ হাজার ১৭ কোটি টাকা (যা জি,ডি,পি এর ২.৫%), আভ্যন্তরীন উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা (যা জি,ডি,পি এর ৩.৫%) যার মধ্যে ব্যাংকিং উৎস থেকে আসবে ৮৪ হাজার ৯ শত ৮০ কোটি টাকা (যা জি,ডি,পি এর ২.৭%)। এখন আসা যাক রাজস্ব আদায়ের টার্গেট নিয়ে। যার সাথে রাজস্বনীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির সম্পর্ক রয়েছে।
এখন আমরা যদি ২০২০-২১ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর, ২০২০ মাস পর্যন্ত রাজস্ব আহরনের বিবরণী (সাময়িক) পর্যালোচনা করি তা হলে দেখা যায় যে, বর্তমান আর্থিক বছরে রাজস্ব আদায়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর, ২০ পর্যন্ত ৬৩,৭১৩.৭৯ কোটি টাকার টার্গেটের বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৪৯,৯৮,৯ ৭২ কোটি টাকা (৭৮.৪৬%)। এতে দেখা যায় যে, এই সময়ে রাজস্ব আহরনের প্রবৃদ্ধির হার ৪.১১% যা গত বছরে একি সময়ে ছিল ৩.৯৮ শতাংশ এবং লক্ষ্য মাত্রার তুলনায় ঘাটতি ছিল ১৩ হাজার ৭ শত ২৪ কোটি টাকা। আবার যদি খাতওয়ারি রাজস্বের আহরন বিশ্লেষন করি তা হলে দেখা যায় যে আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা আর্জিত হয়েছে সেপ্টেম্বর, ২০ পর্যন্ত ৭৩.১৮% (লক্ষ্য মাত্রার তুলনায় ঘাটতি ৫৮৪৭.৮২ কোটি টাকা), স্থানীয় মুসক থেকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিতের হার একই সময়ে ৭৮.০৮% (লক্ষ্য মাত্রার তুলনায় ঘাটতি ৫০৮৫.৬৭ কোটি টাকা) আর আয়কর ও ভ্রমন কর থেকে লক্ষ্যমাত্রা আর্জিত হয়েছে সেপ্টেম্বর, ২০ পর্যন্ত ৮৫.০৯% (লক্ষ্য মাত্রার তুলনায় ঘাটতি ২৭৯০.৫৭ কোটি টাকা)। গত বছর একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৯৮%, যার মধ্যে কাস্টমসে প্রবৃদ্ধি ছিল -১৩২%, মুসক ২.১৩% এবং অয়কর ১২.৩৩%।
এনবিআরের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক গতি আসছে। তবে ভ্যাট আদায় আগের পর্যায়ে রয়ে গেছে। মহামারিকালে মানুষের আয়-উপার্জন কম হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য কমে গেছে, আমদানিও কমে গেছে, তাহলে ট্যাক্স আসবে কোত্থেকে? দোকানপাটে বিক্রি নেই, ফলে ভ্যাট আদায়ও কম। যার প্রতিফলন ঘটেছে কর আদায়ে। যেমন ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত হিসেবে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। সেই হিসেবে অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ১১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রথম ৩ মাসে রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি ৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ে আয়কর ও আমদানি-রপ্তানিতে গতি ফিরতে শুরু করলেও বেহাল দশা ভ্যাট আদায়ে। লাখ লাখ প্রতিষ্ঠান রাজধানীতে ব্যবসা করলেও ভ্যাট নিবন্ধন হাতেগোনা। যার কারণে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেশি হলেও আদায় কম। করদাতাদের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করার জন্য ইএফডি কার্যক্রম চালুর কথা থাকলেও বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে চলছে কার্যক্রম। এতে ভ্যাট আদায়ের গতি ক্রমশ কমছে। এছাড়া চেইন সুপার শপগুলোর ভ্যাট আদায় নিশ্চিত করতে সেলস ডাটা কন্ট্রোল (এসডিসি) বসানোর পরিকল্পনা থাকলেও এই কার্যক্রমে যেতে পারেনি এনবিআর। এছাড়া কাগজে-কলমে হেল্পলাইন চালু হলেও এর অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। একজন ভ্যাটদাতাকে ভ্যাট রিটার্ন দেয়ার জন্য অনলাইনে আবেদন করলে এনবিআর থেকে তাকে পাসওয়ার্ড নিতে হয়। আর হেল্পলাইনে ফোন দিয়ে পাসওয়ার্ড নিতেই নতুন করে করদাতার পরিচয়সহ নানা জটিলতা পোহাতে হয়। এই কারণে অনলাইন ভ্যাট রিটার্নে আগ্রহ নেই অনেকের। ডিজিটাল এনবিআরের লক্ষ্যে ডাটা সেন্টারসহ অনেক প্রকল্প চালু হলেও নির্ভেজাল সেবা পেতে নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয় করদাতাদের।
কর আদায়ের আরও একটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হলো করমেলা যা বর্তমান বছরে আয়োজনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে যার কারন করোনার (কভিড-১৯) মহামারী। অথচ গতবছর এই মেলা ১৪ই নভেম্বর থেকে ২০ই নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যার শ্লোগান ছিল আয়কর প্রবৃদ্ধি- দেশ ও দশের সমৃদ্ধি। যেখানে এক সপ্তাহের এই করমেলায় ৬,৪২০ জন করদাতা ৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার সমপরিমান কর প্রদান করেছে, ১৮ লাখ ৬৩ হাজার করদাতা এই মেলা থেকে সেবা নিয়েছিল। যার মধ্যে কর রিটার্ন জমা দিয়েছে ৬ লাখ ৫৫ হাজার জন, নুতন ই-টিন নিয়েছে ৩২ হাজার ৯৬১ জন ইত্যাদি্। এথেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে দেশের করযোগ্য মানুষ কর দিতে চায় কিন্তু কর বান্ধব একটি নিরাপদ পরিবেশ পায় না যা বর্তমান সরকার বিগত ২০১০ সাল থেকে চালু করে ধারাবাহিক ভাবে ক্ষমতায় আসীন থাকায় তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে যা, এই সরকারের একটি বিরাট সাফল্য বলা যায়। বর্তমান নীতির ফলে সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করের আওতায় এসেছে এবং দেশের শ্রেষ্ঠ করদাতাদেরও পুরস্কৃত করা হয়েছে। এই পরিবেশ বজায় রাখা গেলে দেশে কর কম্প্লায়েন্স দিন দিন বাড়বে, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋন নেয়ার প্রবনতা কমবে ও কর-জিডিপির অনুপাত বাড়বে। আমরা যদি সামস্টিক অর্থনীতির আলোকে বিষয়টিকে বিশ্লেষন করি তা হলে দেখা যায যে রাজস্ব আদায়ে প্রত্যক্ষ করের অংশ বাড়ছে যা বর্তমান বছরের বাজেটে ধরা হয়েছে ৩৩% যা কভিড-১৯ এর কারনে বাধা গ্রস্থ হবে তা সহজেই অনুমেয়, যাতে এই বছরটি হয়ত সরকারের রাজস্ব ঘাটতির আরও একটি বড় কারন হতে পারে। সার্বিক রাজস্ব আদায়ে পরোক্ষ কর- যেমন মুসক এর অংশ ৩৭% ও আশুকের অংশ ৩০%। যাতে দেশে কর-জিডিপি এর অনুপাত তুলনামুলক ভাবে কম হলেও প্রতি বছর রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে । সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী আগামী দুই বছরের মধ্যে কর-জিডিপি এর অনুপাত ১০% থেকে বেড়ে ১৮% এ উন্নীত হবে। মোট কর রাজস্বে আয়করের অবস্থার ক্রমান্বয়ে উন্নতি হচ্ছে যা আরও গতিশীল হওয়া বাঞ্চনীয়। কারন বিম্বের বিভিন্ন দেশে আযকর আদায়ের হার সমধর্মী অন্যান্য কর শ্রেনীর চেয়ে অনেক অগ্রগামী এবং প্রত্যক্ষ করের প্রাধান্য সবসময় বেশি।
এমতাবস্থায় আমাদের রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়া কোন গতি নেই। যার জন্য প্রয়োজন :- ১. বর্তমান বছরে আয়কর মেলার আয়োজন করা, করোনা মহামারীর সকল বিধি বিধান মেনে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর হস্থক্ষেপ ছাড়া তা সম্ভব হবে না। ঢাকা শহর সহ দেশের বিভাগীয়/জেলা/উপজেলা শহর গুলোতে যে সকল বিস্তৃত খেলার মাঠ রয়েছে সে গুলোতে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে অনায়াসেই তা করা যায়। যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর কর্মকর্তাগন কঠোর পরিশ্রম করতে সম্মত হয়। দেশের আয়করদাতা ও আয়কর উভয়ই বাড়বে যা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন; ২. টিন ধারীদের অবশ্যই নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং প্রতি বছর একটি নির্দ্দিষ্ট হারে ফি জমা দিয়ে তা নবায়ন করতে হবে। যারা এই নিয়ম বর্হির্ভূত আচরন করবে তাদের বিরুদ্ধে আয়কর অধ্যাদেশ আইনে বিচার গ্রহনে সচেষ্ট হতে হবে। অপরদিকে জাতী গঠনে জনগনের প্রদেয় করের যে ভূমিকা রয়েছে তা বিভিন্ন মাধ্যমে বোঝাতে হবে বিস্তারিত ভাবে। কর মেলাই আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে করের প্রতি জনগন কতটুকু সংবেদনশীল। যদি তারা সেরকম পরিবেশ পায়; ৩. অন্যান্য বারের মত এ বছরেও শ্রেষ্ঠ করদাতাদের পুরস্কৃৃত করার ব্যবস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করতে পারে যা স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে করা হয়েছে। এতে ভাল করদাতারা উৎসাহিত হবে এবং করোনার সময়ে ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতির মাধ্যমে অনুষ্ঠান করে প্রধানমন্ত্রী কর দাতাদের হাতে একটি সুবিধাজনক সময়ে এই পুরস্কার তুলে দিতে পারেন; ৪. সরকারের রাজস্ব নীতিমালার সঙ্গে আয় ও ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত বিধায় এখানে সরকারের ব্যয় দক্ষতার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সহায়ক পরিবেশ সৃজনের মাধ্যমে শাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, কর্মসংন্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, ভৌত অবকাঠামো ও মানব সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার বাজেটের আওতায় ব্যয় পরিকল্পনা করে থাকে যা বর্তমান বছরের বাজেটেও রয়েছে। যার মধ্যে রাজস্ব ব্যয় ১১.০৫ %, উন্নয়ন ব্যয় ৪.৯৮% এবং অন্যান্য ব্যয় ১.৫৯%। অনুন্নয়ন খাতে সরকারি পরিচালনায় বেতন, ভাতাদি, ক্রয়, অফিস পরিচালনা ইত্যাদিতে ব্যয়ের সিংহভাগ ব্যায়িত হয়। এ ব্যাপারে নৈতিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে ব্যয় দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে; ৫. বাজেটে ভারসাম্য ও অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারনে বাজেটের আয়-ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দেখা দিলে ঘাটতি দাড়ায় যা সরকারকে অন্যের উপর নির্ভর করতে হয় যা কাম্য নয়। বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতির ধারাবাহিকতা থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে কোন বিশেষ কারন ব্যতীত বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ % কিংবা এর কাছাকাছি অবস্থান করে থাকে। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সহ কাষ্টম বিভাগ নৈতিকতার ভিত্তিতে রাজস্ব আহরনে যদি এগিয়ে আসে তবে এ রাজস্ব ঘাটতির অপবাদ থেকে সরকার মূক্ত হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, সরকারি ব্যয় বরাদ্ধ সাধারনত তিনটি মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত যেমন- আঞ্চলিক সমতা, উন্নয়ন অবকাঠামো ও মান সম্মত ব্যয়; সর্বশেষে বাংলাদেশের ২০২১ সালে আমাদের লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে পৌঁছানো। এ জন্য অপরিহার্য শর্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ থেকে ৮ শতাংশ নিশ্চিত করা। বিনিয়োগ বাড়াতে পারলেই কেবল এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। রাজস্ব আয় বাড়ানো এর শর্ত। এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে দরকার করবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি। সেখানে রাজস্ব প্রদানে সেবা নিশ্চিত, অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আইন-কানুন সময়োপযোগী করা গুরুত্ব পাবে। পরিকল্পনাজনিত সমস্যা তো রয়েছেই, সঙ্গে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক নানা জটিলতা। এসব বিষয়ে সরকারকে আরো জোরালো ভূমিকা নিতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি), ডিন,ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনির্ভাসিটি ও সাবেক জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা।
(কেএইচকে/ডিএফই/এসএএম/ ১৯ নভেম্বর ২০২০)