
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধে জোর প্রচেষ্টা চলছে। প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে লক্ষ কোটি ডলার ব্যয়ের। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় চলমান জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে এ প্রচেষ্টা আরো জোরদার হচ্ছে। অঙ্গীকার আসছে জ্বালানি খাতে নিট জিরো স্থানান্তরের (কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামানো প্রক্রিয়া)। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৬ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পদ মূল্যহীন হয়ে যাবে। নতুন একটি সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
ন্যাচার এনার্জি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ভবিষ্যতের চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে ২০৩৬ সালের মধ্যে ১১ লাখ কোটি ডলার থেকে ১৪ লাখ কোটি ডলারের জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পর্কিত সম্পদ অব্যবহূত হয়ে পড়বে। এর মধ্যে অবকাঠামো, আবাসন ও বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেক্ষেত্রে নিট জিরো স্থানান্তরে পিছিয়ে থাকা দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গবেষণাটির প্রধান ও যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন-ফ্রনসোয়া ম্যাকিউর বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে উপকৃত করবে। তবে অঞ্চলভিত্তিক দুর্ভোগ ও সম্ভাব্য বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা রোধের জন্য এ স্থানান্তর সাবধানে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সবচেয়ে খারাপ পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে, চাহিদা একেবারে পড়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত মানুষ জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে থাকবে। এরপর তারা বুঝবে, সম্পদগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। তবে সেই সময় ২০০৮ সালের মতো আর্থিক মন্দা তৈরি হতে পারে। এজন্য জ্বালানি খাতের এ পরিবর্তনে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গবেষণাটিতে কীভাবে ২০৩৬ সালের আগে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টি ভূরাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপকে নতুন আকার দেবে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগপ্রবাহ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ নিট শূন্যে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আরো সস্তা ও স্থিতিশীল করে তুলবে। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির দাম আরো বেশি অস্থিরতার মধ্যে পড়বে। জ্বালানি তেল ও কয়লার মজুদের মতো অনেক জীবাশ্ম জ্বালানির সম্পদ অব্যবহূত থেকে যাবে। যন্ত্রগুলোও পড়ে থাকবে এবং কোনো অর্থ ফেরত থেকে বঞ্চিত হবেন বিনিয়োগকারীরা।
প্রযুক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা সম্পদগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। অফশোর তেলকূপগুলো সবার আগে ক্ষতির মুখে পড়বে। বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো তেল, গ্যাস ও কয়লা আমদানিকারকরা বিদেশ থেকে জ্বালানি কেনার পরিবর্তে নিজ দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করবে। এর মাধ্যমে দেশগুলো আমদানির সেই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো আধুনিকায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে ব্যবহার করতে পারবে। ফলে বেশির ভাগ ইউরোপীয় দেশের জিডিপি নিট শূন্য পরিস্থিতিতে বাড়বে। এ বৃদ্ধির পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানির লোকসানকে ছাড়িয়ে যাবে।
যেমন যুক্তরাজ্য ২০৩৬ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পদের প্রায় অর্ধেক হারানো সত্ত্বেও এ সময়ের মধ্যে দেশটির জিডিপিতে ৭০ হাজার কোটি ডলার যুক্ত হবে। অন্যদিকে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এ সময়ের মধ্যে জ্বালানি তেল রফতানিনির্ভর নরওয়ের জিডিপি ৯ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে না পারলে আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার এবং কানাডা ৯২ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
তবে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যদি একটি কোটা পদ্ধতিতে সম্মত হয় এবং সমানভাবে বিতরণ শুরু করে, তাহলে সামগ্রিক ক্ষতি কিছুটা কম হবে। যদিও শেষ পর্যন্ত ১১ লাখ কোটি ডলারের সম্পদ মূল্যহীন হয়ে পড়বে।
জন-ফ্রনসোয়া ম্যাকিউর বলেন, জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো একযোগে পরিস্থিতি মোকাবেলা না করলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে। বিশৃঙ্খলা রোধ করতে আমদানিকারক দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থানান্তরের আগেই রফতানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে।
বিনিয়োগর্বাতা /এসআর/