Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Monday, 08 Nov 2021 00:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

ড: মিহির কুমার রায়ঃ জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলন (কপ ২৬) ঘিরে আশা ও আশঙ্কা দুটোই বাড়ছে। কপ ২৬ - কনফারেন্স অব দি পার্টিজকে সংক্ষেপে কপ বলা হয়। এটি জাতিসংঘের বিশ্বের বৃহৎ জলবায়ু সম্মেলন, যা ১ - ১২ নভেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ওইসময়ে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা এই দশকের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক শীর্ষ জলবায়ু সম্মেলন, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপ্রধান, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তাসহ প্রায় ৩০ হাজার মানুষ একত্র হয়েছে। এবারের সম্মেলন কপ-২৬ মূলত হচ্ছে, প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর জন্য নিজ দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করার পরিকল্পনা হালনাগাদের বিশ্বমঞ্চ। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করতে ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রির নিচে রাখার জন্য এই নতুন হালনাগাদকে হতে হবে আগের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী। এর পাশাপাশি গত বছরের জলবায়ু সম্মেলনের কিছু অসম্পূর্ণ কাজ রয়েছে, এবারের সম্মেলনে তাও সম্পূর্ণ করতে হবে। বস্তুত এ ক্ষতির দায়ভার ধনী দেশগুলো কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের পর এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবায়ু সম্মেলন। ‘কপ - ২৬’ - এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং বিশ্বের জনগণকে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অবহিত করা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার গতি কমাতে বিশ্ব জুড়ে কার্বন নিঃসরণের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ সম্মেলন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ বিশ্বের ২০০টি দেশকে পরিবেশের কার্বন নিঃসরণ কমাতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তাদের কর্মপরিকল্পনা কী, তা গ্লাসগোর সম্মেলনে জানাতে বলেছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, শিল্পবিপ্লব - পূর্ববর্তী বিশ্বের তাপমাত্রার তুলনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়কর প্রভাব থেকে বাঁচা যাবে। উন্নয়নশীল দেশের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ ধনী দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি জাতিসংঘ বলেছে, এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল জোগাড় যেমন জরুরি তেমনি এসব অর্থ ঠিকমতো ব্যবহার করাও জরুরি বলেছেন কপ ২৬-এর প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা, ব্রিটিশ এমপি। তিনি  বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ একবারে নামিয়ে আনার জন্য এই সম্মেলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনের সফলতার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে বিপর্যয় থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর চেষ্টা কতটা কাজ করবে। যার ফলে আগামী দিনগুলোতে আমাদের নিত্যদিনের জীবনযাপনে বড় রকমের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রশ্ন আসে, গ্লাসগোর জলবায়ু সম্মেলন থেকে কি সত্যিকার অর্থে আমরা কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারব? জলবায়ু সংকট মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় সংকল্প ও প্রতিশ্রুতিগুলো কার্যকর করা যতটা সমাজবিজ্ঞান আর নৈতিক দর্শনগত সংকট, ততটাই রাজনীতিবিদদের দ্বারা সৃষ্ট সমস্যাও। নব্য ধ্রুপদী অর্থনীতি সকলকে বিশ্বাস করাতে চায় যে আধুনিক অর্থনীতি ব্যক্তিমানুষের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত হয় না। মারিয়ানা মাঝুকাতো তার গ্রন্থ ‘মিশন ইকোনমি: আ মুনশট গাইড টু চেঞ্জিং ক্যাপিটালিজম’- এ উল্লেখ করেছেন, বাজারগুলো ‘সাংগঠনিক আচরণ, মিথস্ক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক নকশাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন নিয়ম, নীতি ও চুক্তিগুলো প্রভাবিত করে।

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জলবায়ু সম্মেলন কপ ২৬ এর আগে গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপ্টেশনের প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক ভারকুইজেনের সঙ্গে যৌথভাবে লেখা নিউজউইকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, ‘ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) দেশগুলোকে আরও বেশি তহবিল জোগানো হলে জলবায়ু ঝুঁকি থেকে তারা জলবায়ু সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এটা কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ৪৮ দেশ নয়, হুমকিতে থাকা সব দেশের জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে। বর্তমান বাস্তবতায় এটাই সঠিক পন্থা।’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা ৪৮ দেশের জোট ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি। নিবন্ধে শেখ হাসিনা ও প্যাট্রিক ভারকুইজেন লিখেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট। তবে সব দেশে এর প্রভাব সমান নয়। চার মহাদেশের ৪৮ দেশের জন্য এটা একেবারে অস্তিত্বের সংকট; এর মধ্যে কোনো অত্যুক্তি নেই। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকায় তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ভানুয়াতু, মালদ্বীপ আর মার্শাল আইল্যান্ডের মতো দ্বীপরাষ্ট্রগুলো। ১৬ কোটি মানুষের আবাসভূমি বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা লবণাক্ততার কবলে পড়ে বন্ধ্যা ভূমিতে পরিণত হওয়ার হুমকিতে রয়েছে। তাবদাহ আর খরা মধ্যপ্রাচের অনেক এলাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। সেখানে উষ্ণতা বাড়ার হার বিশ্বের যা গড় তার প্রায় দ্বিগুণ।  আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে বিশ্বের অর্থনীতিকে পরিবেশবান্ধব করতে হলে আগামী এক দশকে ৬ থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। অথচ সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর বেশিরভাগই স্বল্পোন্নত বা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, খুব বেশি হলে মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি প্রশমন ও অভিযোজনের জন্য এসব দেশের যে তহবিলের পাশাপাশি কারিগরি সহযোগিতাও প্রয়োজন, সে কথাও তুলে ধরা হয়েছে শেখ হাসিনা ও প্যাট্রিক ভারকুইজেনের নিবন্ধে।

বাংলাদেশ মূলত একটি গ্রাউন্ড-জিরো দেশ হিসেবে নিজের কোন দোষ ছাড়াই জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেল ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি ১ মিটার বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশের অন্তত ১৭ শতাংশ ভূমি সমুদ্রে বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে, ভূমিহীন ও জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে বিপুলসংখ্যক মানুষ। ফলে একদিকে যেমন জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়ে যাবে তেমনই উদ্বাস্তু সমস্যা দেশীয় সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে।

এই নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অন্য একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু অভিবাসীর অর্ধেকই হবে বাংলাদেশ থেকে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন, বন্যা ও খরার প্রভাব ছাড়াও ১১ লাখ রোহিঙ্গা জোরপূর্বক মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ গুরুতর জলবায়ু প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে। জরুরি উদ্যোগ এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বন্যা ও ফসলের উৎপাদন নষ্ট হয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশর প্রায় দুই কোটি মানুষ অভিবাসী হওয়ার ঝুঁকিতে যাবে। তবে এসব ঝুঁকি নিয়েই বাংলাদেশ গত দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি এবং দুর্যোগের প্রভাব প্রশমনে দৃষ্টান্তমূলক অগ্রগতি দেখিয়েছে। তবে আশঙ্কা শুধু বাংলাদেশকে নিয়েই নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াই জলবায়ু সৃষ্ট অভিবাসনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক সক্রিয় অঞ্চল হিসেবে পরিণত হতে যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে এখানে জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা বর্তমান সময়ের চেয়ে তিনগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এর কারণ হলো, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ শহর ও বৃহৎ নগর কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির আশঙ্কায় থাকা উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে। তবে এত এত উদ্বেগের সংবাদের মাঝেও স্বস্তি হচ্ছে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর একটি। চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরার দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি বেশ কয়েকটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তার সঙ্গে তখন যুক্তরাজ্য ও ইতালির রাষ্ট্রদূত এবং জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে দেখা গেছে। এই কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের ৪০ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে নিয়ে ‘ক্লাইমেট লিডারস সামিট’ নামের একটি ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজনও করে দেশটি। 

যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তিতে ফিরে আসায় ২০২১ সালের নভেম্বর মাস জলবায়ু ইস্যুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশও আন্তর্জাতিকভাবে একটি শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠস্বর। কারণ, ৪৮টি দেশ নিয়ে গঠিত জলবায়ুবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক ফোরাম সিভিএফের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। এই দেশগুলো যারা বিশ্বের ১ শতাংশের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী, অথচ নিঃসরণজনিত কারণে সৃষ্ট জলবায়ু সংকটের শিকার- তাদের মুখপাত্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন। তিনি স্কটল্যান্ডের জলবায়ু সম্মেলন ( কপ - ২৬) মূল পর্বে লিডার সামিটে দেয়া বক্তৃতায় প্লেনারি-২ এর কনফারেন্স অব দি পার্টিস যা জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের আওতার অনুষ্ঠিত ফোরামে চারটি বস্তুনিষ্ঠ প্রস্তাব উপস্থাপন করেন, যেমন - ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিলসহ ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এনার্জি চাহিদার ৪০ শতাংশ নেওয়া হবে; অভিযোজন ও প্রশমনের মধ্যে ৫০:৫০ ভারসাম্য বজায় রেখে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ উন্নত দেশগুলোর; ঝুঁকিতে রয়েছে যে সব দেশ তাদেরকে সাশ্রয়ী মূল্যে পরিচ্ছন ও সবুজ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার আশু ব্যবস্থা নেওয়া এবং সিভিএফ দেশগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী ভাঙ্গন, বন্যা ও খরার কারণে বাস্তুচ্যুত জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য বিশ্বব্যাপী দায়বদ্ধতা ভাগ করে নেওয়াসহ লোকসান ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সমাধান করা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্কটিশ পার্লামেন্টে ‘কল ফর ক্লাইমেট প্রসপারিটি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ভাষণে এ আহ্বান জানিয়ে বিশ্বকে জলবায়ু অভিবাসীদের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে আহ্বান জানান। সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদী ভাঙ্গন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক ঘটনায় প্রভাবিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া জলবায়ু অভিবাসীদের দায়িত্ব বিশ্বকে অবশ্যই ভাগ করে নিতে হবে। ক্ষতির বিষয়টি অবশ্যই সঠিকভাবে সমাধান করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী  বলেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত ৬০ লাখ মানুষ রয়েছে, এছাড়াও অতিরিক্ত ১.১ মিলিয়ন মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বোঝা যোগ হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলা এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তা ছাড়াও এখন পর্যন্ত জলবাযুর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে অনেক গবেষনা হয়েছে, যেমন- গোলাম রসুল (২০২১), ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই), গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স, এডিবি (২০১৭), জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূমিসংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদন (আইপিসিসি, ২০১৯) ইত্যাদি সম্পন্ন হয়েছে। এই সকল গবেষনার ফলাফলে দেখা যায় যে আবহাওয়ার অবনতি ও জলবায়ুর পরিবর্তনগত কারণে ঘরছাড়া হয়েছে ৪ কোটি মানুষ। একই সঙ্গে এ বছর থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরো চরম হচ্ছে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব। চলতি বছরের মধ্যে তা রেকর্ড ভেঙে সাড়ে ৫ কোটিতে দাঁড়াবে। বহু মানুষকে ছাড়তে হবে নিজ দেশ। এই সংখ্যা বর্তমান বিশ্বের শরণার্থী জনসংখ্যার দ্বিগুণ। বিশেষ কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠী নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে পড়েছে সারা বিশ্বের মানুষ। বিশেষত গত ২০ বছরে এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে আমেরিকা মহাদেশেও। জীবাশ্ম জ্বালানির বাড়ন্ত ব্যবহার আবহাওয়াকে উষ্ণ করে তুলছে, এর ফলে আরো বেশিসংখ্যক মানুষ অপ্রত্যাশিত বন্যা বা ঝড়ের কারণে ঘর ছাড়তে বাধ্য হবে। পাশাপাশি ফসলের ক্ষতি ও খরার মতো কারণও এই ধারাকে আরো প্রকট করে তুলছে। ধনী দেশগুলোর রাজনীতিকেরা অন্যান্য দেশ থেকে পরিবেশ শরণার্থীদের আসার কারণে তাদের দেশের অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপের আশঙ্কা করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে কার্বন নিঃসরণ। কার্বন নিঃসরণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিম্ন আয়ভুক্ত দেশগুলো প্রতিশ্রুত ফি বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ থেকেও বঞ্চিত। এশিয়ায় পরিবশগত কারণে উৎখাত হওয়া মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনস ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে লাখ লাখ মানুষ নিচু তটবর্তী অঞ্চলে বা বদ্বীপ-সংলগ্ন এলাকায় থাকে। সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের কারণে আরো বেশি করে মানুষ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। 

এখন পর্যন্ত মিডিয়ার মাধ্যমে যে সকল খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে তা হলো ধনী দেশগুলো ১০ হাজার কোটি ডলারের প্রতিশ্লুতি দিয়েছে, ক্লিয়ার ইনার্জি পাইলট প্রকল্প চারটি দেশ বাস্তবায়িত করবে, ২০৩০ সালের মধ্যে সকল বনাঞ্চল সংরক্ষন করবে, কয়লা ভিত্তিক সকল জ্বালানী বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল করবে ইত্যাদি। কিন্তু সমস্যা হলো বাস্তবায়ন নিয়ে বিশেষত জি-২০ এর প্রায় প্রতিটি দেশই এক কাতারভুক্ত। স্তরবিন্যাসিত বিশ্বে এরা ধনী দেশ; বাকিরা আধা ধনী এবং গরীব বা স্বল্পোন্নত। যেখানে গ্লাসগো সম্মেলনে ১০০র বেশি দেশের রাষ্ট্র প্রধানগণ অংশ নিচ্ছেন সেখানে রাশিয়া ও চীনের প্রেসিডেন্টদের অনুপিস্থিতি নানান প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। এ দুটো দেশ আমেরিকার পরেই পরিবেশ ও জলবায়ু দূষণের জন্য দায়ী। দ্রুত শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমরাস্ত্র, খনি সম্পদ, বিশেষত তেল ও কয়লা আহরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে কম খরচে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলছেন উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর বিশেষ মনোযোগ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকার অবশ্যই পূরণ করতে হবে। এই পরিমাণ অর্থায়ন হবে বিদ্যমান ওডিএ (অফিসিয়াল উন্নয়ন সহায়তা) - এর অতিরিক্ত। জলবায়ু সংকট মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় সংকল্প ও প্রতিশ্রুতিগুলো কার্যকর করা যতটা সমাজবিজ্ঞান আর নৈতিক দর্শনগত সংকট, ততটাই রাজনীতিবিদদের দ্বারা সৃষ্ট সমস্যাও।

লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ।