Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Thursday, 02 Dec 2021 06:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

ড: মিহির কুমার রায়: গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরেও জাতীয় আয়কর দিবস, ২০২২১ পালন করেছে।  আয়কর দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘কর আহরণে করদাতাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন’। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে বিষয়টি অবশ্যই বেশ সময়োপযোগী। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের এই পথ পরিক্রমায় পাঁচ দশক পরেও দেশের কর্পোরেট ব্যবসা বানিজ্য বৃদ্ধি পেলেও কোম্পানি প্রদত্ত আয়করের প্রবৃদ্ধি তেমন হারে বাড়েনি। অপর দিকে কোম্পানি ব্যতিত করদাতাদের মধ্যে ব্যক্তি করদাতা, পার্টনারশীপ ফার্ম, এসোসিয়েসেন অব পারসনস ইত্যাদি রয়েছে যাদের কর্পোরেট করের আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহন করা প্রয়োজন। সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে ইহা বলতে কোন দ্বিধা নেই যে, প্রতি বছর জুলাই- নভেম্বর মাস আসলেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আহরন আয়োজন শুরু করে কিন্তু সারা বছরব্যাপি এই ধরনের তৎপরতা চোখে পড়েনি অথচ বাজেট ভিত্তিক সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি অতিব জাতীয় গুরত্বপূর্ন যার সাথে সরকারের প্রশাসনিক পরিচালনার ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত। কারন প্রতি বছর সরকার রাজস্ব আয়ের ঘাটতির কারনে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে কোটি কোটি টাকা ধার করে প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হয় যা অত্যন্ত দুঃখজনক। 

প্রায় ১৮ মাস ধরে চলছে করোনা অভিঘাত, এর প্রভাব পড়েছে সর্বত্র এবং তথ্য বলছে বিগত (২০২০-২১) অর্থবছরে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং বছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আহরণ হয়েছিল মাত্র ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে করা হয় ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা যা অর্জন সম্ভব হয়নি। বর্তমান (২০২১-২২) অর্থবছরের জন্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। করোনার অব্যাহত প্রভাবের কারণে সেটি কতটুকু পূরণ হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কাজেই করদাতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিতে রাজস্ব ব্যবস্থা আরো সহজ ও ঝামেলাহীন করার প্রয়োজন রয়েছে। 

দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে এবং  সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় কর-জিডিপির গড় অনুপাত ৩৬ শতাংশের মতো। উদীয়মান এশীয় দেশগুলোর অনুপাতও গড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় অনুপাত সাড়ে ১৮ শতাংশ। এমনকি সাব-সাহারা খ্যাত আফ্রিকার দেশগুলোর কর-জিডিপির গড় অনুপাত প্রায় ১৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি কর-জিডিপি অনুপাত নেপালের, প্রায় ১৯ শতাংশ। এরপর ভুটানের, ১৬ শতাংশ। ভারতের ১২ শতাংশ, শ্রীলংকার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১ শতাংশ, আফগানিস্তানের ৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপের ৯ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ শতাংশের ঘরে। উল্লিখিত দেশগুলোয় রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মূলে কাজ করছে আধুনিক, সহজ ও নির্বিঘ্ন কর ব্যবস্থা, দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা এবং সর্বোপরি একটি সহায়ক রাজস্ব সংস্কৃতি। 

কর আহরণ না বাড়ার পেছনে বংলাদেশে অনেক কারন রয়েছে এবং দেশে একটি আয়কর আইন থাকলেও সেটি পুরনো আইন হওয়ায় বর্তমান সময়ের অধিক্ষেত্রের অনেক কিছুই মেলানো যাচ্ছে না। অনেক দিন কর ব্যবস্থায় অটোমেশন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা থাকলেও তার অগ্রগতি মন্থর রয়েছে, আয়কর সংক্রান্ত চলমান মামলাগুলো নিষ্পত্তি দীর্ঘসূত্রীতা, আছে কর প্রশাসনের জনবলের ঘাটতি, কর আরোপন বৈষম্যমূলক, করযোগ্য আয় থাকলেও অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান করের বাইরে রয়ে গেছে ইত্যাদি।

বলা হচ্ছে, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে কর-জিডিপি অনুপাত ১৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অবস্থার তেমন পরিবর্তন  লক্ষ্যণীয় হচ্ছে না। এরুপ অবস্থায় কর ফাঁকি রোধ এনবিআরের অটোমেশনে গতি আনা খুব জরুরি। এটা কেবল কর ফাঁকি ধরতে সাহায্য করবে না, উপরন্তু নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা এবং এনবিআর ডাটাবেজের সঙ্গে কর প্রদানকারীর ব্যাংক হিসাবের যোগাযোগ তৈরিতে সহায়তা করবে। সংস্থাটি এরই মধ্যে অবশ্য কিছু সার্ভিস সেন্টার খুলেছে। এ ব্যাপারে করদাতাদের ওয়াকিবহাল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজস্ব বিভাগে কর গোয়েন্দা সেলকেও আরো সক্ষম ও কার্যকর করা চাই। বিশ্বায়নের যুগে ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলকে অনেক শক্তিশালী করতে হবে, প্রয়োজনে ঢেলে সাজাতে হবে। 

এর মধ্যেই বহুপ্রতীক্ষিত ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার এবং ব্যবসায়ীদেরও হয়রানি কীভাবে কমানো যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। আয়কর আইন যুগোপযোগী এবং এটি এখন বাংলা ভাষায় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যা প্রশংশনীয়। এটা হলে অনেক অস্পষ্টতা দূর হবে এবং জনগণও এ-সম্পর্কিত বিধিবিধান সহজেই জানতে পারবে, যা কর বাড়াতে সহায়ক। প্রতি বছরই করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কম এবং যারা নিয়মিতভাবে কর দেন, তাদের ওপরই দেয়া হয় বাড়তি চাপ।  বাংলাদেশে বর্তমানে টিনধারী করদাতার সংখ্যা কত এবং এর মধ্যে কতজন  রিটার্ন জমা দেয়া তার কোন সঠিক হিসাব পাওয়া দুস্কর। ফলে বাড়তি চাপ নিতে হয় মূলত নিয়মিত সৎ করদাতা বিশেষভাবে পেশাজীবী সম্প্রদায় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে। বড় শহরগুলোয় কর দেয়ার প্রবণতা বেশি হলেও মফস্বল পর্যায়ের অনেক সচ্ছল ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান করের আওতায় নেই। উদীয়মান গ্রোথ সেন্টারগুলো চিহ্নিত করে তাদের করের আওতায় আনা সময়ের দাবি বিধায় স্থানীয় কর কার্যালয়গুলো আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি।