
ড: মিহির কুমার রায়: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৪ ডিসেম্বর, ২০২১, শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুই দিনব্যাপী বিশ্ব শান্তি সম্মেল অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশ্বশান্তি সম্মেলন-২০২১ এর আয়োজক কমিটির সভাপতি ছিলেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম মূল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মূল অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি শুরুর আগে বিশ্ব শান্তি সম্মেলন-২০২১ এর থিম সং পরিবেশিত হয় এবং একটি অডিও-ভিডিও প্রেজেন্টেশন প্রদর্শন করা হয়। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস গর্ডন ব্রাউনের একটি ভিডিও বার্তা অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়। সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোহ চোক টং, ইউনেস্কোর সাবেক মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা এবং হাডসন ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পরিচালক হোসেন হাক্কানি সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ই ডিসেম্বর, ২০২১, রোববার সমাপনী ভাষণে অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সর্বজনীন টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সবাইকে তাদের সম্পদ ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। শেখ হাসিনা বলেন, গত দু’বছর ধরে করোনাভাইরাস মহামারী পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাকে এক নতুন সংকটের মুখোমুখি করেছে। এই সংকট প্রমাণ করেছে বিশ্বের কেউই আলাদা নয়। কাজেই শান্তিপূর্ণভাবে এই পৃথিবীতে বসবাস করতে হলে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি জবাবদিহিতামূলক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শান্তির আদর্শকে পুরোপুরি ধারণ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সমঝোতার ভিত্তিতে সবার সঙ্গে কাজ করার জন্য বাংলাদেশ সদা প্রস্তুত রয়েছে। স্বাধীনতার জন্য জাতির সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলা হয় এর মধ্য দিয়ে শান্তির মূল্য এবং সমগ্র মানব জাতির গভীরতম আকাঙ্খাসমূহ অনুধাবন করেছে। সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ১১ লাখের অধিক মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সাময়িক আশ্রয় দেয়া হয়েছে যার ফলে এই অঞ্চলে একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তাদের নিজ মাতৃভূমিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসনের জন্য সরকার শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল এবং দেশটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্র্যাজুয়েশন প্রাপ্তির মর্যাদা, এবং ‘এসডিজি প্রোগ্রেস অ্যাওয়ার্ড’ মুজিব বর্ষের শ্রেষ্ঠ উপহার। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, তথ্য-প্রযুক্তি ও কৃষিক্ষেত্রে দেশে বিপ্লব ঘটেছে, দেশের অর্থনীতি এখন শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং করোনা মহামারীর প্রতিঘাত নিরসনে এক লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এখন ৪১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, মাথাপিছু আয় দুই হাজার ৫৫৪ মার্কিন ডলার, রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এসডিজি-২০৩০ এর সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশ ২০ বছর মেয়াদি দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে এবং ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়ন করছে।
জাতির পিতার শান্তির দর্শন ‘অত্যন্ত সুদূর প্রসারী’ ছিল বিধায় তিনি প্রমাণ করেছেন সব বঞ্চনা-বৈষম্য-শোষণের শৃঙ্খল তথা পরাধীনতা থেকে মুক্তি, ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অবসানপূর্বক সমৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। তাছাড়া তিনি বিশ্বশান্তি অটুট রাখতে যুদ্ধ-বিগ্রহের পরিসমাপ্তি এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করে জোট-নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। জাতির পিতার শান্তি স্থাপনের প্রয়াস সম্পর্কে আলোকপাত করা হয় এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হলে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব এর প্রতিবাদ করেছিলেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগঠিত করতে গিয়ে বারবার কারাবরণ করেছিলেন। দীর্ঘ কারাবাসের পর তিনি ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান। একই বছর তিনি বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় শান্তি সম্মেলনে যোগ দেন এবং প্রথম বাঙালি হিসেবে বিদেশের মাটিতে বাংলায় বক্তৃতা করেন। ‘আমার দেখা নয়া চীন’ গ্রন্থে জাতির পিতার সেই সম্মেলনে যোগদানের বর্ণনা রয়েছে। জাতির পিতা কম্যুনিস্টদের শান্তি সম্মেলনে যোগদানের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে- ‘দুনিয়ায় আজ যারাই শান্তি চায় তাদের শান্তি সম্মেলনে আমরা যোগদান করতে রাজি। রাশিয়া হোক, আমেরিকা হোক, ব্রিটেন হোক, চীন হোক যেই শান্তির জন্য সংগ্রাম করবে তাদের সঙ্গে আমরা সহস্র কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে রাজি আছি- আমরা শান্তি চাই।’
জাতির পিতার দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার পর তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন অথচ স্বাধীনতা অর্জনের পর মাত্র ৯ মাসেই একটি সংবিধান প্রণয়ন করে সেই সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে ‘আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়ন’-এর ক্ষেত্রে বন্ধুত্বকে রেখেছেন দেশের পররাষ্ট্র নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। সেই সঙ্গে শক্তি প্রয়োগ পরিহার, সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, নিজ নিজ আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ এবং সম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছেন। জাতির পিতা দেশের নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বশান্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে এক ঘোষণার মাধ্যমে জুলিও কুরি পদকের জন্য মনোনীত হন। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেই পদক গ্রহণ অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘বিশ্বশান্তি আমার জীবন দর্শনের অন্যতম মূলনীতি। আমি সব সময় পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে নিপীড়িত, শোষিত, শান্তিকামী ও মুক্তিকামী মানুষের পাশে ছিলাম। আমরা বিশ্বের সর্বত্রই শান্তি স্থাপন করতে চাই। আমরা বিশ্বশান্তিকে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চাই।’
সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ও সোচ্চার ছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ এবং এর সম্পদের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ‘দি টেরিটোরিয়ল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট’ও প্রণয়ন করেন। দীর্ঘ ২১ বছরের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে এবং একই বছর ১২ নভেম্বর দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিরসন করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে জাতির পিতার হত্যার বিচার শুরু করা হয়। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি উপজাতিদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটিয়ে শান্তি-চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ প্রথম জাতিসংঘে ‘শান্তির সংস্কৃতি’ বিকাশে কর্মসূচি গ্রহণের লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, যা ১৯৯৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গৃহীত হয়। সে অনুযায়ী জাতিসংঘ ২০০০ সালকে ‘শান্তির সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক বছর’ এবং ২০০১-২০১০ কে ‘শান্তির সংস্কৃতি ও অহিংস দশক’ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়লাভের পর জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর করা হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল প্রতিষ্ঠা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলমান রাখা হয়। জাতিসংঘে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গর্ববোধ করে। বাংলাদেশ সরকার জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য-সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ অব্যাহত রাখা হয়। বাংলদেশে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ারও দূষ্ঠান্ত রয়েছে যা জাতীর জন্য গর্বের খবরও বটে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি কাজের মধ্যেই শান্তি ও উন্নয়নের বাতায়ন রয়েছে যা আন্তর্জ্যাতিক ভাবে স্বিকৃত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮শে নভেম্বর, ২০২১ রবিবার সংসদে পঞ্চদশ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে বলেছিলেন যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করার প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হওয়া দেশের জন্য একটি ‘একটা অনন্য উত্তোরণ’ এবং ‘বিরল সম্মান অর্জন’। এই রেজুলেশনটি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে পরবর্তী ধাপ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২০ থেকে ২০২১ সাল জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী অর্থাৎ মুজিববর্ষ এবং ২০২১ সাল আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর সময়ে এই অর্জন আমাদের জন্য অনেক গৌরবের। কারণ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী যখন আমরা উদযাপন করছি সেই সময় এই যুগান্তকারি অর্জন বাংলাদেশ পায় যা বাঙালি জাতির জন্য একটা বিরল সম্মান অর্জন তথা বিশ্বসভায় বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির জন্য একটা অনন্য উত্তোরণ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল উন্নয়নশীল দেশ হয়েছে বলে নয়, সর্বক্ষেত্রেই বিশ্বে আজ বাংলাদেশের ভাবমূর্র্তি উজ্জ্বল হয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য একটা বিরাট অর্জন। ‘মুজিব চিরন্তন’ থিম নিয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে অনুষ্ঠানমালায় ৫টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের অংশগ্রহণ এবং রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, সৌদি বাদশাহ এবং ব্রুনাই সুলতান থেকে শুরু করে ১৯৪টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সে অনুষ্ঠানে অভিনন্দন জানিয়ে বিভিন্ন বার্তা এবং ভিডিও বার্তা প্রদানের প্রসংগ টেনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্যই এ সম্মান আমরা পেয়েছি, যা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আগামী দিনেও বাংলাদেশ যুগান্তকারি ভূমিকা রাখবে এই আশা রইল।
লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ।