
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক: সৌদি আরবে আসা বিদেশি নেতাদের অভ্যর্থনা জানানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন আঞ্চলিক সম্মেলনে নেতৃত্বদান—সবকিছুই এখন করছেন দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। অন্যদিকে সৌদির অশীতিপর বাদশাহ সালমান ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছেন। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব না পেলেও যুবরাজই হয়ে উঠছেন সৌদির ‘মুকুটবিহীন’ বাদশাহ। বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণে এ কথা বলা হয়েছে।
সৌদির বাদশাহ সালমানের বয়স এখন প্রায় ৮৬ বছর। তাঁর স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তিনি এখন আর খুব একটা জনসম্মুখে আসেন না। তাঁর ছেলে ৩৬ বছর বয়সী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানই এখন বাবার পক্ষে সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামলান। বাদশাহর হয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত থাকেন তিনি। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অভ্যর্থনা জানানোর কাজটি তিনিই করেন।
২০১৭ সালের জুনে সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত হন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। মূলত এর পর থেকেই তিনি সৌদির কার্যত নেতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে এখন বিভিন্ন বিদেশি নেতার সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যাচ্ছে। চলতি ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে বৈঠক করেন।
গত মঙ্গলবার উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সম্মেলনে নেতৃত্ব দেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। বার্ষিক এই সম্মেলনে সাধারণত সৌদির বাদশাহ সালমান নেতৃত্ব দিতেন। সম্মেলনে আগত বিদেশি অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানোর কাজটিও তিনিই করতেন। তবে এসব অনুষ্ঠানে এখন আর তাঁকে দেখা যায় না।
কারনেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিচের ইয়াসমিন ফারুক এএফপিকে বলেন, অতীতে দেখা যেত, সৌদি বাদশাহরা যখন অসুস্থ থাকতেন, তখন তাঁর বদলে বিভিন্ন বৈঠক-সম্মেলনে সভাপতিত্ব করতেন যুবরাজ। যুবরাজই বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। তবে এখন নতুন যে বিষয়টি দেখা যাচ্ছে, তা হলো বাদশাহ তাঁর সব দায়িত্ব পরিপালন করার পরও রাষ্ট্রীয়ভাবে ও সংবাদমাধ্যমে যুবরাজের ভূমিকাকে জোরালো করে প্রচার করা হচ্ছে।
করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বাদশাহ সালমান নিঅম শহরে থাকছেন। লোহিত সাগরতীরে মেগা শহরটি অবস্থিত।
২০২০ সালের মার্চে রিয়াদে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাবের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন বাদশাহ সালমান। কোনো বিদেশি নেতার সঙ্গে বাদশাহ সালমানের এটাই ছিল সবশেষ বৈঠক। তিনি সবশেষ বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। ওমানের সুলতান কাবুসের মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে তিনি দেশটিতে গিয়েছিলেন।
যুবরাজ নিজেকে উদারপন্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। সৌদির সমাজব্যবস্থায় তিনি বিভিন্ন সংস্কার আনছেন। নারীদের গাড়ি চালানো ও সরকারি চাকরি করার অনুমতি দিয়েছেন। বিনোদনের জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিনোদনকেন্দ্র চালু করেছেন।
পর্যটক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সৌদির দুয়ার খুলে দিয়েছেন যুবরাজ। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদির অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন।
এসব পরিবর্তনের পাশাপাশি যুবরাজের বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ধরপাকড় ও নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতা দমনের অভিযোগ রয়েছে।
২০১৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার ঘটনায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়।
বাদশাহ সালমানের চেয়ে যুবরাজ অনেক বেশি ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। তিনি সৌদির আকাশসীমা দিয়ে ইসরায়েলি উড়োজাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরব গালফ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিন ডিওয়ান মনে করেন, বাদশাহ সালমানের দীর্ঘজীবিতা থেকে সুবিধা পাচ্ছেন যুবরাজ। যুবরাজ যেসব তারুণ্যদীপ্ত ও অপ্রচলিত পদক্ষেপ নিচ্ছেন, সেগুলো কোথাও বাধা পাচ্ছে না।
সম্প্রতি দেশের বাজেট নিয়ে টেলিভিশনে ভাষণ দেন বাদশাহ সালমান। তবে গত মঙ্গলবারের সম্মেলনে তিনি কেন উপস্থিত ছিলেন না, সে ব্যাপারে সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
সৌদি সরকারের উপদেষ্টা আলি শিহাবি দাবি করেন, বাদশাহ সালমান সুস্থ আছেন। গত বুধবার এক টুইটে তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে বাদশাহ খুব ভালো আছেন। তিনি প্রতিদিন ব্যায়াম করছেন। তবে তাঁর বয়স ৮৬ বছর। এই বয়সে তিনি মাস্ক পরে থাকতে অস্বস্তি বোধ করেন। তা ছাড়া মানুষকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়ে তাঁর করমর্দন করার অভ্যাস আছে। এসব কারণে তাঁকে নিরাপদ রাখতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//