Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Wednesday, 02 Feb 2022 06:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

ড: মিহির কুমার রায়: চলতি বছরের অর্ধেক সময় (জুলাই-ডিসেম্বর) অতিবাহিত হয়েছে এবং ধারাবাহিক নিয়মে প্রতি বছরের মাঝামাঝি এসে বাজেট সংশোধন কার্যক্রম শুরু করে অর্থ মন্ত্রণালয় যার ব্যতিক্রম বর্তমান বছরেও হয়নি। এরি মধ্যে চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) সংশোধিত বাজেটের পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় যেখানে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেমন কোনোভাবেই অতিরিক্ত বরাদ্দ দাবি ও উন্নয়ন ব্যয়ের সাশ্রয় হওয়া অর্থ পরিচালনা বাজেটে স্থানান্তর করা যাবে না, যেসব প্রকল্প অনুমোদন হয়নি সেসব ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া যাবে না এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সাশ্রয়কৃত অর্থ আর ভিন্ন খাতে স্থানান্তর করা যাবে না, মূল বাজেটে সংস্থান ছিল না, এমন কোনো সম্পদ সংগ্রহের নতুন অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না, সরবরাহ ও সেবা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো যাবে না, তবে কোনো আইটেমের মূল্য বাড়লে সেটি বিবেচনায় নিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো যেতে পারে, পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত খাত থেকে কোনো অর্থ বরাদ্দ হয়ে থাকলে সংশোধিত বাজেটে তার প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে ইত্যাদি। এডিপি সংশোধনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোকে ১৪টি নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে ওই পরিপত্রে যেখানে ধীরগতির প্রকল্পের টাকা কেটে দ্রুতগতির গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যাত্তোর, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি পুনর্বাসনসংক্রান্ত প্রকল্প। মন্ত্রণালয়গুলোর উদ্দেশ্যে বলা হয়, সংশোধিত এডিপিতে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা যাবে, তবে সে ক্ষেত্রে অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যয় ও ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয়ের ভিত্তিতে যুক্তিসঙ্গত ও সম্ভাব্য ব্যয়কে বিবেচনায় নিতে হবে। এতে আরও বলা হয়, আগামী জানুয়ারির মধ্যে যেসব প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো সম্ভব হবে না- সেগুলো আর এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। তবে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাত্তোর পুনর্বাসন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা সীমিত রাখা, অগ্রাধিকার প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাদ দেওয়া, আর এডিপিতে মূল অংশে বরাদ্দবিহীনভাবে কোনো প্রকল্প না রাখা এবং চলতি অর্থবছরে শেষ হবে এমন নির্দিষ্ট প্রকল্পের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের মতে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) পর্যন্ত বাজেটের অর্থ ব্যয় হয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকার মত এবং জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে ব্যয় করতে হবে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতিমাসে পৌনে এক লাখ কোটি টাকা খরচ করতে হবে যা ব্যয় করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে উল্লেখ্য যে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পেলেও সক্ষমতার অভাবে অধিকাংশই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম খরচ করেছে অর্থ্যাৎ বিগত ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) অর্থ ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। স্বল্পমাত্রায় অর্থব্যয়ের কারণে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও গতি পাচ্ছে না এবং এর মধ্যে শুরু হয়েছে ওমিক্রনের বিস্তার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে বেশি করে টাকা ব্যয়ের ওপর জোর দিয়ে আসছেন অর্থনীতিবিদরা অর্থাৎ বেশি টাকা ব্যয় হলে এর প্রভাব পড়বে সব শ্রেণির মানুষের উপর, চাঙা হবে দেশের অর্থনীতি। 

মন্ত্রণালয়গুলোর গত ৬ মাসের অর্থব্যয় নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে অর্থ বিভাগ। সেখানে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনকে চলতি বাজেটে ১৭২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিপরীতে ব্যয় করেছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। তবে সম্প্রতি সারা দেশে নির্বাচন পরিচালনার কারণে সংস্থাটি নির্ধারিত সময়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের বরাদ্দ আছে ২৫ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা সেখানে ব্যয় করেছে মাত্র ৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অর্থবছরের শুরুতে চালু করা সম্ভব হয়নি। বছরের শেষদিকে খুলে দিলেও আবার নতুন করে ওমিক্রনের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরপর প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেখা যায়, ২৬ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় করছে ৯ হাজার ১১৯ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিভাগ বরাদ্দের ৩৬ হাজার ৪১৫ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় ১১ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ সময় অর্থব্যয় করেছে ১ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। অথচ বরাদ্দ আছে ৯ হাজার ১২৩ কোটি টাকা। একইভাবে কৃষি মন্ত্রণালয় ১৬ হাজার ১০১ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় করেছে ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা, খাদ্য মন্ত্রণালয় ৫ হাজার ৩০৯ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় করেছে ৩ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ২ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা অথচ বরাদ্দ আছে ২৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। 

কোভিড-১৯ প্রতিঘাতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা এবং বছরের মাঝামাঝি, প্রথম ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ যার ফলে আগামী ৬ মাসে (জানুয়ারি-জুন) বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে বাকি ৭৫ শতাংশ ৪ লাখ ৫২ হাজার ৯৫১ কোটি ব্যয় করতে হবে। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা এবং একই সময়ে রাজস্ব আহরণ করতে হবে ২ লাখ ৩ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা।

এখন, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায় হয় ১ লাখ ২৬ হাজার ২০৯ কোটি টাকা যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৭ হাজার ৮২ কোটি টাকা (১১.৯২ শতাংশ) কম। এর মধ্যে কাস্টমস থেকে আদায় কম হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার ১৫ শতাংশ, মূসক থেকে ১১.৩৩ শতাংশ এবং আয়কর থেকে ৯.৪০ শতাংশ। 

এখন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, যা সরকার অবগত আছে। কিন্তু এর উন্নয়নের গতিধারায় কবে নাগাদ এই সক্ষমতা একটি গ্রহনযোগ্য পর্যায়ে পৌছাবে তা বলা দুস্কর। এর জন্য প্রশিক্ষন ও তদারকির কোন বিকল্প নেই সত্যি কিন্তু একটি রোড ম্যাপ ধরে আগাতে হবে। প্রায়শই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর সক্ষমতা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীভূক্ত প্রকল্পগুলোর ব্যয় দক্ষতা/ব্যয়ের মান নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন শোনা যায়; কভিড-১৯ অতিমারীর কারণে স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো আরো প্রকট হয়েছে। যেমন  বিদায়ি ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৩ শতাংশ এবং মোট বাজেট বরাদ্দের ৭.২ শতাংশ। কিন্তু  স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাদ্দকৃত বাজেটের মধ্যে মাত্র ২১ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। এমনকি ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ১০০ কোটি টাকা স্বাস্থ্য গবেষণায় বরাদ্দ ছিল অথচ  খরচ হয়নি বরাদ্দের এক টাকাও বিধায় এ খাতে অর্থ বরাদ্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ মনিটরিং প্রয়োজন। কভিড-১৯ ও অন্যান্য রোগ বিষয়ে গবেষণার জন্য বাজেট বরাদ্দ ও তার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ও মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করতে হবে, সেক্ষেত্রে এ বিভাগের বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা সৃষ্টি করতে হবে। করোনা কালীনবাজেট বাস্তবায়নের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্যে লক্ষ্যনীয় কেন্দ্রীক রাজস্ব আহরন, অবকাঠামোগত ঘাটতি, অগ্রাধিকার ভিত্তিক সরকারি ব্যয় নির্ধারন, ঘাটতি বাজেটের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়, বৈদেশিক ঋন প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, ব্যক্তি ঋনের প্রতিবন্ধকতা, রফতানী আমদানী বানিজ্যে সমতা আনয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সঞ্চয় বিনিয়োগের ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে যা বর্তমান বছরেও একেবারেই দৃশ্যমান। এখন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা রোড ম্যাপ তৈরি, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, প্রকল্পের গুনগত বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করলে অনেক চ্যালেঞ্জই মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে যার ভিত্তিগুলো সরকারকে আমলে নেয়া উচিত। আবার উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয়ের মান উন্নয়ন ও অব্যাহত দুর্নীতি প্রতিরোধে উদ্যোগী মন্ত্রনালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থমন্ত্রনালয়ের অর্থ অনুবিভাগকে উন্নয়নের সহযাত্রী হিসাবে কাজ করতে হবে। সর্ব শেষে বলা যায় বাজেট সংশোধনের প্রয়োজন হয় বাস্তবায়নের অপরিপক্কতার কারনে যার সমাধান জরুরী নচেত দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন ব্যাহত হতে বাধ্য।

লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।