Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Wednesday, 09 Feb 2022 00:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

ড: মিহির কুমার রায়ঃ ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের সমন্বিত অহংকারের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো - শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ- আমাদের ভাষা বাংলা কিন্তু এর অন্তরালে যে একটি ইতিহাস রয়েছে তা আলোচনা এখানে প্রাসঙ্গিক বলে প্রতিয়মান হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর সরাসরি ভাষা আন্দোলনে শরিক হন এবং ভাষা আন্দোলনের শুরুতে তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বাংলা ভাষার দাবির স্বপক্ষে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবনে মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক চলাকালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে অনুষ্ঠিত মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সমকালীন রাজনীতিবিদ সহ ১৪ জন ভাষাবীর সর্বপ্রথম ভাষা-আন্দোলন সহ অন্যান্য দাবি সংবলিত ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করেছিলেন এবং সেই ইশতেহারে ২১ দফা দাবির মধ্যে দ্বিতীয় দাবিটি ছিল রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত। ঐতিহাসিক এই ইশতেহারটি একটি ছোট পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়েছিল যার নাম ‘রাষ্ট্রভাষা-২১ দফা ইশতেহার-ঐতিহাসিক দলিল এবং’ উক্ত পুস্তিকাটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত যার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা।’ ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই সংগঠনটির ভূমিকা খুবই স্মরণীয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার বিষয়টি ছিল অন্যতম। শেখ মুজিবসহ সব প্রগতিবাদী ছাত্রনেতাই বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তমদ্দুন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথ সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করা হয় এবং সেখানে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, মুহম্মদ তোয়াহা, আবুল কাসেম, রণেশ দাশ গুপ্ত, অজিত গুহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। সভায় গণপরিষদ সিদ্ধান্ত ও মুসলিম লীগের বাংলা ভাষাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এই সংগ্রাম পরিষদ গঠনে শেখ মুজিব বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা ছিল যেমন বলিষ্ঠ, তেমনি সুদূরপ্রসারী। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশে প্রথম সফল হরতাল। এই হরতালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়ে গ্রেফতার হন। একই বছরে ১১ মার্চের হরতাল কর্মসূচীতে যুবক শেখ মুজিব এতটাই উৎসাহিত হয়েছিলেন যে, এ হরতাল ও কর্মসূচী তার জীবনের গতিধারা নতুনভাবে প্রবাহিত করে ও ‘স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এটিই তাঁর প্রথম গ্রেফতার।’ ১১ মার্চের গ্রেফতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের এক টার্নিং পয়েন্ট। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ঐতিহাসিক ১১ মার্চের গুরুত্ব এবং গ্রেফতার প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নয়, মূলত শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠনের মাধ্যমে। সেদিনই সকাল ৯টার সময় বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। এবং তার সহকর্মীদেরও গ্রেফতার করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে আন্দোলন চলতে থাকে।’ ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে আট দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে জেলখানায় আটক ভাষা আন্দোলনের কর্মী রাজবন্দীদের চুক্তিপত্রটি দেখানো হয় এবং অনুমোদন নেয়া হয়, অনুমোদনের পর চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। কারাবন্দী অন্যদের সঙ্গে শেখ সাহেবও চুক্তির শর্ত দেখেন এবং অনুমোদন প্রদান করেন। এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে সর্বপ্রথম বাংলাভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল এবং এই চুক্তির শর্ত মোতাবেক শেখ মুজিবসহ অন্য ভাষাসৈনিকরা কারামুক্ত হন। এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে একটি প্রতিষ্ঠিত সরকার এ দেশবাসীর কাছে নতিস্বীকারে বাধ্য হয়েছিল। ১৫ মার্চ আন্দোলনের কয়েক নেতৃবৃন্দকে মুক্তিদানের ব্যাপারে সরকার গড়িমসি শুরু করেন। এতে শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষিপ্ত ও বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন এবং এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে এক সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পূর্ববাংলা আইন পরিষদ ভবন অভিমুখে এক মিছিল বের হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য কারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান একজন বলিষ্ঠ প্রত্যয়সম্পন্ন এবং অসম সাহসী যুবনেতা হিসেবে ছাত্রসমাজে এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে স্বীকৃতি লাভ করতে থাকেন।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও লেখা আছে- ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে করাচিতে পাকিস্তানের সংবিধান সভার যে বৈঠক বসেছিলো, সেখানে মুসলিম লীগ নেতারা সবাই মত দিয়েছিলো উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে। সেই বৈঠকে কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি তুলেছিলেন ‘পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক’। তাতে অদূরদর্শী মুসলিম লীগ সদস্যরা কর্ণপাত করেনি। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে পূর্ববাংলার সর্বত্র ব্যাপক অসন্তুষের সৃষ্টি হয়, এবং এর প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ২রা মার্চ গঠিত হয়- সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে পৃষ্ঠা. ৯২ এ আরও লিখেছেন- “সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। আমি ফরিদপুর, যশোর হয়ে দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করে ঐ তারিখের তিন দিন পূর্বে ঢাকায় ফিরে এলাম।” প্রতিবাদের এই যে বীজ রোপিত হয়েছিলো সেদিন- দিনে দিনে পুঞ্জীভূত হতে হতে নানা ত্যাগের মধ্য দিয়ে তা একদিন পূর্ণতা পায়, একসময় আসে বাঙালির স্বাধীনতা। সেই সংহতি ছিলো বাঙালির জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। বাঙালি জাতির সেই ঐক্যের ফল সম্মিলিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের জানুয়ারী মাসে আটকাবস্তায় গোপনে বৈঠক করে বঙ্গবন্ধু ২১ শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন ও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ঘোষনা দেন। সেদিন ১৪৪-ধারা জারি করেও প্রতিবাদী ও সংঘবদ্ধ জনতাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি পাকিস্তান সরকার। একুশে ফেব্রুয়ারি সেই দিনে সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রজনতা এসে সমবেত হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ছাত্রসভা। সেই সভায় মাতৃভাষার মুক্তির লক্ষ্যে দীপ্ত তারণ্য ১৪৪-ধারা ভেঙে ভাষার দাবিকে নিয়ে এগিয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। সভা শেষে ছাত্রজনতা প্রতি দশজনের এক-একটি দল স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় নামে এবং গ্রেফতার বরণ করতে থাকে। বেলা গড়িয়ে গেলে- এক পর্যায়ে বিকেলের দিকে পুলিশ ও ছাত্রজনতার সংঘাত বাধে। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে ছাত্রদের উপর। ঘটনাস্থলেই মারা যায়- রফিক উদ্দিন ও আবদুল জব্বার, আর আহত হয় অনেকেই। আহতদের মধ্যে আবুল বরকত শহীদ হন হাসপাতালে। এই হলো ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি - আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক মহান দিন। একুশের চেতনা- মাতৃভাষার প্রতি পরম মমত্ববোধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আত্মপরিচয়ের তাগিদ থেকে উৎসারিত এক বোধ।

একই মাসে শহীদদের রক্তের বিনিময়ে ভাষা আন্দোলন যৌক্তিক পরিণতি লাভ করে যার হাত ধরেই ১৯৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসের মধ্য দিয়ে স্বাধীন দেশের চলার পথ সুগম হয় যেখানে একুশের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একে অপরের পরিপূরক।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, আমি ঘোষণা করছি আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা পায় বাংলা। এ ভাষার মর্যাদা আজ পৃথিবীজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এবং জাতিংসঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ঘোষণা অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’’এর মর্যাদা লাভ করে। এর পর  ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে প্রতি বছরে ২১ ফেব্রুয়ারি  আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে যা বাংলার বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় এটি একটি বড় ধাপ।

এখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ৫০ বছরের বাংলাদেশের পথপরিক্রমায় আমরা সমাজের সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে কতটুকু প্রতিষ্ঠা করতে পেড়েছি তা মূল্যায়নের সময় এসেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণে জাতীর নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের অন্যতম হলো অমর একুশে গ্রন্থমেলা যা করোনা মহামারির কারণে এবার এই মেলা ১৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে বলে জানা গেছে বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে যার এখন বিস্তৃত লাভ করবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত। অথচ যে গণতান্ত্রিক চেতনায় ভাষা আন্দোলন তথা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল সেই চেতনায় রাষ্ট্র ও সমাজ চলছে কিনা এই প্রশ্নটি রয়েই গেল। আজও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করা যায়নি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বটে, কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে তা ভাবনার বিষয়, শিক্ষাব্যবস্থা একমুখী হলো না,  রাষ্ট্রের রাজনৈতিক/ভৌগলিক পরিবর্তন হলেও সমাজ পরিবর্তন হলো না কেন? কিন্তু আমরা বর্তমান প্রজন্ম কি বেজায় ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত এই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারছি? পারছি কি নিজ ভাষাকে সবার সামনে মর্যাদার সঙ্গে উপস্থাপন করতে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস, আদালত সহ সব জায়গাতেই বাংলা ভাষার চর্চা খুব সামান্য। কিন্তু বাঙালির বহু ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত এই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছি সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছি! মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ভালোবাসা রেখে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ভিন্নভাষী অনেক মানুষ বাংলা ভাষা শিখছেন। তবে কেন আমরা বাঙালি হয়ে নিজ মাতৃভাষার চর্চায় পিছিয়ে থাকব। অবশ্যই আমাদের সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে নিজ বুকে লালন করতে হবে। বাঙালি হিসেবে এটা আমাদের দায়িত্ব, কারণ যেদিন থেকে আমরা মাতৃভাষার অধিকার পেয়েছি, সেদিন থেকেই আমরা এ ভাষার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছি। বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে একমুখী শিক্ষাব্যস্থার প্রচলন ঘটাতে হবে। একুশের শিক্ষা হলো সমষ্টিক উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি। শুদ্ধ স্বদেশি সাংস্কৃতিক চর্চা ও উন্নয়ন, একটি আত্মনির্ভরশীল ভাষাগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্বের বুকে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার অতীব জরুরি। একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত ভাষা রেখে যেতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর আন্দোলনকে বাস্তবায়ন করতে হবে এখনই। বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন না হবার পেছনে রাজনৈতিক উদাসীনতাকেই দায়ী বলে মনে করেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগন যা দীর্ঘ চেষ্টার পরও সব ক্ষেত্রে বাংলার প্রচলন করা যায়নি। ১৯৮৭ সালে দেশে আইন করা হয় যে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না যা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে তা মোটেই সুখকর নয়। তাই বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে ব্যবহার ও প্রয়োগ করা নিয়ে হাইকোর্টের যে সিদ্ধান্ত, সেটাও প্রয়োগ করার দিকে নজর দিতে হবে এবং ভাষা শহিদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা ও বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন অপরিহার্য। এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে সবাইকে সাথে নিয়ে।

লেখক: গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।