
রাঙামাটি প্রতিনিধি: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলধারা ও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মৎস্য উৎপাদন ক্ষেত্র রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ। যা দেশের মিঠা পানির মাছের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত।
পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। ১৯৬২ সালে এর নির্মাণ শেষ হয়। এরপর পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি ডুবে যায় এবং এ হ্রদের সৃষ্টি হয়। এর পর থেকে চাকমা রাজবাড়ীসহ হাজার হাজার পরিবার উদ্ধাস্তু হলেও সৃষ্টি হয় মাছের বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র, উৎপাদিত হয় বিদ্যুৎ।
বাণিজ্যিভাবে মাছের দিন দিন উন্নয়ন একই সঙ্গে হ্রদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার সুফল ভোগ করছেন এ অঞ্চলের ২২ হাজারেরও অধিক মৎস্যজীবী। এ হ্রদ থেকে আহরিত মাছ রফতানি করা হয় চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। অর্থনীতির বড় একটি চালিকা শক্তি বৃদ্ধি হতে থাকায় তা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। গত ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে রাজস্ব আয় করেছে ১২ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৫-৬৬ অর্থ বছরে মাত্র ১২০৬ দশমিক ৬৩ মেট্রিকটন মৎস্য উৎপাদনের মাধ্যমে কাপ্তাই হ্রদ থেকে বাণিজ্যিকভাবে মাছের উৎপাদন শুরু হয়। ২০২০-২১ অর্থ বছরে কাপ্তাই হ্রদ থেকে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৩৪৫ মেট্রিকটন মাছ। আর এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১২ কোটি ১৩ লাখ টাকা। জেলার চারটি মৎস্য অবতরণ ঘাট থেকে গত এক বছরে ৬ হাজার ৭৯৮ মেট্রিকটন মাছ গেছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, ১৯৬৪ সালে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে চিংড়ি, কচ্ছপ, ডলফিনসহ ৭৬ প্রজাতির মিঠা পানির পাওয়া যেত। যার মধ্যে দেশীয় ৬৮ প্রজাতির ও বিদেশি ৮ প্রজাতির মাছ। দেশের চাহিদা মিটিয়ে যা রফতানি হতো বিদেশেও। কিন্তু ড্রেজিংয়ের অভাব, হ্রদের গভীরতা হ্রাস, পানি ও পরিবেশ দূষণের কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এ হ্রদের বহু প্রজাতির মাছ।
ক্রমাগতভাবে তা হ্রাস পেয়ে নেমে আসে ৪২টি প্রজাতিতে। এতো কিছুর পরও এখনো ৩৫ প্রজাতির মাছ হ্রদ থেকে বাণিজ্যিকভাবে আহরিত হচ্ছে। এসব মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাণিজিকভাবে বিক্রি হচ্ছে চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।
কাপ্তাই হ্রদ থেকে বর্তমানে আহরণ করা হচ্ছে রুই, কাতলা, চিতল, সিল, দেশি সরপুঁটি, কালি বাউশ, শিং, কই, তেলাপিয়া, কাচকি, চাপিলা, আইড়, বোয়াল, গজার, শৈল, মাগুর, টেংরা, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, বাঁচা, গ্রাস কার্প, কার্পিও, রাজপুঁটি, তেলে নাইলোটিকা, ইল্যা, চিংড়ি, পুঁটি, বাটা, কাকিলা, দেশি পাঙ্গাস, মৃগেল, টাকি, বাশঁপাতা, বাইম, ফলি, কাজরী, ঘনিয়া, কাঁটা মাইল্যা, তেলে মোজাম্বিকা, থাই মহাশোল, থাই পাংগাস ও আফ্রিকান মাগুর।
এক সময় কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন ছিল প্রায় ৮১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। যা ক্রমশ হ্রাস পেয়ে ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ছোট মাছ বিশেষ করে চাপিলা, কাচকি, মলার উৎপাদন বেড়ে ৯০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) রাঙ্গামাটি অঞ্চলের হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লে. কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম জানান, কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য উৎপাদন প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি রাজস্ব পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে তেমনি স্থানীয় মানুষের আমিষের যোগান দেয়াও সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি এ এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে হ্রদের মাছ ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। মাছের প্রজনন মৌসুমে যথেষ্ট পরিমাণ বৃষ্টি হলে মাছের উৎপাদন আরো অনেক বেশি বাড়ানো যেত।
তিনি আরো বলেন, বিএফডিসি রাঙ্গামাটির মারিশ্যার চরে একটি হ্যাচারি স্থাপন করেছে। এ হ্যাচারিতে মাছের প্রাকৃতিগতভাবে প্রজনন ঘটিয়ে পোনা মাছ উৎপাদন করা হচ্ছে। তবে এই হ্যাচারি এখনো বাণ্যিজ্যিকভাবে চালু করা হয়নি। এ হ্যাচারিকে বাণ্যিাজ্যিকভাবে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত বছরের মে মাসে দেশের সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলরাশি রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন, পোনা মাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণসহ কাপ্তাই হ্রদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে তিন মাসের জন্য হ্রদ থেকে সকল প্রকার মৎস্য আহরণ, বাজারজাতকরণ এবং পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন বিএফডিসি ও রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন। এরপর ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিনিয়োগবার্তা/এসএল//