Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Thursday, 24 Mar 2022 06:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

 

ড: মিহির কুমার রায়: স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর এ মাহেন্দ্রক্ষণে সর্বসাধারণের জন্য পেনশন স্কিমের উদ্যোগ সরকারের দূরদর্শী চিন্তার একটি সফল প্রতিফলন। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন ছিল বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে ক্ষুধা,  দারিদ্র্য ও বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বসাধারণের জন্য যে পেনশন-ব্যবস্থা প্রচলনের উদ্যোগ নিয়েছেন যা প্রশংসনীয় ও সময় উপযোগী উদ্যোগ। এটি দেশের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে সরকার এরই মধ্যে কৌশলপত্র তৈরি করেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করতে গিয়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ ব্যাপারে সরকারের চিন্তাভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। পরবর্তিতে বর্তমান অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের অবহিত করলেন যে, আগামী এক বছরের মধ্যে চালু হতে যাচ্ছে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা। অর্থমন্ত্রী এই ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য যেসব বিষয় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করেছেন সেগুলো যদি স্বচ্ছতা ও বিধির মাধ্যমে চালু করা যায় তাহলে সমাজ জীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থমন্ত্রীর কথা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সের যে কোনো কর্মক্ষম নাগরিক পেনশন সুবিধার আওতায় আসবেন, প্রবাসীরাও বাদ পড়বেন না। শুধু ব্যক্তি পর্যায় নয়,  প্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। ব্যবস্থাটির আওতায় গ্রাহক যে পরিমাণ টাকা মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে জমা দেবেন তার সমপরিমাণ টাকা দেবে সরকার,  জমাকৃত অর্থ বিনিয়োগ করে যে লাভ অর্জিত হবে তারও হিস্যা পাবেন গ্রাহক। পরে প্রাপ্তিযোগ্য বয়সে মাসিক ভিত্তিতে পেনশন হিসেবে প্রদান করা হবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ। নিম্ন আয়ের মানুষের মাসিক চাঁদার একটি অংশ সরকার অনুদান হিসেবে দেবে। প্রাথমিক পর্যায়ে কর্মসূচিটি ঐচ্ছিক, পরে তা বাধ্যতামূলক হবে। ‘জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করে একে সমুদয় কার্যাদি দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হবে।

২০২১ সালের মে মাসে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফ তাদের এক নীতিপত্রে জানিয়েছে, বাংলাদেশ প্রবীণপ্রবণ সমাজে প্রবেশ করবে ২০২৯ সালে। ২০৪৭ সালে সমাজটি প্রবীণপ্রধান সমাজে রূপান্তরিত হবে। জনসংখ্যাবিদদের মতে মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ বা তার বেশি মানুষের বয়স ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে হলে সেটি হবে প্রবীণপ্রবণ সমাজ। আর মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ বেশি মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি হলে তা হবে প্রবীণপ্রধান সমাজ। নিজেদের করা একটি প্রক্ষেপণের সূত্র ধরে অর্থমন্ত্রী বলছেন,  বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান গড় আয়ু ৭৩ বছর থেকে ২০৫০ সালে ৮০ বছর এবং ২০৭৫ সালে ৮৫ বছরে গিয়ে ঠেকবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে, যার অন্য অর্থ হলো কর্মে-অক্ষম নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়বে। পরিবারের অবহেলা থেকে বাঁচানোর তাগিদ থেকে রাষ্ট্রকেই পাশে দাঁড়াতে হবে প্রবীণদের। ২০২৯ সাল দূরে নয়, তাই এখন থেকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সেটিই হবে সঠিক পদক্ষেপ। এতদিন কেবলমাত্র সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় কর্মরতরা এই পেনশন সুবিধা ভোগ করতেন যারা মোট জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ তারা। সুবিধা সম্প্রসারিত হয়ে যদি সাধারণ মানুষ পর্যন্ত গড়ায় তো তা সন্দেহাতীত ভালো খবর। ২০৪১ সাল নাগাদ আমরা উন্নত রাষ্ট্রের নিবাসী হওয়ার স্বপ্ন দেখি, সে স্বপ্ন নিরর্থক প্রতীয়মান হবে যদি না সামাজিক নিরাপত্তার বলয় বাড়ানো যায়। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রবর্তন হতে পারে লক্ষ্য পূরণে একধাপ অগ্রগতি।

বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোতে দারিদ্র্যের হার হ্রাস আশাব্যাঞ্জক হয়েছে,  কিন্তু করোনা পরিস্তিতির প্রভাবে আবার অতি দারিদ্র্য এবং সার্বিকভাবে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই এখন সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁডিয়েছে চরম দারিদ্র্য তথা সার্বিক দারিদ্র্যের হার যাতে পুনরায় বৃদ্ধি না পায় তা যথার্থভাবে মোকাবিলা করা। আর এক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোগ ও কর্মসূচি গ্রহণ গুরত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা,  বিধবা ভাতাসহ সরকারের আরও কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চলমান। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কখনও কখনও সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল কারও কারও বিরুদ্ধে অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ভালো উদ্যোগ অনিয়ম-দুর্নীতি-অস্বচ্ছতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়ার নজিরও আমাদের সামনে রয়েছে। বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনেক সফলতার কাহিণি রয়েছে সত্যি কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টন না হওয়ার কারনে অনেকেই এর সুফল পাচ্ছেনা। যারা বেসরকারি খাতের সঙ্গে যুক্ত, তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা তেমন কিছুই পান না। বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেগুলো চলমান, সেগুলোর বেশিরভাগই বয়স্ক-দরিদ্রদের জন্য, যার কোনোটিই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সেই অর্থে নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এখানে উল্লেখ্য যে এই সময়টি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী তথা মুজিব বর্ষের বছর যেখানে অনেক প্রপ্তির মধ্যে অপ্রাপ্তিও রয়েছে যা আমাদের পূরন করতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে যা সকলেরই জানা রয়েছে এবং সরকার ঘোষিত সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা যে বিশাল কর্মযজ্ঞ- এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্নিষ্ট মহল আন্তরিক রয়েছেন বলে প্রতিয়মান হয় যদিও মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দূরদর্শী পরিকল্পনা ও এর সফল প্রয়োগ জরুরী। ক্ষুদ্রাকৃতির একটি দেশে বিপুলায়তন জনগোষ্ঠী- এই বাস্তবতা স্বভাবতই অসংখ্য সমস্যার জন্ম দেবে। সেসব মাথায় রেখেই এগোতে হবে এবং আমাদের মনে রাখতে হবে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী ভাঙন ইত্যাদি রোধ করা না গেলে ভূমিহীন-আশ্রয়হীনের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়বে, সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কুলাতে পারবে না। শিক্ষা ও চিকিৎসা পরিস্থিতি পঞ্চাশ বছরের পথ পরিক্রমা শেষে যে পর্যায়ে উন্নীত, তাকে কাল-বিবেচনায় সন্তোষজনক বলা যাবে না। তবে সরকারের প্রচেষ্টার কোন ঘাটতি নেই এই জনবহুল দেশটিতে যদিও তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তারই অংশ হিসাবে এই ব্যবস্থায় সামাজিক নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত হবে,  সর্বজনীন পেনশন তহবিলে যত অর্থ জমা হবে এবং এর অংশবিশেষ সরকার নানাখাতে বিনিয়োগ করার সুযোগ পাবে। যা হবে উৎপাদন ও কর্মসংন্থানমুখী। তাই সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসাবে ঘোষিত পেনশন-ব্যবস্হা উন্নয়ন মুজিব বর্ষের শ্রেষ্ঠ উপহার।

লেখক: গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।