Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Monday, 28 Mar 2022 00:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

নিজস্ব প্রতিবেদক: রফতানি সম্ভাবনা থাকলেও হিজাব, বোরকা ও আবায়ার মতো পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ এবং রফতানি ভিত্তি দুর্বল। হালাল পোশাক হিসেবে পরিচিত এ ধরনের পণ্যকে বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতের অন্তর্ভুক্ত করেছে সরকার। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব পণ্যের প্রকল্পে ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। যে ঋণের সুদ হবে হ্রাসকৃত হারে।

শুধু হালাল ফ্যাশন নয়, হ্রাসকৃত হারের সুদে প্রকল্প ঋণ পাবে এমন পণ্যের মধ্যে আরো রয়েছে ইলেকট্রনিক পণ্য, হালাল মাংস ও মাংসজাত পণ্য, রিসাইকেলড পণ্য এবং মেডিকেল ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (এমপিপিই) পণ্যে। গত ২৩ মার্চ থেকে কার্যকর ২০২১-২৪ মেয়াদের রফতানি নীতিতে এসব সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা, রফতানি খাতের চাহিদা এবং বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্যমূলক নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে প্রতি তিন বছর পর রফতানি নীতি প্রণয়ন করা হয়। যার ধারাবাহিকতায় প্রণয়ন হয়েছে ২০২১-২৪ মেয়াদের রফতানি নীতি।

নীতির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে সুষ্ঠু ভারসাম্য আনা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রণয়ন করা রফতানি নীতির অন্যতম উদ্দেশ্য। এছাড়া রফতানি সহায়ক পরিবেশের কাঙ্ক্ষিত এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে রফতানি বাণিজ্যে গতিশীলতা আনা, বাণিজ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের স্থান সুদৃঢ় করার জন্যও ভূমিকা রাখে রফতানি নীতি।

রফতানি নীতির রফতানি বহুমুখীকরণ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতের বিষয়ে। এ খাতগুলোয় প্রদেয় সুযোগ-সুবিধার প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হ্রাস করা সুদহারে প্রকল্প ঋণ প্রদান করা। এছাড়া সুযোগ-সুবিধার মধ্যে আছে আয়কর রেয়াত প্রদান করা। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ইত্যাদি ইউটিলিটি সার্ভিসের ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কৃষি চুক্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা বা ভর্তুকি প্রদান।

সুযোগ-সুবিধার মধ্যে আরো আছে সহজ শর্তে ও হ্রাসকৃত সুদহারে রফতানি ঋণ প্রদান করা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিমানে পরিবহনের সুযোগ। শুল্ক প্রত্যর্পণ/বন্ড সুবিধা। উৎপাদন ব্যয় সংকোচনের উদ্দেশ্য অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সহায়ক শিল্প স্থাপনে সুবিধা। পণ্যের মানোন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক এবং কারিগরি সুবিধা সম্প্রসারণ। কমপ্লায়েন্ট শিল্প স্থাপনে বিনা শুল্কে ইকুইপমেন্ট আমদানির ব্যবস্থা করা। পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতে সহায়তা প্রদান। বহির্বিশ্বে বাজার অন্বেষণে সহায়তা প্রদান করা। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।

এসব সুযোগ-সুবিধা পাবে এমন বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতের পণ্য মোট ১৯টি। যার মধ্যে চারটি পণ্য সর্বশেষ নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন চার পণ্যের মধ্যে আছে হালাল ফ্যাশন পণ্য যেমন হিজাব, বোরকা ও আবায়া। হালাল মাংস ও মাংসজাত পণ্য এবং অন্যান্য হালাল পণ্য। রিসাইকেল্ড পণ্য এবং মেডিকেল ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (এমপিপিই)।

বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতের অন্য পণ্যগুলো হলো ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক, সিরামিক, মূল্য সংযোজিত হিমায়িত মাছ, প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, কাটিং ও পলিশকৃত মসৃণ হীরা ও জুয়েলারি, পেপার ও পেপার প্রডাক্টস, রাবার ও রাবারজাত, রেশম সামগ্রী, হস্ত ও কারুপণ্য, লুঙ্গিসহ তাঁত শিল্পজাত পণ্য, ফটোভলটিক মডিউল (সোলার এনার্জি), কাঁচা এবং প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম, জীবন্ত ও প্রক্রিয়াজাত কাঁকড়া, খেলনা এবং আগর।

২০২১-২৪ মেয়াদের রফতানি নীতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে এমন খাত আছে ১৪টি। এসব খাতের পণ্যের মধ্যে আছে অধিক মূল্য সংযোজিত তৈরি পোশাক-ডেনিম, কৃত্রিম ফাইবার, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, ওষুধ, প্লাস্টিক, চামড়াজাত-অচামড়াজাত ও সিনথেটিক জুতা এবং চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য-ফল-কাট ফ্লাওয়ার, অটো-পার্টস, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল ব্যাটারির মতো লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, জাহাজ ও সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার নির্মাণ, ফার্নিচার, হোম টেক্সটাইল ও হোম ডেকর, টেরিটাওয়েল, লাগেজ এবং অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস এবং ল্যাবরেটরি বিকারক।

দেশের পণ্যভিত্তিক রফতানি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট আটটি পণ্য মোট রফতানির বৃহৎ অংশজুড়ে আছে। এসব পণ্যের মধ্যে আছে ওভেন পোশাক, নিটওয়্যার, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, কৃষিজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চামড়া-চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা এবং প্রকৌশল পণ্য। মোট রফতানির ৯৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে এ পণ্যগুলো। পণ্যভিত্তিক রফতানির এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রফতানি বৈচিত্র্যকরণ উদ্যোগ থাকলেও প্রতিফলন সেভাবে নেই। সম্ভাবনাময় হওয়ার পরও গতি পাচ্ছে না অনেক খাতের রফতানি।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার রফতানি বাণিজ্যকে বেগবান করতে ও বৈচিত্র্যকরণ নিশ্চিত করতে দিকনির্দেশনামূলক অবস্থান থেকে নীতি প্রণয়ন করে। যার মধ্যে রফতানিতে সুফল বয়ে আনতে সম্ভব এমন অনেক নীতি থাকে। কিন্তু এসব নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনামূলক তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। ফলে নীতি থাকলেও সেগুলোর সুফল বাস্তবে দেখা যায় না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের রফতানি খাত মূলত পোশাক খাতনির্ভর। পোশাক খাতের রফতানির আকার ও প্রবৃদ্ধির গতি অনেক বেশি। পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোর রফতানি বাড়লেও সেগুলোর ব্যাপ্তি পোশাকের তুলনায় অনেক কম। তবে ধীরগতিতে হলেও রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আসতে শুরু করেছে সরকারের তরফ থেকে কার্যকর উদ্যোগের ফল হিসেবে। কিন্তু সরকারের উদ্যোগগুলোর সুফল রাতারাতি পাওয়া যাচ্ছে না। আর রফতানি বৈচিত্র্যকরণ নিশ্চিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নীতিসুবিধা আদায়, প্রাপ্তি, কার্যকর হওয়া সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে রফতানি খাতকে আরো বৈচিত্র্যময় করা যাবে।

ইপিবি ভাইস চেয়ারম্যান এএইচএম আহসান বলেন, আর্থিক, নীতি থেকে শুরু করে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে পোশাক ও পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোকে একই সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজন আছে। নন-আরএমজির অভ্যন্তরীণ বাজার এত বড় যে উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক বাজারের বিষয়ে উৎসাহ পান না। উৎসাহ বাড়ানোর জন্য সহায়ক নীতিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারমুখী করতে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের জন্য ভিন্ন ধরনের নীতিসহায়তার বিষয়ে ভাবতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে মান ও খরচ একটা বড় বিষয়। অভ্যন্তরীণ বাজারে মানের বিষয়ে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন তুলনামূলক কম বলে খরচও এক্ষেত্রে কম। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে মান উন্নত হতে হয়, সেজন্য খরচও বেশি করতে হয়। আমাদের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ মুহূর্তে দক্ষতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করতে উদ্যোক্তা উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কৃষি, চামড়াজাত পণ্যে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এ খাতগুলোর বাজার সম্প্রসারণেও। এছাড়া মৎসসহ অন্যান্য অপ্রচলিত পণ্য রফতানিতে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হবে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্লাস্টিক পণ্য খাতকে এরই মধ্যে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রকল্প চালু আছে। আরো অনেক বিষয়ে সরকার কাজ করছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রফতানি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, রফতানি খাত আন্তর্জাতিক ক্রেতা নির্ভর। দাম ও মানের মতো অনেক বিষয় রফতানি খাতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। নীতি-বৈষম্যের বিষয়গুলো এরই মধ্যে বিবেচনায় নেয়া শুরু হয়েছে।- বণিক বার্তা।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//