Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Wednesday, 20 Apr 2022 06:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

ড: মিহির কুমার রায়: হাওরের অবস্থাটা অনেকটা এরকম যে কবে ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে অকাল বন্যা হবে তা কেহ বলতে পারে না। প্রায় সময়েই মেঘালয় ও আসামের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হলে সেই পানি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন হাওরে ঢুকতে শুরু করে যা এ বছর হয়েছে। সাধারণত চৈত্রের শেষে ধান কাটা শুরু হয় এবং চলে বৈশাখ মাস জুড়ে। এ ধান দিয়েই হাওর পাড়ের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। এ বছরও সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০০ একর জমির ধান ইতোমধ্যেই তলিয়ে গেছে। অনেক বাঁধে দেখা দিয়েছে ফাটল। কৃষক ও এলাকাবাসী দিনরাত বাঁধের পাশে থেকে নিজেরাই বিনা শ্রমে বাঁধে মাটি কাটছেন। আর দায়িত্বশীল পানি উন্নয়ন বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণ হিসেবে কাঁকড়া আর ইঁদুরকে চিহ্নিত করেছেন। যারা ভুক্তভোগী কৃষক তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলে জানা যায়, যারা প্রকৃত জমির মালিক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের বাঁধ নির্মাণ কমিটিতে রাখা হয় না। সঠিকভাবে বাঁধের কাজ হয় না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। অকাল বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় কৃষকের স্বপ্নের ধান। পরিস্থিতি এমন যেন তাকিয়ে থাকা ছাড়া এ পরিস্থিতিতে ওই এলাকার কৃষকের কিছুই করার নেই। কারণ বেশির ভাগ জমির ধান থাকে কাঁচা। আর কাঁচা ধান তো কাটার উপায় নেই। কাঁচা ধান কেটেও লাভ নেই। চেয়ে চেয়ে দেখা আর বোবা কান্না ছাড়া যেন কিছুই করার নেই। সাধারণত সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওর সমূহ নিয়ে হাওর অঞ্চল গঠিত, যেখানে রয়েছে ৬২টি উপজেলার ৫৪১টি ইউনিয়ন। হাওর বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠে বিশাল জলরাশি, যা বর্ষার চিত্র। যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। গ্রামগুলো যেন দ্বীপের মতো ভাসতে থাকে পানির ওপর। আবার শুকনো মৌসুমে যে দিকে চোখ যায় অবারিত সবুজের সমারোহ। হাওর জুড়ে শুধু ধান আর ধান।
 
আবার বেষ্টিক অর্থনীতির মানদন্ডে হাওর অঞ্চল থেকে যে ধান উৎপাদন হয়ে চাল আকারে দেশের কেন্দ্রীয় স্টকে জমা হতো যার আর্থিক মূল্য ৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা যা দেশের জিডিপিতে অবশ্যই একটা প্রভাব ফেলবে নিশ্চয়। কারণ দেশের সার্বিক উন্নয়নে হাওর অঞ্চল থেকে শতকরা ১৮ ভাগ চাউল খাদ্য নিরাপত্তায় সংযোজন হয় এবং শতকরা ২২ ভাগ গবাদিপশু এই অঞ্চলে লালিত পালিত হয়, মৎস্য ভান্ডারে ভরপুর এই অঞ্চল দেশের আমিষের চাহিদা পূরণে এক গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে বর্তমান দুটি মাসেই কৃষকরা একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকে পাহারী ঢলের বন্যার পানি কখন আসবে যেমন এ বছর এরি মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার ছোট-বড় শতাধিক হাওরের মধ্যে ১৫টিতেই সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাড়ছে পানি। ভাঙছে বাঁধ, ইতোমধ্যেই তলিয়ে গেছে আনুমানিক ৭ হাজার হেক্টর বোরো ফসল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ১২টি বাঁধ ভেঙে ৪৩৫০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ না করা, অর্থ ছাড় না করা, প্রকৃত কৃষকদের পিআইসির অন্তর্ভুক্ত না করার ফলেই দুর্বল বাঁধের কাজ হওয়ায় প্রথম ধাক্কায় বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে কৃষকদের স্বপ্ন সাধ চুরমার হয়ে গেছে,  এমন অভিযোগ সুনামগঞ্জবাসীর। সুনামগঞ্জ জেলার ১২ উপজেলার ৪২টি হাওরে ৭২৭ টিপিআইসি ১৩৫টি ক্লোজারসহ মোট ৫৩২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের ও সংস্কারের জন্য সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ১২১ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করে। বাঁধের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ার পর আরও ১০ দিন সময় বৃদ্ধি করার পরও কাজ শেষ হয়নি। এরই মধ্যেই সীমান্তের ওপার থেকে পাহাড়ি ঢল এসে ফসল রক্ষা বাঁধের সর্বনাশ করে সুনামগঞ্জবাসীকে চরম উদ্বিগ্ন করে। ইতোমধ্যে সেখানকার দিরাই, শাল্লা, তাহিরপুর ও ধর্মপাশায় বিভিন্ন ছোট-বড় হাওরে ধান তলিয়ে গেছে। আর যেগুলো এখনো তলিয়ে যায়নি সেগুলোও রয়েছে ঝুঁকির মুখে। সুনামগঞ্জসহ হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ২০১৭ সালের কথা ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছেন কৃষকেরা। ওই বছরের অকাল বন্যায় হাওর অঞ্চলের কাঁচা ধান তলিয়ে গিয়েছিল পানির নিচে। ভাসিয়ে নিয়েছিল ক্ষেতের ধান, সেই সঙ্গে মাছ, মুরগি, গরু-ছাগলের খামারও। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় হাওরাঞ্চলে সাধারণত এপ্রিলের শেষ দিকে ভারত থেকে নেমে আসে উজানের পাহাড়ি ঢল এবং এ পানিটা থাকে কয়েক মাস। আর কৃষকরা সাধারণত বৈশাখের শুরুর দিকে অর্থাৎ এপ্রিলের মাঝামাঝিতে পাকা ধান কেটে মাড়াই করে ঘরে তোলে। হাওরে ২০১৭ সালে বন্যা হয়েছিল এপ্রিলের শুরুর দিকে। এবারও হয়েছে প্রায় একই সময়ে। সেখানকার কৃষকেরা তাই খুব আতংকের মধ্যে আছেন। 

কিছুদিন আগে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সুনামগঞ্জ এসেছিলেন ভাটির মানুষের দুঃখ ভাগ করে নিতে। তিনি বলেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য যে প্রজ্ঞা, মেধা ও সংগ্রামকে লালন করেছেন তা হাওরেরই দান। তাই আজ রাষ্ট্রপতির চেয়ে আমার বড় পরিচয় আমি হাওরী মানুষ। এজন্য তিনি ভালো করেই জানেন এখানকার প্রতিটি মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র নির্ধারক হাওরের বোরো ধান। সত্যি কথা বলতে কি, এখানকার মানুষের স্বপ্নের প্রতিটি উপাদানই হাওর কেন্দ্রিক। কিন্তু প্রায় প্রতি বছর এই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় গুটিকয়েক কারণে। সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার, ৪২টি হাওরের প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। এই ফসল রক্ষার জন্য প্রতি বছর এই কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এবারো বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রায় ৬৯ কোটি টাকা। ২০১১ সালে এই বরাদ্দ ছিল ১২ কোটি টাকা। মহামান্য রাষ্ট্রপতি বলেন ভাটির বুকে একটি কথা প্রচলিত আছে, বাঁধের জন্য যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ হয়, সেই টাকা ধাতব মুদ্রায় রূপান্তরিত করে বাঁধ দিলে তা ডুববে না। তারপরেও অধিকাংশ বছরই বাঁধ তলিয়ে যায়। কোনো কোনো বছর ভাগ্য বিধাতা সহায় হলে রক্ষা পায়। হাওর পারের অনেক বাঁধই স্থায়ী ভাবে নির্মাণ করা সম্ভব। বাঁধের ওপর স্থায়ী বসতি স্থাপন ও পর্যটন স্পট গড়ে তোলা সম্ভব। দেশের যে কোনো দুর্যোগে সেনা বাহিনীকে কাজে লাগাতে দেখা যায়। হাওর পারের এই বাঁধের দায়িত্ব সেনা বাহিনীকে দেয়া যেতে পারে। নদীগুলো খননের ব্যবস্থা করা, কারণ পলি পড়ে নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। মোটামুটি এই চারটি পদক্ষেপ নিলে হাওর পারের মানুষের সমস্যা শতভাগ দূরীভূত হবে। আমরা জানি,  ঢাকা শহরের একটি ফ্লাইওভারের জন্য শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। হাওর পারের বাঁধের জন্য এক কালীন বড় আকারের বরাদ্দ দিয়ে, কাজের সঠিক মান নিশ্চিত করতে পারলে হাওর বাসীর দুঃখ চিরতরে দূর হবে। 

হাওর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্টদের এখনই ব্যবস্থা নিতে না পারলে খুব ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হবে। এ ক্ষতি শুধু হাওর অঞ্চলের কৃষকদের নয়। এ ক্ষতি সারা দেশের। এটা ঠিক, হাওরের অকাল বন্যা একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার উৎসস্থল আবার দেশের বাইরে। তাছাড়া মেঘালয় ও আসামে যে বৃষ্টি হয় তার একটা অংশ সংশ্লিষ্ট নদীগুলো হয়ে আমাদের হাওরেই এসে জমা হয়। অতএব এ দুর্যোগ ঠেকানো সহজ ব্যাপার নয়। আবার এটাও তো ঠিক যে, সীমান্তের ওপারে বছরে কোন সময়ে কতটুকু বৃষ্টি হয় তার রেকর্ড আমাদের অজানা নয়। আবার সেখানে আগামী কয়েক দিন কী পরিমাণ বৃষ্টি হতে পারে, তার আগাম তথ্য জানাও দুই দেশের মধ্যে বন্যা বা আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় চুক্তি থাকার কারণে খুব একটা কঠিন বিষয় নয়। এসব তথ্য জানা থাকলে পাহাড়ি ঢল ঠেকানো না হোক তার কারণে যাতে কম ক্ষয়ক্ষতি হয় অন্তত সে ব্যবস্থা নেয়া যায় নিশ্চয়ই। 

হাওরে মানুষ যুদ্ধ করছে প্রকৃতির সাথে যার সহযাত্রী হিসাবে থাকবে সরকার এই উপলদ্ধিটি প্রতি বছর বন্যায় তাদেরকে নূতন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। এখন সরকারের উচিত হবে এই অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলোর উপলব্দির প্রতি সম্মান প্রদর্শনসহ জীবন মানের উন্নয়ন। এই কাজের বহি:প্রকাশ স্বরূপ আসন্ন বাজেটে এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র বিমোচন, সংস্কৃতি রক্ষা প্রভৃতি খাতে বিশেষ ব্যয় বরাদ্দ সংযোজন করা এবং এর সফল বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দেয়া। প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেয়া যেমন সময়ের আবর্তে পলি সংযোজিত হয়ে হাওরের জলাশয়গুলোর ভরাট হওয়ায় অল্প বর্ষায় প্লাবিত হওযার ঝুঁকি নিরসন এবং ডেজিং এর মাধ্যমে এই জলধারাগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধি, বাঁধ নির্মানের টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার যার সাথে এই অঞ্চলের ভৌগলিক পরিবেশের সামঞ্জস্য থাকবে, পানি ব্যবস্থাপনায় এলাকার বাসিন্দাদেরকে সম্পৃক্ত করে কর্ম পরিকল্পনা তৈরি যা হবে একটি চলমান প্রক্রিয়। ক্ষতিগ্রস্থ চাষীদের পূনর্বাসনে সরকারি আয়োজনের পাশাপাশি বেসরকারী আয়োজন সমন্বিতভাবে করা, যাতে সেবা উপকরণ বিতরণে কোন অভাব লোপন কিংবা ডুপলিকেটিং না হয় যা হবে সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে পরিচালিত রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়। বন্যার পানি চলে যাওয়ার সাথে সাথে এই অঞ্চলে বর্ষা আসবে যা হবে প্রায় ছয় থেকে সাত মাস স্থায়ী। এই মৌসুমে হাওরবাসীর জন্য বিকল্প কর্মসংন্থান সৃষ্টির ক্ষেএ তৈরী করতে হবে যেমন যান বাহনের জন্য নৌকায় অর্থায়ন, মহিলাদের জন্য কুটির শিল্পের ব্যবস্থা করা, জলায় হাস পালনে সহায়তা করা ইত্যাদি। 

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও সমাজ গবেষক।