
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক: দেশের অন্যতম বৃহৎ করপোরেট গ্রুপ প্রাণ। এ গ্রুপের দুগ্ধপণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রাণ ডেইরি। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত রফতানি করলেও বিল অব এক্সপোর্ট-সংশ্লিষ্ট ইএক্সপির বিপরীতে জাহাজীকরণের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন মনিটরিং সিস্টেমে দেয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রাণ ডেইরির ইউজার আইডি লক বা বন্ধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
শুধু প্রাণ ডেইরি নয়, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ১০০-এরও বেশি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান জাহাজীকরণের তথ্য (ডুপ্লিকেট) অনলাইন মনিটরিং সিস্টেমে দেয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, জাহাজীকরণের তথ্য পাওয়া যায়নি এমন রফতানির অর্থমূল্য ১২ কোটি ডলারেরও বেশি। এর মধ্যে ৮০ লাখ ডলারের বেশি রফতানির বিপরীতে জাহাজীকরণের তথ্য পাওয়া যায়নি এমন ২৫ প্রতিষ্ঠানের ইউজার আইডি লক করা হয়েছে।
ইউজার আইডি লক হওয়া ২৫ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে এফবি ফুটওয়্যার, ইসিটিএ ঢাকা, লেনি ফ্যাশনস, আল-হারুন এন্টারপ্রাইজ, নিট স্টুডিও, লেনি অ্যাপারেলস, প্যাসিফিক জিন্স, জিন চ্যাং সুজ (বিডি), এসকিউ সেলসিয়াস, হবিগঞ্জ অ্যাগ্রো, কুন তং অ্যাপারেলস, শিঅ্যান্ডহি অ্যাপারেল, নিরালা সি ফুডস, তিতাস স্পোর্টসওয়্যার, অনন্ত অ্যাপারেলস, প্রাণ ডেইরি, এসকে অ্যাগ্রো ফুড প্রসেসর, আশান এন্টারপ্রাইজ, অভিজাত ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, অ্যাডভান্স কম্পোজিট টেক্সটাইল, কর্ণফুলী সুজ, সুজি ফ্যাশনস, এসকিউ বিরিচায়না, ইউনিভোগ ও ভেনচুরা বাংলাদেশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, একটা সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রফতানি-সংক্রান্ত সব তথ্য দেয়ার দায়িত্ব ছিল বাণিজ্যিক ব্যাংকের অথরাইজড ডিলার বা তফসিলি শাখাগুলোর হাতে। ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে রফতানিকারকদের সরাসরি তথ্য দেয়ার ব্যবস্থা প্রণয়ন হয় অনলাইন এক্সপোর্ট মনিটরিং সিস্টেম বা ব্যবস্থা প্রণয়নের মাধ্যমে। এ ব্যবস্থার আওতায় রফতানিকারকরা অনলাইনে সরাসরি রফতানি-সংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জমা দিতে পারেন। এ সুযোগ দেয়ার পর তা অপব্যবহার করে অনেক রফতানিকারকের সময়মতো তথ্য না দেয়ার ঘটনা ঘটাতে শুরু করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে এসেছে, অনেক রফতানিকারক নিজে সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তথ্য জমা দেয়ার সুবিধা কাজে লাগাচ্ছেন না। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা যেমন—নগদ সহায়তা, রফতানি উন্নয়ন তহবিল বা ইডিএফ থেকে সুবিধা নেয়া অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। যদিও নিয়ম অনুযায়ী রফতানি বাবদ কোনো অর্থমূল্য অপ্রত্যাবাসিত না থাকলেই কেবল এ ধরনের প্রণোদনা বা সুবিধা পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচনা করার কথা। রফতানি মূল্য অপ্রত্যাবাসিত থাকছে এমন তথ্য ধামাচাপা দেয়ার লক্ষ্যে রফতানিকারকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিস্টেমে তথ্য দিচ্ছেন না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের সঙ্গে রফতানির প্রত্যাবাসিত অর্থের গরমিল রয়ে যাচ্ছে নিয়মিত। গত আড়াই বছরে রফতানি আর রফতানির প্রত্যাবাসিত অর্থের পরিসংখ্যানে ১২ বিলিয়ন ডলারের পার্থক্য রয়ে গিয়েছে। এর প্রভাবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যালান্স অব পেমেন্টের সঠিক তথ্য বের করা জটিল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় রফতানি বন্ধ না করে তথ্য সমন্বয়ের বিষয়ে কঠোর হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আপাতত রফতানিকারকদের সচেতন করার জন্য কঠোর অবস্থান না নিয়ে শুধু ইউজার আইডি লক করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোম্পানির রফতানি নিরবচ্ছিন্ন রাখার পাশাপাশি সরকার থেকে সুবিধা আদায়ে কোনো বাধা সৃষ্টি করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে ইউজার আইডি লক করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকে দেয়া চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন তথ্য উল্লেখ করেছে।
৯ মে তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও কান্ট্রি ম্যানেজারদের দেয়া চিঠিতে শুরুতেই গাউডলাইনস ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশনস ২০২৮-এর নির্দেশনা সংবলিত ধারা উল্লেখ করে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জানুয়ারি ২০১৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২১ সময়ে অনলাইন এক্সপোর্ট মনিটরিং সিস্টেমে প্রাপ্ত বিল অব এক্সপোর্ট-সংশ্লিষ্ট ইএক্সপির বিপরীতে জাহাজীকরণ তথ্যাদি (ডুপ্লিকেট) রিপোর্ট না করার দায়ে ২৫ রফতানিকারকের ইউজার আইডি সিস্টেমে বন্ধ বা লক করা হয়েছে।
ইএক্সপিগুলোর ডুপ্লিকেট রিপোর্টিং সম্পন্ন হলে ওই ইউজার আইডি পুনরায় সচল করার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, এ সময়ে নিজ নিজ এডি ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানিকারক নতুন ইএক্সপি ইস্যু করে রফতানি কার্যক্রম সচল রাখতে পারবেন। রফতানিকারকদের রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তা, ইডিএফ ঋণ সুবিধা ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা প্রদানে অধিক সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে।
চিঠির শেষাংশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের অথরাইজড ডিলার বা এডি লাইসেন্স বাতিলের হুঁশিয়ারি দিয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করা হলো উল্লেখ করে বলা হয়েছে, রফতানিকার্য সম্পাদনের ১৪ দিনের মধ্যে ডুপ্লিকেট রিপোর্ট-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথ পরিপালিত না হলে পর্যায়ক্রমে এ-জাতীয় অন্যান্য রফতানিকারক ইউজার আইডি লকসহ সংশ্লিষ্ট এডি ব্যাংকগুলোর এডি লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, জাহাজীকরণের তথ্য না থাকলে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যেগুলো কৃষিভিত্তিক সেগুলোর বিষয়ে উদ্বেগ বেশি। কারণ কৃষিজাত পণ্য রফতানিতে নগদ সহায়তার হার সবচেয়ে বেশি। ইউজার আইডি বন্ধ হওয়া ২৫ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কৃষিভিত্তিক রফতানিকারক ছাড়াও আছে পাদুকা, পোশাকপণ্যের প্রতিষ্ঠান। তবে সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে পোশাক শিল্পের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইউজার আইডি-সংক্রান্ত চিঠির বিষয়টি জানতে পেরে সম্প্রতি সংগঠনের সদস্যদের জন্য চিঠির বিষয়বস্তু অবহিত করেছে পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। জানতে চাইলে সংগঠনটির সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগটি ইতিবাচক। এর ফলে স্বচ্ছতা আসবে। রফতানি তথ্যে অনেক সময় গ্যাপ থেকে যায়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারিতে সমস্যা হয়। আমার মতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ না করা রফতানিকারকদের গাফিলতি ছাড়া আর কিছু না। কোম্পানি বড় বা ছোট যা-ই হোক, আমরা চাই রফতানিকারকরা যেন স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্দেশনা অনুযায়ী সব তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে দেন।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//