
ড: মিহির কুমার রায়: বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও তার সাথে বাংলাদেশ অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা এখন খুবি একটি অতি জনপ্রীয় বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে বিশেষত: রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ ও প্রভাবের কারনে। এর আগে টানা দুই বছরের অধিক সময় কভিড-১৯-এর ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, ঠিক সেই সময়ে এই যুদ্ধ গোটা বিশ্বে এক নতুন অভিঘাত নিয়ে এসেছে। গত মার্চে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্য মূল্যসূচক গত ৬০ বছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড করে। বিশ্ব ব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস জুন, ২০২২-এর প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, চলমান সংকট অব্যাহত থাকলে তা গত শতাব্দীর ৭০ দশকের মতো অর্থনৈতিক স্থবিরতা (স্ট্যাগফ্লেশন) হতে পারে। উল্লেখ্য, এটি এমন একটি অবস্থা যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে নিম্ন প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ বেকারত্ব সম্পৃক্ত। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) জুলাই, ২০২২ - এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক আপডেটে টানা তৃতীয় বারের মতো বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ কমানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অর্থনীতির নিকট ভবিষ্যৎ অন্ধকার ও অনিশ্চিত এবং শিগগিরই মন্দার দিকে ধাবিত হতে পারে। সব মিলিয়ে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পূর্বাভাস এখনো সুখকর নয়। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একসময় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকলেও শ্রীলংকা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এর জন্য বৈশ্বিক পরিস্থিতি দায়ী না থাকলেও অনেকে বাংলাদেশকে শ্রীলংকার সঙ্গে তুলনার চেষ্টা করেছেন। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়ায় অনেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সংকটাপন্ন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশের ঋণ চাওয়াকে ইতিবাচক ভাবে দেখছেন। বাংলাদেশের চলমান এ আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটের কঠিন পরিস্থিতির উদ্ভব প্রায় পুরোটা বৈশ্বিকভাবে সৃষ্ট হলেও শ্রীলংকার সংকটের মূলে ছিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে অভন্তরীণ জন বিচ্যুত রাজনীতি ও ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের হিসাবে ২০২১ সালের শেষের দিকে শ্রীলংকার মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় জিডিপির ১১৯ শতাংশে আর শুধু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৬৫.৬ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের ২০২১ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে মোট ঋণের পরিমাণ ৩২.৪ শতাংশ আর বৈদেশিক ঋণের অংশ ১২ শতাংশ। ২০১০ সালে বিশ্ব ব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে ঋণের নিরাপদ সীমা হচ্ছে জিডিপির ৭৭ শতাংশ এবং উদীয়মান অর্থনীতির ক্ষেত্রে তা ৬৪ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঋণ মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও বৈদেশিক এবং মোট ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি নিম্ন ঝুঁকির দেশ হিসেবে অবহিত করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ডলার ব্যবস্থাপনার জন্য এবং অর্থনীতির উত্থানে আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়াকে অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশে প্রবৃদ্ধি ও পুঁজি সঞ্চয়নের কথা বিবেচনায় রেখে।
কিন্তু কিছু সংবাদ মাধ্যম বাংলাদেশের আইএমএফের কাছে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চাওয়াকে ‘বেইল আউট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা মোটেই সঠিক নয়। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলংকা ও পাকিস্তান বেইল আউট চেয়েছে। কারণ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেক কম। শ্রীলংকার রিজার্ভের পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলারের কম আর পাকিস্তানের বর্তমান (২২ জুলাই ২০২২) রিজার্ভ মাত্র ৮.৬ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, গত বছর বাংলাদেশের রিজার্ভ যখন ৪৬ বিলিয়ন ডলারের উপর চলে যায়, তখন অনেকে এই ডলার ব্যবস্থাপনা কঠিন হবে বলে মত দিয়েছিল। আমাদের পাশের দেশ ভারতেও এখন রিজার্ভ গত ২০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে এসেছে। শুধু এ সপ্তাহেই রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার রিজার্ভ ৭.৫ বিলিয়ন ডলার কমেছে। বাংলাদেশ বরাবরই ঋণ পরিশোধে সক্ষম তা দেখিয়েছে। গত অর্থবছর এবং তার আগের অর্থবছরে গড়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের মতো ঋণ পরিশোধ করেছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো বৈদেশিক সহযোগিতা পেয়েছে, যার ৯৮ ভাগই ঋণ। তার মানে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বেড়েছে বলেই ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। বাংলাদেশ বাজেট সহায়তার জন্য আইএমএফের কাছে ঋণ চেয়েছে। করোনার সময়েও বাংলাদেশ একইভাবে বাজেট সহায়তা চেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত বলেই প্রকল্পে ঋণের পাশাপাশি সরাসরি বাজেট সহায়তার জন্য ঋণ দেয়া হচ্ছে। এর ফলে খরচের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে। মূলত বৈশ্বিকভাবে আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় চলতি হিসাবের ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ডলারের কিছুটা অপ্রতুলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য শুধু আইএমএফ নয়, অন্যান্য বহুপক্ষীয় সংস্থা যেমন বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের কাছেও ১.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে। বাংলাদেশের সক্ষমতা আছে বলেই এ ঋণ চেয়েছে সতর্কতা হিসেবে যদি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় বা বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হয়, ‘বেইল আউট’-এর জন্য নয়। সে কারণেই সরকার এখন সতর্কতা হিসেবে খরচ কমানোর দিকে নজর দিয়েছে, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। দেশের অর্থনীতির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির সহায়ক এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু ১০০ ভাগ ব্যয়ের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স। গত বছর বাংলাদেশ স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি ৫২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি করতে সক্ষম হয়েছে, তৈরি পোশাক ও হোম টেক্সটাইল বাদেও রফতানি খাতের আরো কয়েকটিতে (পাট ও পাটজাতীয় পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাতীয় পণ্য, ইলেকট্রনিকস, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষিজাত পণ্য) এখন ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এটা ঠিক যে, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসী আয় তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার (১৫ শতাংশ) কম হয়েছে। তবে মনে রাখা দরকার, ২০২০-২১ অর্থবছরে আমাদের বিদেশ গমনকারী শ্রমিকের সংখ্যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল, তিন লাখের কম। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ঘুরে দাঁড়িয়ে গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল, যা প্রায় নয় লাখ। তার ফলও আমরা এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছি। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে প্রবাসী আয় গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ২.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগামীতে বড় ধরনের কোনো অভিঘাত না এলে এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে প্রতীয়মান হয়। এরই মধ্যে বিলাসবহুল পণ্যে আমদানির ওপর কঠোর পদক্ষেপের কারণে গত জুলাইয়ে আমদানি ব্যয় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার কমে এসেছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৩১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে রফতানির ক্ষেত্রেও জুলাইয়ে ইতিবাচক ধারা লক্ষ করা গিয়েছে, রফতানি বেড়েছে ১৫ শতাংশ। জুলাইয়ে গত অর্থবছরের জুলাইয়ের তুলনায় রফতানি ১৫ শতাংশ বেড়েছে, গত অর্থবছরে রাজস্ব আয় বেড়েছে ১৪ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি বিশ্বব্যাপী এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে ও অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বাইরে থেকে আসা মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, অবশ্য গত জুনে মূল্যস্ফীতি ৭.৫৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি যে বাড়বে তা সহজেই অনুমেয় ছিল। কাজেই মূল্যস্ফীতি এখন ভীতিকর বৈশ্বিক সমস্যা। তাছাড়া জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বরাবরই তুলনামূলক একটু বেশি থাকে, বিশেষত বন্যা ও বৃষ্টির কারণে সরবরাহে একটু ঘাটতি থাকে, শুকনো মৌসুম শুরু হলে বাজারে সবজির সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যায়। বিশ্ব বাজারে এখন খাদ্য সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে খাদ্য পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্য মূল্যসূচক জুনে টানা তিন মাস ধরে কমছে। তেলের বাজারেও দাম পড়তে শুরু করেছে। অপরিশোধিত তেল এখন ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের নিচে চলে এসেছে। কাজেই বলা যায়, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে এবং বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর মূল্য কমতির দিকে। বাংলাদেশ সরকার আগাম সতর্কতা হিসেবে কয়েক মাস আগে থেকেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যেমন প্রকল্প অনুমোদন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রাধান্য নির্ধারণ, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে কঠোর অবস্থান, গাড়ি ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা, আমদানির ক্ষেত্রে ৩ মিলিয়ন ডলারের উপর এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি, বিদ্যুৎ ব্যবহার সাশ্রয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, সরকারি অফিসে ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ কমানো, রাত ৮টার পর শপিং মল বন্ধ রাখা, পেট্রল পাম্পগুলোয় তেলের সরবরাহ সীমিত রাখা, সরকারি সভায় যথাসম্ভব শারীরিক উপস্থিতি পরিহার করে অনলাইনে সম্পন্ন করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার তদারকি ও টিসিবির কার্যক্রম বাড়ানো, মানি চেঞ্জারগুলোকে সতর্ক পরিবীক্ষণে আনা। সরকার গত দেড় দশক ধরে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সফলতা দেখিয়েছে যার কারণে ২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব, ২০১১ সালের বৈশ্বিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কভিড-১৯ সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে, করোনার সময়ে অধিকাংশ দেশ যেখানে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির সম্মুখীন হয়েছিল সেখানে বাংলাদেশে ছিল ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। সর্বশেষ ৩১ জুলাই, ২০২২ - এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ টিকাদানের ক্ষেত্রে প্রথম সারির দেশগুলোর (১৬তম) মধ্যে রয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য মুদ্রা নীতিতে সতর্কতামূলক কিছুটা সংকোচনমুখী নীতি গ্রহণ করেছে, বাজেটে জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৭.৫ শতাংশ এবং ৫.৫ শতাংশ। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা (১২.১ শতাংশ) তুলনামূলক কম ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি হার রেপো রেট ৫০ পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিক থেকে বোঝা যাচ্ছে, সরকার প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাজেটের আগে সরকার মধ্য মেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতির নীতিতে যে বিবৃতি দিয়েছিল তার মধ্যে রয়েছে কভিড-১৯ পুনরুদ্ধারের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন। কভিড-১৯ পুনরুদ্ধারের জন্য কৌশলগত দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাংকিং চ্যানেলে নিম্ন সুদের হার প্রচলন এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, গরিব, দুস্থ, বেকার ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিতদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
তারপরও গত দেড় দশকের মধ্যে সবচেয়ে চাপে রয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, রাজস্ব আয়ে ঘাটতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স আয়ে ঘাটতির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে হীনতা, টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে অসহনীয় হয়ে উঠছে জিনিসপত্রের দাম, শুধু চলতি বছরেই টাকার অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংকটে পড়েছে। ফলে সাশ্রয়ের দিকে যেতে হচ্ছে সরকারকে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির অবনমন-এই দুটোর মিশ্রণ দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। গত অর্থবছরের (২০২১-২২) মে পর্যন্ত ১১ মাসেই দেশের আমদানি ব্যয় ছাড়িয়েছে ৮১.৪৯ বিলিয়ন ডলার এবং গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমেছে ১৫ শতাংশেরও বেশি, গত মে পর্যন্ত অর্থবছরের ১১ মাসেই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। দেশের অর্থনৈতিক সংকটে নড়ে চড়ে বসেছে সরকারও এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে দাতা সংস্থাগুলো ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কঠিন কোনো শর্ত দেয়ার সম্ভাবনা নেই।
দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমলেও এখনই স্বস্তি ফিরছে না বৈদেশিক বাণিজ্যে। উন্নতি হচ্ছে না সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতিতেও। এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে গত অর্থবছরে খোলা রেকর্ড আমদানি ঋণপত্র (এলসি)। নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে বিলম্বিত হওয়া এলসি দায় ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছর শেষ হয়েছে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি অনিষ্পন্ন রেখে। রেকর্ড এসব অনিষ্পন্ন এলসি দেশের অর্থনীতির জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।, অনিষ্পন্ন থাকা এলসির দায় দুই বছরের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে নতুন করে খোলা এলসির দায়ও। এ অবস্থায় দেশের বাজারে চলমান ডলার সংকট সহসা কাটবে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং আগামী দিনগুলোয় অনিষ্পন্ন এলসির দায় খেলাপি হয়ে বিদেশে বাংলাদেশের ঋণমান অবনমনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের ব্যাংকগুলোয় ৯২.২৩ বিলিয়ন বা ৯ হাজার ২২৩ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৩.৬৮ বিলিয়ন ডলারের এলসি। চলতি বছরের ৩০ জুন অনিষ্পন্ন এলসির স্থিতি ছিল ৩৩.৮৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২০-২১ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ২৬.৬৬ বিলিয়ন ডলার এলসি অনিষ্পন্ন রেখে। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে অনিষ্পন্ন এলসির স্থিতি ৭.১৬ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছর মেয়াদি এলসি খোলা যায়। তবে বিশেষ বিবেচনায় মূলধনি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলধনি যন্ত্রপাতির বাইরে অন্য সব ধরনের এলসির সর্বোচ্চ মেয়াদ ৩৬০ দিন। ২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়। ওই সময় নীতি সহায়তা হিসেবে সব ধরনের এলসি দায় পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একারণে গত দুই বছরে দেশের ব্যাংক খাতে বিপুল অংকের ডেফার্ড এলসি বা বিলম্বিত ঋণপত্র দায় তৈরি হয়েছে। ব্যাংকাররা বলছেন, যে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণপত্র অনিষ্পন্ন রয়েছে, তার অন্তত অর্ধেকই বিলম্বিত ঋণপত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা হিসেবে ব্যবসায়ীরা যথা সময়ে ওইসব ঋণপত্রের দায় পরিশোধ করেন নি। এখন বর্ধিত মেয়াদ শেষ হয়ে এলেও অনেক ব্যবসায়ী ঋণপত্রের দায় পরিশোধ করছেন না। আবার ডলারের বিনিময় হার অনেক বেড়ে যাওয়ায় অনেকে বর্তমান বাজার দরে ঋণপত্র পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করছেন। এ কারণে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেশের অনেক ব্যাংকই খেলাপি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি এলসি অনিষ্পন্ন রয়েছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে। এ খাতে অনিষ্পন্ন এলসি দায়ের পরিমাণ ৩৮৪ কোটি ডলার, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অনিষ্পন্ন এলসি দায় সৃষ্টি হয়েছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে। এ খাতে অনিষ্পন্ন এলসি দায়ের পরিমাণ প্রায় ৩৮১ কোটি ডলার। এছাড়া রাসায়নিক ও রাসায়নিক পণ্যের ১৯১ কোটি, শিল্পের ইন্টারমেডিয়েট গুডস বা মধ্যবর্তী পণ্যে ১৮৩ কোটি, কাঁচা তুলা ও কৃত্রিম তন্তুতে ১৫৫ কোটি, সুতায় ১৪৫ কোটি ও বিভিন্ন ধরনের শিল্প যন্ত্রপাতি আমদানিতে ১১৮ কোটি ডলারের এলসি অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। প্রধান খাদ্য পণ্যগুলোর মধ্যে গমে ৯৬ কোটি, চালে ১৩ কোটি, ভোজ্য তেলে ৫৩ কোটি ও চিনিতে ১৫ কোটি ডলারের এলসি অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের অনিষ্পন্ন এলসির স্থিতি ছিল ৩ হাজার ৩৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের আমদানি প্রবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কঠোর বিধি নিষেধ আর ডলার সংকটে এলসি খোলা কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। জুলাইয়ে ২ বিলিয়ন ডলার কমার পর চলতি আগস্টেও এলসি খোলা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আমদানি কমলেও জুলাইয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে দেশের রফতানি খাত। ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও। এ অবস্থায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজার স্থিতিশীল হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। ফলে ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে আরো কঠোর হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রেকর্ড আমদানির ফলে ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়ে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৩.২৪ বিলিয়ন ডলার। রফতানি আয়ের পাশাপাশি রেমিট্যান্স থেকে প্রাপ্ত ডলার দিয়ে আমদানি ব্যয় সমন্বয় করে বাংলাদেশ। তবে রেকর্ড আমদানির বছরে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ কমেছে। এ কারণে অর্থবছর শেষে সরকারের চলতি হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে ব্যালান্স অব পেমেন্টে ৫.৩৮ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি নিয়ে গত অর্থবছর শেষ হয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ২০২১ সালে রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আমদানি দায় পরিশোধ করার জন্য গত অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর কাছে ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১.১৯ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয়। আর চলতি আগস্টেও এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরো প্রায় ৭০ কোটি ডলার ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করেছে। সংকট মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় প্রতিদিনই ডলার বিক্রি করা হলেও টাকার অবমূল্যায়ন থামছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত দর অনুযায়ী প্রতি ডলার ৯৫ টাকা হলেও খুচরা বাজারে ১২০ টাকা পর্যন্ত ডলার বিক্রি হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থানের কারণে সম্প্রতি তা ১১০ টাকার নিচে নেমে এসেছে। তারপরও আশা করা যায় সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপের ফলে সংকট কাটবে এবং একটি সময়ে অর্থনীতি ঘুরে দাড়াবে বলে প্রতিয়মান হয়।
লেখক: ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা