
ড: মিহির কুমার রায়: ডিমের দাম যখন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে, সে সময় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, প্রয়োজনে ডিম আমদানি করা হবে। এ ঘোষণার পর বিভিন্ন মহল প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ডিম উৎপাদকদের সংগঠন পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি বলেছেন, ডিম আমদানির সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী। মূল্য বৃদ্ধির কারণে ডিম আমদানি করা হলে এ শিল্প খাত ধ্বংসের দিকে যাবে। ডিমের মূল্য বৃদ্ধির জন্য মধ্যস্বত্বভোগীরা দায়ী, ডিমের উৎপাদক খামারিরা দাম বাড়াননি সত্যি কথা। তবে ডিম আমদানির হুমকিতে অনেক স্থানে ডিমের দাম কমেছে, যদিও তা আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। ডিম বাণিজ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্যে রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীরা, যারা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে এবং রাজধানীসহ দেশব্যাপী ডিমের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা আসতে না আসতেই ডিমের ডজন এক লাফে ১১০ থেকে ১৪০ টাকা, এরপর ১৬০ টাকায় উঠে গিয়েছিল। ডিমের এ উচ্চ মূল্য গরিব, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। মাছ-মাংসের দাম যখন আকাশছোঁয়া, তখন নিম্ন-আয়ের মানুষ ডিম দিয়েই তাদের আমিষের প্রয়োজন মেটান। মূল্য বৃদ্ধির ফলে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। ডিমের দাম হঠাৎ এত বাড়ল কেন? বাজারে ডিমের সরবরাহে ঘাটতি নেই। দেশে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ডিম উৎপাদন হয়, যা চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত। উৎপাদিত ডিম বাজারে আসে, কিন্তু তা আসে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে। এ পর্যায়েই অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি হয়। তারাই সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, দাম বাড়ায় বেশি মুনাফার জন্য। ভোক্তা অধিদপ্তর এদের ধরেনা, তাদের অভিযান চলে খুচরা বাজারে। অসাধু ব্যবসায়ীরা অন্তরালে নিরাপদে থাকে। কেউ কেউ ডিমের দাম বাড়ার জন্য জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিকে দায়ী করে বলছিলেন, ডিম পরিবহণের খরচ বেড়েছে। এটা একেবারেই খোঁড়া যুক্তি। ডিম উৎপাদনের খামারগুলো ঢাকা শহরের আশপাশে বা শহরতলিতে এবং শহরের খুব কাছেই সাভার, আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জে অবস্থিত। স্বল্প দূরত্বের এসব খামার থেকে ঢাকা শহরে ডিম পরিবহণের খরচ খুবই সামান্য বেড়েছে। আমরা শহরে দেখি ডিম পরিবহণ হচ্ছে রিকশা ভ্যানে। রিকশা ভ্যান চালাতে জ্বালানি তেল লাগে না। দেশের অন্যান্য শহরেও একই পরিস্থিতি। মুরগির খাবার দেশেই তৈরি হয়, বিদেশ থেকে আসে না। তাহলে কোন যুক্তিতে ডিমের দাম ডজনপ্রতি ৫০ টাকা বেড়ে গিয়েছিল? কোনো জবাব নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন দেশে ডিমের বাজার স্থিতিশীল করতে প্রয়োজন হলে বিদেশ থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সে জন্য ডিম আমদানি করতে গেলে একটু সময় লাগবে। যদি এমনটিই সত্যি হয় যে, ডিম আমদানি করলে পরে এটা (দাম) কমবে, তাহলে আমরা আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলব। কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য মন্ত্রণালয় সহ কয়েকটা মন্ত্রণালয় ডিমের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে কীভাবে কমানো যায় সেই চেষ্টা চলছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীতে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনে ৪০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকায় উঠেছে। এর আগে কখনই ডিমের দাম এতটা বাড়তে দেখা যায় নি। ডিমের সঙ্গে ব্রয়লার মুরগিও কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর কারসাজিতে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। সোমবার এফবিসিসিআই কার্যালয়ে ‘নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর বাজার ও মূল্য পরিস্থিতি’ বিষয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি ডিমের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযানের পর দাম কমে যায়। এর মাধ্যমেই ডিমের বাজারে কারসাজি প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করেন এফবিসিসিআই সভাপতি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালককে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ডিমের বাজারে কারসাজিতে জড়িত কাউকে খুঁজে পেলে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে অন্য কেউ এ সুযোগ না নিতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্ব বাজারে পণ্য মূল্য বাড়লে দেশেও দাম বাড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশে তার প্রভাব পড়ে না। সামান্য কয়েকজনের জন্য পুরো ব্যবসায়ী মহলকে অসাধু হিসেবে বদনাম শুনতে হচ্ছে। লোভের বশবর্তী হয়ে সুযোগ পেলেই তার অপব্যবহার করতে থাকলে সরকার বাধ্য হয়ে আমদানি শুরু করবে। তখন স্থানীয় শিল্প বিপাকে পড়বে। তাই দোষীদের খুঁজে বের করা ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন সভাপতি। এ সময় সরকারী সংস্থাগুলোকে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতের মনোপলি ভাঙ্গার আহ্বান জানান তিনি। ডিমের বাজারে যদি কোন অনিয়ম, আইন বিরোধী কাজ হয়ে থাকে, তাহলে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব কার্যক্রমে এফবিসিসিআই পাশে থাকবে। বহুমুখী সমবায় সমিতিগুলোর ব্যবসার লাইসেন্স নেই, তারা কিভাবে ডিমের দাম নির্ধারণ করে? বিষয়গুলো কেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের নজরে আসেনি, এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি। তিনি বলেন, প্রায় ১৭ কোটি মানুষকে ডিম ও মুরগি সরবরাহ করে প্রোটিনের চাহিদা মেটাচ্ছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু গুটিকয়েক অসাধু লোকের কারণে ব্যবসায়ীদের এত বছরের অর্জন ও সম্মান নষ্ট হয়েছে। এ সময় তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি অতি মুনাফার প্রবণতা ত্যাগের আহ্বান জানান। এখানে উল্লেখ্য যে নিত্য পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর তৎপরতা খুবই কম। এর সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়েই চলেছে। বাজার তদারকি সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না। সরকারও এদিকে নজর দিচ্ছে বলে মনে হয় না। নিত্য পণ্যের বাজারে শৃঙ্খলা এনে ন্যায্য মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে হবে। এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন বাজার তদারকি সংস্থাগুলোকে পুরোপুরি সক্রিয় করা এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনা। নিত্য পণ্যের বাজারে নৈরাজ্যের অবসান ঘটাতে অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর হাতে দমনের বিকল্প নেই।
লেখক: গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা