Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Monday, 29 Aug 2022 06:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

মিহির কুমার রায়: ভরা বর্ষায় বৃষ্টিহীন থাকার পর ভাদ্রেও দেখা মিলছে না বৃষ্টির। প্রচন্ড গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ। খাঁ-খাঁ করছে ফসলি মাঠ।  আমন ফসলের খেতে সময়মতো পানি দিতে না পারায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। এরমধ্যে জ্বালানি তেল ও সারের দাম বাড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। কৃষি বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে আবহাওয়া এমন বৃষ্টিহীন থাকলে নিয়মিত সম্পূরক সেচ দিতে হবে। 

তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে পোকামাকড় যাতে না হয় খেয়াল রাখতে হবে। একজন কৃষক বলছে ‘যে কয়েক বিঘা জমি আবাদ (চাষ) করি সেটা তো ঝড়ি (বৃষ্টি) না হওয়ার জন্য সময়মতো ধান নাগাতে পারি নাই। কিন্ত কষ্ট করি হলেও দিন ১৫ আগে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দিয়ে ধান লাগাইছি। এতে একবার পানি দিতি যেখানে ৫০০ টাকার তেল কিনা নাগতো সেখানে আরও দুই আড়াইশ’ টাকা বেশি লেগেছে। ধান লাগানোর পর যদি ঝড়ি না হয় তাহলে আবারর সেচ দেয়া লাগবে। এভাবে আমন মৌসুমে এতো ট্যাকা খরচ করলে খাবো কি’ ? 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে এর বিরূপ প্রভাব নানাভাবে দেখা যাচ্ছে। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি বা বন্যা, শিলাবৃষ্টি, অস্বাভাবিক জোয়ার, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, মরুকরণ, নদী ভাঙন, ঝড়, সাইক্লোনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেক বেড়ে গেছে।

এ বছরও আবহাওয়া পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। তারা মনে করছেন, খরা পরিস্থিতি আরও প্রলম্বিত হলে দেশে হিটওয়েভ বা দাবদাহ আরও তীব্র হতে পারে। 

ঢাকা আবহাওয়া অফিস থেকে প্রাপ্ত বিগত ৫ বছরের জুলাই মাসের বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, জুলাই মাসে গড় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পারিমাণ ধরা হয় ৪৯৬ মিলিমিটার। আগের বছর (২০২২) গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ২১০.৭ মিলিমিটার যা গড় মানের চেয়ে ৫৭.৬ শতাংশ কম।

২০২১ সালেও গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৫.১ শতাংশ কম, ৪৭১ মিলিমিটার। তবে ২০১৯ সালে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল গড় মানের চেয়ে ২৫.৮ শতাংশ বেশি, ৬২৪.৬ মিলিমিটার আর ২০২০ সালে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৫৫৩ মিলিমিটার যা গড় মানের চেয়ে ১১.৩ শতাংশ বেশি। গত জুলাই মাসে রংপুর বিভাগেও গড় বৃষ্টিপাত ৩০.১ শতাংশ কম হয়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের গবেষক বলেন, ‘আমাদের প্রতি বছরে সমুদ্রে একটা সিস্টেম তৈরি হয় যেটাকে আমরা লা-লীনা বলি। এই ওশানের ফ্লোটা ছয়-সাত বছরে বেড়ে যায়। এখন এইটা (ফ্লো) অস্ট্রেলিয়ার দিকে অবস্থান করছে যার কারণে জলীয় বাষ্পটা আমাদের দেশের দিকে আসছে না। অথচ এ সময়টায় আমাদের
 এইদিকে থাকার কথা ছিল। 

দখিণা যে বাতাসটা জলীয় বাষ্প নিয়ে সেটা এখন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে যার কারণে আমরা পর্যাপ্ত ময়েশ্চার (জলীয় বাষ্প) পাচ্ছি না। ওই কারণে বৃষ্টিপাতও হচ্ছে না।’এটা একটা বার্ষিক প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র। রংপুরের কৃষি বিভাগ ও আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার বর্ষা মৌসুমে একটানা দাবদাহ চলে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে। 

সে সময় সেখানকার গড় তাপমাত্রা ২৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রখর রোদ আর গরমে হালকা মেঘ থাকলেও বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায় নাই। এতে করে ওই অঞ্চলের বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির এমন বিরূপ আচরণে ভরা বর্ষায় দেখা দিয়েছে খরা।

রংপুর কৃষি বিভাগের দাবি, এ অঞ্চলে ৯ হাজার গভীর ও চার লাখ অগভীর নলকূপ রয়েছে। সম্ভাব্য খরার শঙ্কায় কৃষকদের প্রতি সেচ নালা নষ্ট না করার পরামর্শ ছিল। আমন আবাদে কৃষকদের সম্পূরক সেচের পরামর্শ দেয়া ছিল। 

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সে কারণেই কৃষকদের বন্যা ও খরা সহিষ্ণু ধান আবাদেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। বৃষ্টির পানির বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক মোটর, শ্যালো মেশিন, বিএডিসি সেচ প্রকল্প, গভীর নলকূপ ও বরেন্দ্র সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে আমন রোপণের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

অবস্থাসম্পন্ন কৃষকরা শ্যালোসহ গভীর-অগভীর নলকূপের সেচে আমন লাগানো শুরু করেছেন। এক একর জমিতে সেচ দিতে ঘণ্টায় ১৫০ টাকা নেয়া হচ্ছে। শুধু জমি ভিজিয়ে নিতে প্রায় ৮ ঘণ্টা লাগছে। এরপর চারা লাগানোর পর চারা জীবন্ত রাখতে কয়েক দিন পর আবার পানি নিতে হবে। এতে চারা লাগানো এবং পরের সেচ দিতে প্রায় এক একর জমিতে টাকা লাগবে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মতো। এটা কৃষকদের বাড়তি খরচ। এভাবে সারাদেশে কৃষক যদি সম্পূরক সেচে আমন চাষ করে তাহলে তাদের কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হবে।

এ কথা সত্য, চাষীদের জন্য সরকার কয়েক ডজন প্রকল্প তৈরি করেছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে এবং কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, সহায়ক মূল্যে ফসল কিনে নেয়াসহ কৃষি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সরকার যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। 

বর্তমান বছরের বাজেটে সরকার কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২৪ হাজার ২২৪ কোটি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ১ হাজার ৫০১ কোটি টাকা, ভূমি মন্ত্রণালয় ২ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১০ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা বরাদ্ধ রেখেছে । বাজেটে কৃষি খাতে ভর্তুকি প্যাকেজ হিসেবে
বরাদ্দ ১৬ হাজার কোটি টাকার একটু বেশি, মোট ভর্তুকির এক-পঞ্চমাংশ ।

স্মর্তব্য, কৃষি ও আনুষঙ্গিক খাতে বরাদ্ধ যেমন বন, পরিবেশ, গবাদিপশু ভর্তুকি এসব খাতের বাজেট বরাদ্দের ৩৯ শতাংশ। আবার বাজেটে কৃষি খাতে থোক বরাদ্ধ হিসাবে ১৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ রাখা হয়েছে মোকাবেলা করতে সরকার এটা আশ্চর্য নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও সরকার চাষীদের বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ভর্তুকি দেয়। 

কিন্তু বাংলাদেশে এত কিছু সত্তেও চাষীদের একটা বড় অংশই চাষ ছেড়ে দিতে পারলে যেন বেঁচে যায়।  আজ প্রযুক্তির
বহু উন্নতি হয়েছে, চাষীর কাছে নানা প্রযুক্তি ও সুবিধা সরকার পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু চাষীকে আত্মনির্ভর হতে দেয়া হয়নি। তার কারন প্রাকৃতিক কারনে কৃষি ও কৃষ কবার বার বিপর্যন্ত হচ্ছে যার প্রমান এবারকার আমন ফসলে খরার আক্রমন যা প্রকৃতিক গত । এর মোকাবেলা করার জন্য সরকার বাজেটের ভর্তুকি থেকে কৃষকদেও সহায়তা করতে পাওে বিশেষত খর পিড়িত এলাকার কৃষকদেও যা একটা সময়ের দাবি । 

কারন প্রকৃতি নির্ভর কৃষি দিয়ে ২১ শতকের সমস্যা মোকাবেলা অনেকটা অসম্ভবের মধ্যেই রয়ে গেছে যা সরকার ও নীতি নির্ধারকরা জানেন । কাজেই খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে মৌসুমী ফসল আমন ধানকে রক্ষা করতে হবে এবং এই খরা মোকাবেলায় সমন্বীত কর্মসূচী নিয়ে আগাতে হবে বিশেষত: সেচের পানির যোগানে । এ কথা মনে রাখতে হবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ মাথায় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি চাহিদা সম্প্রসারণমূলক সেবাগুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদান। 

এক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীভূতকরণের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের চাল, এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে যা কিনা আমাদের সীমিত জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি, বৃহৎ পরিসরে খাদ্য উৎপাদন এবং যান্ত্রিক চাষাবাদ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং গুরুত্ব অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। 

বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের বিরদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা যায়, একই সঙ্গে ধানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের খাদ্য- পুষ্টির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কৃষিতে দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন প্রবর্তন করতে সক্ষম হতে হবে। তাই এবারকার আমন ধানের খরা আমাদের আাগামী দিনের জন্য
একটি পরিবেশ বান্দব কৃষি উপহার দিবে এই আশা রইল।

লেখক : অধ্যাপক (অর্থনীতি),ডিন,ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ও সিন্ডিকেট সদস্য,সিটি ইউনিভার্সিটি,ঢাকা ।

বিনিয়োগবার্তা/এমআর/কেএইচকে/এসএএম//