Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Saturday, 03 Sep 2022 06:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদ্যমান হিন্দু আইন সংস্কার ছাড়া নারীর প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মতামত প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ। 

শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি বলেন,     “এখানে হিন্দু নারীরা যে বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার কথা বলছেন তা বাস্তব হলেও একজন বিচারক হিসেবে এর প্রতিকার দেওয়ার সাধ্য আমার নেই।”

তিনি বলেন, “হিন্দু নারীদের এই বেদনা আমি উপলব্ধি করি। কিন্তু একজন বিচারক হিসেবে আমাকে আইন অনুযায়ী চলতে হয়। আইন আপনাকে অধিকার দেয়নি, আমি কিভাবে দেব? আমিও আমার বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাইনি।”

হিন্দু আইন সংশোধন দরকার এবং এজন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার জন্য হিন্দু সংস্কার পরিষদকে পরামর্শ দেন তিনি। 

তিনি আগামী অক্টোবরে নিজের অবসরে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমি খুব দ্রুত মুক্ত জীবনে চলে যাবো। তখন আপনাদের একজন হিসেবে আপনাদের সঙ্গে থেকে হিন্দু আইন সংস্কারে কাজ করব।”

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, “বিদ্যমান প্রথাগত হিন্দু আইন শুধু বৈষম্যমূলক নয়, এগুলো অমানবিক এবং বর্বরতাপূর্ণ।” 

এক শ্রেণীর হিন্দু নেতাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলা বা এদিক ওদিক দুদিক রেখে গা বাচিয়ে কথা বলে লাভ নেই। পরিস্কার করে বলতে হবে, সন্তান হিসেবে আপনার ছেলে এবং মেয়ের সমান অধিকার আছে কিনা? আপনি আপনার সন্তানের সমান অধিকারে বিশ্বাস করেন কিনা? আমি স্পষ্ট করে বলছি, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সমান অধিকার দেওয়াই সভ্যতার দাবি।” 

মন্ত্রী বলেন, “সরকারের কেউ কেউ বলেছেন হিন্দুরা সবাই একমত হয়ে আসেন তারপর হিন্দু আইন সংশোধন হবে। এধরনের কথা মূল্যহীন। বাংলাদেশে এমন একটি আইনও নেই, যা প্রণয়নের সময় সকল নাগরিককে একমত হতে হয়েছে। এমন কোনো আইন নেই যে বিষয়ে সবাই একমত। তাই এসব বলে লাভ নেই। অধিকার এবং বঞ্চনার অবসানের জন্যই হিন্দু আইন সংস্কার করতে হবে।” 

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে অনেক আন্তরিক। সুনিদিষ্ট পরিকল্পনা হলে এই আইনটি করা সম্ভব। আমার সম্পত্তিতে আমার ছেলে-আমার মেয়ে সবাই অধিকার পাবে। আপনারা কাজ করেন। আমি আপনাদের সাথে আছি।” 
  
“প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ডাক, লিঙ্গবৈষম্য নিপাত যাক” স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের প্রধান ড. ময়না তালুকদার বলেন, সনাতন ধর্মে বৈদিক যুগে নারীদের উপর এই বঞ্চনা ও অধিকারহীনতা ছিলনা। এধরণের বঞ্চনা সনাতন ধর্ম সমর্থন করে না।”

“বৈদিক যুগে হিন্দু পরিবারে বাবা-মার সম্পত্তিতে নারীদের পূর্ণ অধিকার ছিল। হিন্দু আইন সংশোধনের মাধ্যমে সেই অধিকার পুন:বহাল করতে হবে।”

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পুলক ঘটক। 

সহসভাপতি সুভাষ সাহা বলেন, “হিন্দু আইনে একটি নারীর জীবন হলো জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরুষের অধিনস্ত ও আশ্রিত হয়ে থাকতে হবে।” 

আলোচনা সভায় বৈষম্যমূলক হিন্দু আইনের শিকার অনেক নারী তাদের বঞ্চনাময় জীবনের কথা তুলে ধরেন।

ডা. মায়া হোর বলেন, আমি আমার জীবনে জেলা শহরের সম্ভান্ত পরিবারের মেয়ে। তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় বিয়ে হয় এক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে। তিনি আমার পড়া লেখায় বাঁধা হয়ে দাড়ান।  তখন থেকে আমি ডিটারমাইন্ড ছিলাম আমাকে আমার পড়াশোনা চালাতে হবে। বিসিএস দিতে দেবে না। ২০০৫ সালে চাকরিতে যোগদান করি। আমার স্বামী ওই বছরে তিনি আগস্টে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। হিন্দু আইনে বহুবিবাহে বাধা নেই। তখন থেকে আমি একা আছি। আমি বিয়ে করলে সেটা আইনের চোখে অবৈধ হবে এবং আমার সন্তানরাও অবৈধ হবে। তারাও অধিকার পাবে না। 

আমি একজন ডাক্তার। আমি আমার নিজের উপার্জনে যদি নিজের নামে কোনো সম্পত্তি করি তবে সেটা বিক্রি করতে গেলে আমার স্বামীর অনুমতি লাগবে। অথচ তার সাথে আমার সম্পর্কই নেই। আমার সেই সম্পত্তিতে অধিকার পাবে আমার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রীর পুত্র সন্তান। আমার বিশ বছরের একটি মেয়ে আছে। তাকে আমি মানুষ করছি। সে অধিকার পাবে না। ফলে আমি নিজের নামে সম্পদ করতে পারছি না, কিছু করতে গেলে সরাসরি আমার মেয়ের নামে কিনতে হচ্ছে। 

আমার মেয়ের জাতীয় পরিচয় পত্র করার দরকার। সেখানে বাবার নাম লাগবে। এজন্য সে তার বাবার কাছে জাতীয় পরিচয় পত্র চেয়েছে, কিন্তু তিনি সেটি দেননি। হিন্দু আইনে শুধু মেয়েরা নয় ছেলেরাও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। হিন্দু আইনে সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।”

ভিকটিম মুক্তা শেরপা, তার জীবনের করুণ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদের আইন না থাকায় প্রতিকুল পরিস্থিতির শিকার হিন্দু মেয়েরা পুন:বিবাহ করতে পারছে না। আইনকে পাশ কাটিয়ে পুনরায় বিয়ে করলে তাদের যে সন্তান সন্ততি হবে তারাও আইনের চোখে অবৈধ এবং অধিকারহীন হয়ে যায়।”  

ভিকটিম তুলি রানী বলেন, “আমার যখন ২০ বছর বয়স তখন আমার পরিবার আমাকে বিয়ে দেয়। আমাদের বিয়ের ভয়ঙ্কর বিষয়টা হচ্ছে যৌতুক প্রথা। বিয়ের ছয় মাস পরে যৌতুক দাবি করে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বের হয়ে আসি। বাবা-মা বলেন, হিন্দু আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ নেই, মরতে হলে ওখানেই মরতে হবে। বাচ্চার জন্ম নিবন্ধন করতে গেলে বাচ্চার বাবার জন্ম নিবন্ধন চায়। ওর জন্মের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কেন মেয়েরাই শুধু স্ট্রাগল করবে? 

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোমা রায় বলেন, হিন্দু আইন ভারত পরিবর্তন করেছে, শ্রীলঙ্কা করেছে এমন কি ইন্দোনেশিয়ার মত মুসলিম দেশেও হিন্দু আইন পরিবর্তন করেছে, তাহলে বাংলাদেশে হিন্দু আইন পরিবর্তন করতে সমস্যা কোথায়?

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নারী শাখা মহিলা ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুপ্রিয়া ভট্টচার্য বলেন, ”গরিব মানুষের মেয়ে সন্তান হতে নেই। আমাদের এক কর্মচারী তার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তার মেয়ে মাষ্টার্স ডিগ্রি পাশ। কিন্তু যৌতুকের হাত থেকে রেহাই পায়নি।”

মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ঝনা বাড়ৈ বলেন, “সমাজের দৃস্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। নারী হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ; সমাজে পুরুষরা কিন্তু একা চলতে পারেন না। আমরা নারী আমরা সবকিছু করার যোগ্যতা রাখি। তাহলে আমরা কেন পিছিয়ে থাকবো?” 

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি বলেন, আমার কর্মজীবনে বহু হিন্দু নারীর অবস্থা ও আইনগতভাবে প্রতিকারহীনতা প্রত্যক্ষ করেছি। আমার  কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মেয়েদের অধিকার হিন্দু আইন পরিবর্তন করা দরকার।” 

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নিম চন্দ্র ভৌমিক বলেন, ভারতে আইন পরিবর্তন হয়েছে, তারা অনেক কিছুই মেনে নিয়েছে। কিন্তু আমার এখানে পরিবর্তন এখনো হয়নি। আমাদের দেশেও পরিবর্তন হবে, তবে কবে হবে বলতে পারিনা।

বিশিষ্ট সাংবাদিক অজয় দাসগুপ্ত, সমাজকর্মী কাজল দেবনাথ, হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদের সহসভাপতি রিনা রায় প্রমুখ সভায় বক্তব্য রাখেন।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//