
নিজস্ব প্রতিবেদক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান আর নেই। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল রাত ১১টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।দেশের প্রখ্যাত এ অর্থনীতিবিদের বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
আকবর আলি খানের ছোট ভাই কবির উদ্দিন খান জানান, গতকাল রাতে আকবর আলি খান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে যাওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই তিনি মারা যান। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়েছে।
তিনি আরো জানান, আকবর আলি খানের মরদেহ রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। সেখান থেকে আজ সকাল ১০টায় তার গুলশানের বাসায় মরদেহ নেয়া হবে। বাদ জুমা জানাজার পর তাকে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
আকবর আলি খান ১৯৪৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে ১৯৬৪ সালে সম্মান ও ১৯৬৫ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন, দুটিতেই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। মেধাবী শিক্ষার্থী আকবর আলি খান পরে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং পিএইচডি করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৭০ সালে হবিগঞ্জের মহুকুমা প্রশাসক বা এসডিও হিসেবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগের অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সমর্থন দেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমণ শুরু হলে সক্রিয়ভাবে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে কাজ করেন। নিজ হাতে লিখিত আদেশ তৈরি করে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র, খাদ্য ও অর্থ জোগান দেয়ার আদেশ দেন। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তহবিল তৈরি করতে ব্যাংকের ভল্ট থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা উঠিয়ে ট্রাকে করে আগরতলায় পৌঁছে দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য জোগান দেয়ার জন্য গুদামঘর খুলে দেন এবং পরবর্তী সময়ে আগরতলায় চলে যান। এরপর সহযোগীদের নিয়ে তিনি একটি পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসন গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, যার লক্ষ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি উদ্বাস্তু শিবিরে যারা আশ্রয় নিয়েছিল সেই শরণার্থীদের সহায়তা করা। এ ‘অপরাধে’ যুদ্ধ চলাকালেই তার বিচার করে পাকিস্তান সরকার, দেয়া হয় ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশে প্রত্যাবর্তন করেন আকবর আলি খান এবং সচিবালয়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সভাপতি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুক্ত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার সঙ্গেও। তিনি রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে বিকল্প কার্যনির্বাহী পরিচালক (অল্টারনেটিভ এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর) পদও দক্ষতার সঙ্গে সামলিয়েছেন আকবর আলি খান। ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন বিশ্বব্যাংকে। ২০০৬ সালে তিনি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টা ছিলেন। অবশ্য পরে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে না এমন আশঙ্কায় তিনজন উপদেষ্টার সঙ্গে একযোগে পদত্যাগ করেন আকবর আলি খান।
অবসরের পর আকবর আলি খান লেখালেখিতে মনোযোগ দেন। অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজবিদ্যা, সাহিত্যসহ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৭টি। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের বিকাশ নিয়ে তার ‘বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’ বইটি খুব বিখ্যাত। এর বাইরেও পাঠকসমাদৃত হয়েছে ‘ডিসকভারি অব বাংলাদেশ’, ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ারস’, ‘হাম্পটি ডাম্পটি ডিসঅর্ডার অ্যান্ড আদার এসেস’, ‘গ্রেশামস ল সিনড্রোম অ্যান্ড বিয়ন্ড’, ‘দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’, ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’, ‘আজব ও জবর আজব অর্থনীতি’, ‘অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’, ‘চাবিকাঠির খোঁজে: নতুন আলোকে জীবনানন্দের বনলতা সেন’, ‘দুর্ভাবনা ও ভাবনা: রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে’ এবং ‘বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’। তার সর্বশেষ আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘পুরনো সেই দিনের কথা’।
নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া আকবর আলি খান দেশের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং অগ্রগতি নিয়ে গবেষণা করছেন। একই সঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ও জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে গবেষণা করছেন।
বিনিয়োগবার্তা/এসএএম//