
ড: মিহির কুমার রায়: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে একটা আগ্রহ তৈরী হয়েছে বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নানান অভিন্ন ইস্যু আছে, যেমন- ৪ হাজার কিলোমিটারের সীমান্ত আছে, ৫৪টি অভিন্ন নদীর সমস্যা যার একটি স্থায়ী এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দুটি প্রতিবেশী দেশ কী ধরনের অবস্থান নেয়, সেটাও মানুষের বিশেষ আগ্রহের জায়গাটি ইত্যাদি।
ঐতিহাসিকভাবেও বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্ককে বাংলাদেশ সব সময় কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া এবং মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশ সব সময় ভারতকে একটা ঐতিহাসিক সম্পর্কের জায়গা থেকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে। যেহেতু, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক সব সময় একটা সৌহার্দপূর্ণ এবং বন্ধু ভাবাপন্ন, সেহেতু আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তির হাতে ভারত বিরোধিতা ও বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। ফলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনেক দিক দিয়েই বেশ গুরুত্বপূর্ণ যা নিয়ে দুই দেশেই ইতোমধ্যে নানান আলোচনা, বিচার ও বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে এবং এ আলোচনা চলবে আরো কিছুদিন।
এখন এই সফরের প্রাপ্তির বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় আসা যাক। গন মাধ্যমের খবরে প্রকাশ দুই দেশের মধ্যে সাতটি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। যেমন - (১) কুশিয়ারা নদী থেকে ১৫৩ কিউসেক পানি উত্তোলনের জন্য সমঝোতা স্মারক, (২) বাংলাদেশ ও ভারতের বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিলের মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক, (৩) ভারতের ভোপালের ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি ও বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, (৪) বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য সমঝোতা স্মারক, (৫) বাংলাদেশ ও ভারতের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, (৬) বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে ‘প্রসার ভারতী’র সমঝোতা স্মারক, (৭) স্পেস টেকনোলজি বা মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে সমঝোতা স্মারক।
সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন স্মারকটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কেননা এর দ্বারা বাংলাদেশের সিলেট ও ভারতের আসামের লোকজন উপকৃত হবে। এর অধীনে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ নদী কুশিয়ারা থেকে প্রতি সেকেন্ডে ১৫৩ কিউসেক পানি উত্তোলন করতে পারবে বাংলাদেশ। এই সমঝোতার মাধ্যমে দুই দেশের এই অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের ইস্যুটির নিষ্পত্তি হলো। কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টনে সমঝোতা আশার আলো ছড়াচ্ছে সিলেট অঞ্চলে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এই সমঝোতায় অন্তত ১০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি চাষের আওতায় আসবে। জমিগুলো ভরে উঠবে ফসলে। চাষাবাদে আসবে ব্যাপক পরিবর্তন।
জানা যায়, ভারতের বরাক নদী সিলেটের জকিগঞ্জের অমলসীদ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে সুরমা ও কুশিয়ারায় ভাগ হয়েছে। কুশিয়ারার উৎসমুখ থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে শরীফগঞ্জ বাজার। এই বাজারের কাছেই কুশিয়ারা নদী থেকে উৎপত্তির হিমপুর খালের। প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রাকৃতিক খাল থেকে উৎপত্তি হয়েছে আরও অসংখ্য খালের। আশপাশের এলাকার কৃষকদের সেচের প্রধান উৎস এই খালগুলো। তবে বর্ষায়ও তেমন পানি থাকে না এই খালগুলোতে। আর শুষ্ক মৌসুমে একেবারে শুকিয়ে যায়। এলাকাটি উঁচু হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে যখন খাল শুকিয়ে যায়, তখন পুরো গ্রাম শুকিয়ে যায়। গ্রামের পুকুরেও পানি থাকে না। জকিগঞ্জ এক সময় সুপারির জন্য বিখ্যাত হলেও শুকনো মৌসুমে সুপারি গাছও মরে যায়। উৎসমুখে কুশিয়ারা নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় কয়েক যুগ ধরে রহিমপুর খাল শুকনো মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমিতে রবি শস্যও আরও বিস্তীর্ণ হাওড়াঞ্চলে বোরো ধানের চাষাবাদ সম্ভব হয় না। যুগের পর যুগ জমিগুলো পড়ে আছে অনাবাদি অবস্থায়। এসব জমিকে চাষের আওতায় আনতে আপার সুরমা-কুশিয়ারা প্রকল্পের অধীনে ২০১০ সালে ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রহিমপুর খালের উৎসমুখে একটি পাম্প হাউস নির্মাণ করা হয়। রহিমপুর সহ আশপাশের কিছু খালের উন্নয়ন কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এর আগে প্রকল্পের সুবিধার্থে ২০০৯ সালে কুশিয়ারা নদীর পাড়ে খালের উৎস মুখে বাঁধ দেয়া হয়। ২০১৬ সালে খাল উন্নয়ন ও পাম্প হাউসের নির্মাণকাজ শেষ করে পাউবো। প্রকল্পের কাজ শেষে রহিমপুর খালে পানি প্রবাহ চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন উৎসমুখে নির্মিত তৈরি বাঁধ অপসারণ করতে গেলে বাধা দেয় ভারত। কুশিয়ারা নদীর ঠিক মাঝ দিয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখা থাকায় বাংলাদেশের এই পাড়টি নোম্যানস ল্যান্ডের অংশ।
অন্য স্মারকগুলো প্রধানত আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এবং রেল অপারেশনের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি (ক্যাপাসিটি-বিল্ডিং) এবং জ্ঞান-শরিকের কাজে সব ধরনের বিবেচনায় বাংলাদেশ উপকৃত হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ আগামী ডিসেম্বরে মেট্রো রেলের যুগে প্রবেশ করছে। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের রেলওয়ের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
২ ও ৭ স্মারকের আওতায় বাংলাদেশ নানাভাবে উপকৃত হবে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্যাটেলাইটের যুগে প্রবেশ করেছে। এক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি ও জ্ঞান-শরিকের সুযোগ বাংলাদেশকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এসব স্মারকের বাইরেও দুটি বিষয়ে দুটি দেশ এক জায়গায় এসেছে; সেটা হচ্ছে জ্বালানি ও নিত্য পণ্যের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করা। বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য, যা যে কোনো অর্থনীতি এবং জীবন যাপনের জন্য একটি অনিবার্য উপাদান। ভারত বাংলাদেশকে জ্বালানি সরবরাহের ব্যাপারে সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এটা অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। আবার সংকটের সময়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সরবরাহেরও আশ্বাস দিয়েছে ভারত। ভারতের নিজস্ব চাহিদা পূরণ করে প্রয়োজনের সময় এবং সংকটের সময় বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি যা এ সফরের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
এসব স্বাক্ষরিত স্মারকের বাইরেও বাংলাদেশ ও ভারতের দেয়া যৌথ বিবৃতিতে আরো পাঁচটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের পক্ষে গেছে। যেমন- (১) সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থল, নৌ, আকাশ ও সীমান্ত অঞ্চল, (২) নারী-শিশু পাচার, অস্ত্র, মাদক, ও জাল মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ এক সঙ্গে কাজ করা, (৩) ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের ত্রিপক্ষীয় মহাসড়কে বাংলাদেশকে যোগ দেয়ার আহ্বান, (৪) সীমান্তে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনা এবং (৫) চাল, গম, আদা, পেঁয়াজ, ও রসুন প্রভৃতি নিত্য পণ্যের ব্যাপারে আগাম তথ্য আদান-প্রদান, যাতে হঠাৎ করে সংকটের মধ্যে পড়তে না হয়। এ যৌথ বিবৃতিতে এরকম অনেক বিষয় এসেছে যেখানে বাংলাদেশ নানা ভাবে লাভবান হতে পারে। সে বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে নানান অর্জনের হিসাব-নিকাশে সফল বলা যাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে একটা সুন্দর, সৌহার্দপূর্ণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাবাপন্ন একটা সম্পর্ক আছে এবং এ সম্পর্কের একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে, সেটা নতুন করে সম্পৃদ্ধ ও মজবুত হয়েছে এ সফরের মধ্য দিয়ে যা প্রশংসনীয়।
বর্তমান সরকারের সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের অমীমাংসিত স্থল সীমানা ও সমুদ্র সীমা শান্তিপূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়েছে। ২০১১ সালে সীমানা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ-ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করে, যা তিন বিঘা করিডর চুক্তি নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশি নাগরিকদের তিন বিঘা করিডর দিয়ে ২৪ ঘণ্টা যাতায়াতের পক্ষে সম্মত হয়। ২০১৫ সালে ভারতীয় সংসদ, সর্বসম্মতভাবে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থল সীমানা চুক্তি অনুমোদন করে যার ফলে দুই দেশের সীমানা নিয়ে বিবাদ শেষ হয়। ২০১৫ সালে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে ৫০ হাজার বিচ্ছিন্ন নাগরিক, যাদের কোনো জাতীয়তা ছিল না, তারা ভারত অথবা বাংলাদেশের নাগরিক হন। ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে তৎকালীন ১১১টি ভারতের ছিটমহল বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতের অংশ হয়ে যায়। বাংলাদেশ পায় ১৭ হাজার ২৫৮ একর এবং ভারত পায় ৭ হাজার ১১০ একর ভূমি।
শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারতের সঙ্গে পারস্পারিক সহযোগিতার এক অনন্য অবস্থানে বাংলাদেশ উপনীত হয়েছে। ভারত থেকে ভেড়ামারা-বহরমপুর গ্রিডের মাধ্যমে এবং ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। যৌথ উদ্যোগে রামপালে একটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌর শক্তি ও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে দুই দেশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে গঠিত আন্তর্জাতিক সোলার অ্যালায়েন্সেও বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা সংরক্ষণে দুই দেশের এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই সন্ত্রাসবাদ নিরসনে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘ সীমান্ত। দুই দেশের বন, নদী, গ্রাম এবং কৃষি জমির ওপর এই সীমান্ত বিস্তৃত, তাই দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীদের জন্য সীমান্তের ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত হত্যা কমে এলেও, সীমান্তে নিরস্ত্র লোকজনের হত্যা পুরোপুরি বন্ধের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের আরো কাজ করতে হবে। সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানব, মাদক ও সব ধরনের চোরাচালান বন্ধ করতে চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ক জোরদার হবে বলে আশা করা যায়। বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর, প্রকল্প উদ্বোধন ও দ্বিপক্ষীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পাশাপাশি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ও আহত ভারতীয় সেনাদের ২০০ জন সদস্যদের বংশধরদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুজিব বৃত্তি প্রদান করা হবে। এই বৃত্তি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের অবদানকেই শুধু স্বীকার করে না, এটি দুই দেশের একে অপরের প্রতি আস্থা ও বন্ধুত্বকেও মর্যাদা দেয়। ধর্ম নিরপেক্ষতা, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর থেকে অনেক এগিয়ে আছে। তবে বাংলাদেশ কিংবা এই উপ-অঞ্চলের কোনো দেশ একা টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না। দ্রত পরিবর্তনশীল ভূ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারসাম্য রক্ষা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আভ্যন্তরীণ সমর্থ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন জরুরি। শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও নিরাপদ প্রতিবেশী উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে অবশ্য প্রয়োজনীয়। একে অন্যের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার, জ্ঞান বিনিময়ের এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের অনুসৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষ নীতি দুই দেশের সৌহার্দপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য অপরিমেয় ভূমিকা রাখতে পারে।
মাননীয় প্রধামন্ত্রীর ভারত সফর বর্তমান বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি পারস্পরিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা আরো সুসংহত করবে সত্যি। যৌথভাবে রামপাল তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রের ইউনিট-১ সহ ভারতীয় সহায়তাপুষ্ট চারটি প্রজেক্টের উদ্বোধন করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তি না হওয়াটাকে যারা ভারতের সদিচ্ছার অভাব হিসেবে দেখাতে চান তাদের জন্য মেসেজটা পরিষ্কার। ভারত অভিন্ন নদীগুলোর পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা কখনই অস্বীকার করে না। তিস্তার সমস্যাটা একান্তভাবেই পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের কারণে ঝুলে আছে। আর ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্যকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রের নেই, এর মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন অন্যতম। বলার অপেক্ষা রাখেনা, তিস্তা সংকটের সমাধান হলেই দেশের জনগণ অন্য ১০টি প্রাপ্তির চেয়ে বেশি খুশি হতো। আন্তর্জাতিক নদী আইনে তিস্তার পানির ওপর বাংলাদেশের ন্যায্যতা থেকে ভারত আমাদের বঞ্চিত রেখেছে। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় তীব্র খরা আর বর্ষা মৌসুমে বাঁধ খুলে দেয়ায় ভয়াবহ বন্যা কবলিত হয় উত্তরাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা। ভারতের ‘তিস্তা নীতি’ বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনেও নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে রোহীঙ্গা সমস্যাটির ব্যাপারে ভারতের নিরব ভূমিকা অনেককে নিরাশ করলেও আরও অপেক্ষার দ্বার খোলা আছে তা নিয়ে কোন সংশয় নেই।
ভারত সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ককে যে কোন জায়গায় নিতে যেতে চায় তাও এই সফরে পরিষ্কার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট, সংক্ষেপে সেপা স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে দুই দেশের উৎপাদিত পণ্য দুই দেশেরই শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। তারপরও মানুষের আশার ত আর শেষ নেই যেমন. তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানিতে ফ্রি ট্রানজিট দেবে ভারত, কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টনে সমঝোতা, ১৫৩ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তে চাষাবাদে আসবে ব্যাপক পরিবর্তন, ভুটানের সঙ্গে রেল যোগাযোগ ও অন্যান্য আন্ত:সীমান্ত রেল সংযোগে বিভিন্ন বিধি নিষেধ প্রত্যাহার করা হবে, চিনি, পেঁয়াজ, আদা, রসুনের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য রপ্তানি বন্ধের আগে বাংলাদেশে আগাম জানিয়ে দিতে পদক্ষেপ নেবে ভারত, সীমান্তে প্রাণহানির সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করতে সম্মত হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মুজিব নগর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত ঐতিহাসিক সড়ক স্বাধীনতা সড়ক চালু করা হবে, নদী দূষণ এবং অভিন্ন নদ-নদীর ক্ষেত্রে নদীর পরিবেশ এবং নদীর নাব্যতা উন্নত করার মতো সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা হবে, রেলওয়ে সেবার মান বাড়ানোর জন্য আইটি সল্যুশন বিনিময় করা হবে, ২০২২ সালের মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে দু দেশের বাণিজ্যিক কর্মকর্তাদের কাজ শুরু করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, দেশে পণ্য রপ্তানিতে ফ্রি ট্রানজিট পাবে বাংলাদেশ, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নেপাল ও ভুটানে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করবে, তিস্তার বিষয়ে অব্যাহত চাপ বজায় রেখে ফ্রি ট্রানজিটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়ের ক্ষতি আংশিক হলেও বাংলাদেশ পুষিয়ে নিতে পারবে। তাই সার্বিক বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফর সফল হয়েছে এবং আগামী বাংলাদেশ বিনির্মানে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
লেখেক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডীন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ও সাবেক জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//