Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Tuesday, 20 Sep 2022 06:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

ড: মিহির কুমার রায়: বাংলাদেশের স্থিতিশীল ক্রেডিট রেটিং এবং সংকট প্রশমনে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার আলোকে এটি বলা যায় যে,  দেশটির ঋণ সংকটে পতিত হওয়ার আপাতত কোন সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশ আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়ার ঠিক পরই গত ২৮ জুলাই নিউইয়র্কভিত্তিক খ্যাতিমান ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি মুডি'সের ভাষ্য হলো-  'বাংলাদেশের ওপর ঋণের চাপ বাড়লেও ঋণ সংকটের ঝুঁকি কম।' সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠান,  সংস্থা কিংবা রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে পতনের হাত থেকে উদ্ধার করার জন্য বেইল আউট চাওয়া হয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে গণমাধ্যমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এখনকার প্রকাশিত খবর পদ্মা সেতু ঋণ চুক্তি বাতিল হওয়ার পরে তাঁদের ব্যর্থ মন্তব্য্যগুলোকে আর আমলে নেয়ার কোন ভিত্তি আপাতত নেই বললেই চলে। তবে বেসরকারী গবেষনা সংন্থা সিপিডি মনে করে সরকারের এই মুহূর্তে তিনটি বিষয় করণীয় যথা,  সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা,   বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে উৎসাহ দেওয়া এবং অসুবিধাগ্রস্থ মানুষকে সমর্থন দেওয়া। তাছাড়াও অংশগ্রহণমূলক নীতি সমঝোতার জন্য বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক সহযোগী, সুশীল সমাজ, অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ সহ নানান পর্যায়ে আলোচনা করে দুই থেকে তিন বছরের একটি স্বল্প মেয়াদি কৌশল প্রণয়নের পরামর্শ দেয় এই সংন্থাটি।

বর্তমানে যে আর্থিক কাঠামোসহ সরকারের যে ব্যয় সক্ষমতা তা উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে যথেষ্ঠ নয় যার ফলে সরকার অর্থ খুজছে,   ভর্তুকি কমিয়ে দিচ্ছে এবং জ্বালানি তেলের দর বাড়িয়ে মানুষকে কষ্টে ফেলেছে যা কাম্য নয়।

প্রসঙ্গত,  বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে যা বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের চেয়ে যা কম। ট্রেডিং ইকোনমিকস ডট কমের তথ্য অনুসারে,  ২০১৩ সালে বাংলাদেশে সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল ৩০-৩১ শতাংশে এবং ভারত ও পাকিস্তানে তখন এই অনুপাত ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল নাগাদ ৬০-৭০ শতাংশের খানিকটা ওপরে পৌঁছে। তবে ভারত ও বাংলাদেশে এই অনুপাত স্থিতিশীল এবং বাংলাদেশের গড় অনুপাত ভারতের চেয়ে অনেক কম। তারপরও সরকার বৈশ্বিক চাপের মধ্যে রয়েছে যা প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সাংবাদিক সম্মেলন থেকে বেড়িয়ে এসেছে যেমন- ইউক্রেন যুদ্বের ভয়াবহতা, জ্বলানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও যার ফলে উ্ৎপাদন প্রকৃয়ায় মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব ইত্যাদি। 

অর্খনৈতিক খাতের আরও একটি বিষফোড়া হলো খেলাপি ঋণ যার কোন সমাধান স্বল্প মেয়াদে সম্ভব হয়ে উঠছে না কেবল  রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারনে, যা আর্থিক খাতের জন্য এক মহা বিপদ সংকেত। অর্থমন্ত্রীরা ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথাও বলেছিলেন যার বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। ক্রমাগতভাবে খেলাপি ঋন বৃদ্বির কারনে গত জুন মহান জাতীয় সংসদে জনৈক সংসদ সদস্য কর্তৃক প্রশ্ন উত্থাপিত হলে অর্থমন্ত্রী তার উত্তরে  বলেন, ঋন খেলাপি হওয়ার কারন পাঁচটি যথা: এক: দেশীয় ও আন্তর্জ্যাতিক অঙ্গনে নিয়ম বহির্ভূত অনেক কিছু হয়েছে; দুই: ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে ঋন গ্রহিতা নির্বাচনে ব্যার্থ হয়েছে; তিন: ঋনের বিপরীতে রাখা পর্যাপ্ত জামানত, একি সস্পদ একাধিক ব্যাংকে জামানত রাখাও জামানত বাজার মূল্যের চেয়ে বেশী দেখানো; চার: গ্রাহকের সকল দলিল সংগ্রহ ও সঠিক যাচাই না করা; পাঁচ: ঋন গ্রহিতার তহবিল ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা, প্রয়োজন ও সামর্থের বিচার না করে আতিরিক্ত ঋন প্রদান, সময় সময় ঋন সীমা বাড়ানো, ঋন তফসিলকরন ও পুন:গঠন সুবিধা দেয়া ইত্যাদি।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন, ঋন খেলাপি হলে আদায় ও বিতরন ক্ষতিগ্রস্থ হয় যা সামষ্ঠিক অর্থনীতির বিবেচনায় জাতীয় আয়  (জিডিপি)তে এর নেতীবাচক প্রভাব ফেলে। তবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ঋন দেয়ার সংস্কৃতি যে ঋন খেলাপির অন্যতম কারন তা মন্ত্রী মহোদয় উল্লেখ করলে তার উল্লেখিত কারনগুলো আরও সম্পূর্ণ হতো।

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ঋণ খেলাপি দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।  বিশেষ করে ঋণ খেলাপিদের শাস্তি দেওয়ার আলোচনা এলেই একটা বিভাজন সরকারের তরফ থেকে করা হয় সেটি হলো ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি। কিন্তু কে যে ইচ্ছাকৃত আর কে নয়-তার কোনো সুরাহা হয়নি। যদিও অর্থমন্ত্রী বাজেটেই ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের নতুন এক দিক নিয়ে ফেসবুকে তিনি লিখলেন গত বছরের ৮ জুলাই। লেখার শিরোনাম ছিল—ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি একটা নেশা কেন?  

মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজনা নিয়ে ইদানীং কালের গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে মানুষের অর্থনৈতিক আচরণের বিষয় কিছু নতুন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। এর ওপর ভিত্তি করে নিওরো-ইকোনমিকস বলে অর্থনীতির একটা নতুন ধারার গবেষণাক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। দেখা গেছে মানুষের ভাবাবেগ,  যা মস্তিষ্কের সামনের অংশের স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে,  তা অনেক সময়েই পেছনের অংশের যুক্তিনির্ভর অংশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর ফলে অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তক মানুষের অর্থনৈতিক আচরণকে যুক্তিভিত্তিক বলে যে অনুমান করা হয়, বাস্তবে আবেগ তাড়িত হয়ে মানুষ অনেক সময়েই তেমন আচরণ করে না।  

আমাদের ব্যাংকিং খাতের ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিরা কেন বার বার একই কাজ করেন তার অন্তত একটা আংশিক উত্তর উপরিউক্ত গবেষণা থেকে মিলতে পারে।

তার অর্থ,  ইতিমধ্যে এভাবে আসক্ত হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ছাড়া শুধু আর্থিক খাতের সংস্কার দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান মিলবে না। তবে বৈধ পথে মুনাফা অর্জনের নেশা সফল উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় বড় বড় শিল্পপতিরা অগাধ ধন সম্পদের মালিক হয়েছে যে আরও মুনাফা অর্জনের নেশায় সর্বক্ষণ তাড়িত হন,  বিগত শতাব্দীর বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ সুম্পিটার একে এক ধরনের জৈবিক তাড়না বলে অভিহিত করেছিলেন। আধুনিক নিউরো সায়েন্সের গবেষণা থেকে এখন এর আরও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা পাওয়া গেল।

এখন খেলাপি ঋন আদায়ে যে সকল বিষয়গুলো সুবিবেচনায় আনার প্রয়োজন রয়েছে তা হলো: প্রথমতঃ ঋন বিতরন ও আদায়ে সমতা বিধান করা। ঋন বিতরন যদি স্বচ্ছতার সাথে উৎপাদনশীল খাতে হয় তাহলে আদয়ের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এ ব্যাপারে ব্যাংকার কাষ্টমারের নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যারা অসাধুতাকে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত করে তারাই উভয়ই সমান দোষী। এ ব্যাপারে প্রথমে ব্যাংকারদের সর্তক হতে হবে এবং পরিবর্তিতে গ্রাহকদেরও এই পথ অনুসরন করতে হবে;  
দ্বিতীয়ত: দেশের ৩৯টি বেসরকারি ও ৪টি সরকারি বানিজ্যিক ব্যাংক সাধারনত আর্থিক বাজারের অংশ হিসাবে স্বল্প মেয়াদে গৃহীতাদের ঋনের চাহিদা পূরন করার কথা। কিন্তু  বাস্তবে দেখা যায় এই ব্যাংকগুলো দীর্ঘ মেয়াদে চার পাচ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋন দিয়েছে যার বেশিরভাগ খেলাপী ঋনে পরিনত হয়েছে। এখন বানিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিয়ম নীতি ভঙ্গ করে ঋন দেয়া এবং ঋন খেলাপী হওয়ার মত একটি যাতনাকে বয়ে বেড়াচ্ছে যার ফলাফল তারল্য সংকট,  মুনাফার ঘাটতি ও ইমেজ সংকট। অথচ, দীর্ঘ মেয়াদে বৃহদায়কার ঋন প্রদানের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংক যেমন- বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), বেসিক ব্যাংক, রাকাব ইত্যাদি রয়েছে যারা সরকারি ব্যাংক হিসাবে সরকারের সাহায্যপুষ্ট হয়ে বেশি সময়ের অর্থায়নে অংশ নিতে পারে। এই অসংগতিগুলো দুর করা প্রয়োজন; তৃতীয়তঃ ব্যাংকিং খাতের বৃহদাকার ঋনগুলোর স্বচ্ছতার ভিত্তিতে মুল্যায়ন না হওয়ার অনেক অনাগ্রিধার কিংবা অলাভজনক খাতেও ঋন বিনিয়োগ হচেছ যা পরবর্তিতে  খেলাপী ঋনে পরিনত হয়। আবার রাজণৈতিক বিবেচনায় অনেক লোন মঞ্জুর  করা হয় যার বেশির ভাগ অনুৎপাদশীল খাতে চলে যায় যার পরিণতি হয় খেলাপী ঋন। এখন গনতান্ত্রীক সমাজে রাজনীতি সর্বক্ষেত্রে বিচরন করলেও অন্তত ব্যাংকিং এর মত সেবাধর্ম্মী আর্থিক খাতটিকে রাজনীতিমুক্ত রাখা যায় না কেন? এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকিং খাতের অভিবাবক হিসাবে তার সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না কেন? চতুর্থতঃ ঋন মওকুফ, ঋনের পুনঃতফসীলিকরন,  ঋনের অবোলপন ইত্যাদি বিষয়গুলো এখন খুবি ক্ষতিকর ও অলাভজনক। এখন ব্যাংকও ঢালাওভাবে সবাইকে সুযোগ দিতেও পারে না। কিংবা ঢালাওভাবে  বিবেচনায়ও আনতে পারে না। কিন্তু জায়গাটিতে ব্যাংকার কিংবা ব্যাংকিং সুসাশসনের অভাব পরিলক্ষিত হয় যা কোন ভাবেই প্রতিষ্ঠিত করা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা,  প্রশাসনিক সমর্থন ইত্যাদি তফসিলি বানিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য খুবি জুরুরি। সর্বশেষ বলা যায় সরকার যদি সচেষ্ট হয় তবে সামাজিকভাবে এই সকল খেলাপি ঋনের মোকাবেলা করাও সম্ভব আবার প্রশসনিকভাবেও সম্ভব। এখন কোনটি ভাল হবে তা কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবে তবে সমস্যার অবশ্যি শান্তিুপুর্ণ সমাধান চাই ব্যাংকিং শিল্পের স্বার্থে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি ও সাবেক জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা।