
ড: মিহির কুমার রায়: হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী দুর্গার আগমন ও প্রস্থানের বাহন নির্ধারিত করে মর্ত্যলোকে সারা বছর কেমন যাবে। এবার দেবীর আগমন হতিতে চড়ে, গমন নৌকায়। পূজামন্ডপ ঘিরে শুরু হয় নানা যজ্ঞ ও আয়োজন, নানা বর্ণে নানা উৎসবে ভরে থাকে সমস্ত প্রাঙ্গণ। কাঁসর ঘণ্টা আর ঢাকের তালে আন্দোলিত হয়ে ওঠে পূজার সকল আয়োজন। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিন অর্থাৎ ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচদিন (১-৫ অক্টোবর, ২০২২) দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এই পাঁচদিন দুর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আর সমগ্র পক্ষটি দেবীপক্ষ নামে খ্যাত। দেবীপক্ষের সমাপ্তি হয় পঞ্চদশ দিনে অর্থাৎ পূর্ণিমায়। এই পঞ্চদশ দিনটিতে বাৎসরিক লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়।
সার্বজনীন এই দুর্গাপূজা মূলত পাঁচদিনের অনুষ্ঠান হলেও বাস্তবে মহালয়া থেকে উৎসবের সূচনা এবং লক্ষ্ধসঢ়;মীপূজায় তার সমাপ্তি। কুমারী পূজা দুর্গাপূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শাস্ত্র মতে ১ বছর থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প অবিবাহিত সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ কুমারী কন্যাকে পূজা করা হয়। নির্বাচিত কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড়ে দেবীর মতো সাজিয়ে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপচারে পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
কুমারী পূজার মধ্য দিয়ে নারী জাতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদিত হয়। ১৯০১ সালে ভারতীয় দার্শনিক ও ধর্ম প্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ সর্বপ্রথম কলকাতার বেলুড় মঠে কুমারী পূজার প্রচলন করেন। হিন্দু সমাজে বাল্যবিবাহ, সতীদাহ, চিরবিধবাসহ নানা অবিচারে তখন নারীরা ছিলেন নিপীড়িত। নারীকে দেবীর আসনে সম্মানিত করার জন্যই হয়ত স্বামী বিবেকানন্দ এই পূজার প্রচলন করেন। আধ্যাত্মিক ও জাগতিক কল্যাণ সাধন এই কুমারী পূজার মূল লক্ষ্য।
ইতিহাসে দেখা যায়, দুর্গাপূজা মূলত সীমাবদ্ধ ছিল ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে। লক্ষী বা সরস্বতী পূজার মতো এর ব্যাপকতা ছিল না অর্থনৈতিক কারণে। দুর্গাপূজা করতে অনেক আড়ম্বর-আয়োজন করতে হয়। চলেও চার-পাঁচদিন ধরে। বিপুল ব্যয়। আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলে এ পূজা করা সম্ভব নয়। যাদের ঘরে চাল বাড়ন্ত চার-পাঁচদিনের পূজা তাদের চলবে কেন? অনেক দেব-দেবীর একত্র অধিষ্ঠান বলে এখানে পূজার সংখ্যাও বেশি।
মহাদেব-লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশের পাশে পূজা পায় কলা-বউও। এমনকি মহিষাসুরকেও পূজা দিতে হয়। ফলে এই মহা- আয়োজন করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। ব্রিটিশ আমলে প্রতি গ্রামের দু-তিন ঘর সম্পন্ন পরিবার এই পূজা করত। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষও আনন্দ পেয়েছে বটে, তবে সেটা প্রসাদ পাওয়ার আনন্দ, বাদ্য-বাজনা শোনার আনন্দ, দূর থেকে দেখার আনন্দ।
কামার-কুমাররা এটা-ওটা বানিয়েছে বিক্রি করার জন্য। সম্পন্ন পরিবারের সন্তানরা অর্থনৈতিক কারণে নতুন যুগের হাতছানিতে এগিয়ে যায়। তারা ব্যবসা বা লেখাপড়ায় নিবিষ্ট হয়। সেই সূত্রে বাড়ির বাইরে, অন্যত্র অবস্থান বা প্রতিষ্ঠা ঘটে তাদের। দেখা গেছে, পারিবারিকভাবে দুর্গাপূজা হওয়ায় পূজার সময় সেসব পরিবারের সন্তানরা বাড়িতে একত্র হয়। এ থেকেই ঐক্য ধরে রাখে পরিবারটি। অবশ্য একই বড় পরিবারে একাধিক পূজাও হয়েছে; ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয়।
এবারকার অবস্থা হলো দুর্গাপূজা যা সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনেই উৎসব পালিত হবে বলে জানিয়েছেন পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ। ২০১৯ সালে সারাদেশে প্রায় চার হাজারের বেশি পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যার ব্যতিক্রম গত ২০২০ ও ২০২১বছরে হয়েছে ও বর্তমান বছরেও হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। যদিও সরকার পূজা উদ্যাপনের জন্য বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে প্রশাসনিক কমিটির মাধ্যমে, তারপরও আভাস পাওয়া যাচ্ছে পূর্বেকার মতো এবারও সেরকম জাঁকজমক হতে পারে যদিও করোনার প্রভাব অনেক কম। তারপরও সরকারের প্রচেষ্টায় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে, যা কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
এখন আসা যাক শারদীয় দুর্গাপূজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনীতির সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। ফুল একটি পূজার উল্লেখযোগ্য উপকরণ, যা ভিন্ন রঙের ভিন্ন বর্ণের হয়ে থাকে। এবার এই দুষ্প্রাপ্য ফুলের জোগান কে দেবে? কারণ দেশের স্থানীয় পর্যায়ে যে ফুল হয় তা দিয়ে হয়ত গ্রামের পূজারী কোনভাবে সামলাতে পারবে। কিন্তু ঢাকাসহ বিভাগীয়/জেলা শহরে পূজার ফুল সরবরাহ হতো যশোরের গদখালী থেকে, যা করোনার কারণে বিপদগ্রস্ত হয়ে গেছে চাষিরা।
এখন ফুলের জমিতে সবজি কিংবা ধানের চাষ করছে কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে। শারদীয় উৎসবকে ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যের যে প্রসার তা এই খাতটিকে প্রসারিত করে থাকে। যেমন- ফুলফল, ঢাক, বাদ্য-বাজনা, কাপড় বিতরণ, অলঙ্করণ, মুদ্রণ শিল্প, ভোগ্যপণ্য, যেমন- চাল, ডাল, সবজি ক্রয়-বিক্রয়, কুমার, মৃতশিল্পী, ডেকোরেটর, খেলনা, মিষ্টি ইত্যাদি। আবার সামাজিক/সংস্কৃতির বলয়ে এই পূজার গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন-শিল্পীদের ভক্তিমূলক গান, লক্ষ্মীবিলাস, নৌকাবিলাস, নিমাই সন্ন্যাস, যার সঙ্গে তাদের আয় উপার্জনের অর্থনৈতিক কাজকর্ম জড়িত থাকে।
প্রতি বছরই এই দিনটির জন্য ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় থাকে, যা দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নের এক ব্যাপক নিদর্শন বটে। পূজা উপলক্ষে গ্রামীণ মেলা বসে পূজাম-পকে ঘিরে, যা করোনার কারণে গত বছরের মতো এবারও বিঘ্নীত হতে পারে, যা মেলার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রতিমা সামগ্রীর দাম, মৃৎশিল্পীদের বায়না, পতিতালয়ের মাটির দাম (যা মূর্তি তৈরিতে ব্যবহার হয়) চরমে উঠেছে। ফলে পূজার ব্যয়ও বাড়বে, পূজারীদের আয়োজনও কমাতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানাও বাধ্যতামূলক থাকবে, যা এরই মধ্যে সার্বজনীন পূজা উদ্যাপন কমিটি ও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে। তাই পূজার সামষ্টিক অর্থনীতি দেশের সার্বিক অর্থনীতির কাঠামোতে বিবেচনায় আনতে হবে এবং নিরূপণ করতে হবে, বিশেষত করোনাকালের পরবর্তি পরিস্থিতির বিবেচনায়। উল্লেখ্য, শরতের শুভ্র আকাশ, কাশফুলের হাওয়ার নাচন আর আগমনী ঢাক-শাঁখের আওয়াজ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় গ্রাম-নগর, ধনী-গরিব, ছোট-বড় নির্বিশেষে এই শরতের মহামিলন উৎসবে।
এবার অন্যনণ্য সময়ের মত পূজার আযোজনে আরও একটি পণ্য যোগ হয়েছে যা হলো ইলিশ মাছ যা বিজয়া দশমীতে রিতি অনুসারে ব্যকহ্রত হয় বিেেষত; বাঙ্গালী অদ্ভোশিত বাংলাদেশ সহ পশ্চিম বঙ্গে । এখানে উল্লেখ্য যে ইলিশ মাছ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং ইলিশ উৎপাদনে পৃথিবীর এক নং স্থানে রয়েছে যা জাতীর গর্ব ।
প্রতি বছর ইলিশ রপ্তাণী করে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে যার বব্যতিক্রম এ বছরও ঘটেনি যেমন বিগত ১১ দিনে ভারতে রপ্তানি হয়েছ ৬১৮ মেট্রিক টন ইলিশ। এদিকে নতুন করে দুই দফায় আরও ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ৫০ মেট্রিক টন করে ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। এ নিয়ে ভারতে ইলিশ রপ্তানি হবে মোট দুই হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ ইন্সপেক্টর জানান, প্রতি প্রতিষ্ঠানকে ৫০ মেট্রিক টন করে ৫৯টি প্রতিষ্ঠানকে দুই হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। ইলিশ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অর্পিতা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক বিশুদানন্দা আচার্জি বলেন, প্রতিকেজি ইলিশের রপ্তানি মূল্য ১০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৯৪৮ টাকা।
ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশের কাস্টম থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ইলিশের এই চালান ছাড় করানো হচ্ছে। আসন্ন দূর্গাপূজা উপলক্ষে ইীলশের কদর রয়েছে। আবার রাজ নোজনৈতিক অঙ্গনেও উপহাার হিসাবে প্রতিবেশীদের বিশেষ করে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যে ইলিশের আদান প্রদান হয়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, এমপি বলেছেন, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। অথচ একসময় ইলিশ এতটাই দুষ্প্রাপ্য হয়ে গিয়েছিল যে, বাচ্চাদের ছবি এঁকে দেখাতে হতো ইলিশ নামে একটা মাছ ছিল। অর্থাৎ ইলিশ হারিয়ে যাচ্ছিল। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বর্তমান সরকার জোরালো অবস্থান নিয়েছে। মা ইলিশ ও জাটকা আহরণ বন্ধ থাকাকালে আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি। আকাশপথে মনিটরিং করে ইলিশ রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছি। ইলিশের জন্য গবেষণাগার তৈরি হয়েছে। অভয়াশ্রম করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের একটা স্বপ্নের জায়গা হচ্ছে ইলিশ। এজন্য সরকারের উদ্যোগে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ইলিশের স্বাদ, গন্ধ আমরা সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর পানি দূষণ, অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিং এসব কারণে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ বিভিন্নভাবে বিঘ্নীত হচ্ছে। এ কারণে কোনো কোনো সময় ইলিশ স্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। বিষয়টি আমরা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছি।
চলতি বছর অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় আকারের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে ইলিশের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে ইলিশের আকার বাড়ছে। গন্ধও ফিরে আসছে। এ সবকিছু সরকারের সুন্দর ব্যবস্থাপনার কারণ সম্ভব হয়েছে। দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে।
গত তিন যুগে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ছয়গুণ, মাছের উৎপাদন বাড়ায় খাবারের বড় জোগান তৈরি হচ্ছে, প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে, বেকারত্ব দূর হচ্ছে এবং মাছ রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করায় জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। সরকার ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ২৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে বলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন হয়েছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের অনুমোদনের সময় ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে খাঁচায় অন্যান্য মাছ চাষের জন্য প্রশিক্ষণের তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ইলিশ আহরণে নিয়োজিত ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জন্য সৃষ্টি করা হবে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ। জেলেদের ১০ হাজার বৈধ জাল বিতরণ ও প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রমে সুরক্ষা দেয়া হবে। নিম্ন মেঘনা নদী, তেঁতুলিয়া নদী, আন্ধারমানিক নদী, নিম্ন পদ্মা নদীতে নির্দিষ্ট সময়ে মা ইলিশ আহরণ বন্ধ করা হবে। ইলিশ অভয়াশ্রম সংলগ্ন ১৫৪টি ইউনিয়নের জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ১ হাজার ২৩২টি সভা, ৬০টি নানা ধরনের কর্মশালা, অভিযান পরিচালনার জন্য ১৯টি বোট কেনাসহ মা ইলিশ সংরক্ষণে ১৩ হাজার ৪০০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জেলে পরিবারে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ১৮ হাজার জেলেকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
পদ্মার ইলিশ সম্পর্কে মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের ইলিশ বিষয়ক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলেন, ইলিশ সারা বছর সাগরে থাকলেও শুধু ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে। নদীর ইলিশ একটু বেটেখাটো, তবে সাগরের ইলিশ হবে সরু ও লম্বা; পদ্মা নদীর ইলিশ একটু বেশি উজ্জ্বল, গায়ের রং চকচকে ও বেশি রূপালী হয়।
অন্যদিকে সাগরের ইলিশ তুলনামূলক কম উজ্জ্বল; পদ্মা মেঘনা অববাহিকার ইলিশ মাছের আকার হবে পটলের মতো, অর্থাৎ মাথা আর লেজ সরু আর পেটটা মোটা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে লেজের একটু উপর থেকে মাছটা গোল হতে শুরু করে; ইলিশের আসল পার্থক্য বোঝা যাবে খাওয়ার সময়। পদ্মার ইলিশের যে স্বাদ আর গন্ধ তার সঙ্গে অন্য কোন নদীর বা সাগারের মাছের তুলনাই চলে না।
এবার বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে প্রায় ৩২ হাজারেরও বেশী দূর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে এবং সেই সাথে ধর্ম্মীয় আবরনে ইশিশের কদরও বাড়বে । এতে বছরে ৭ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ইলিশের বাজার সৃষ্টি সম্ভব হবে বাংলাদেশে। এই প্রাকৃতিক সম্পদ রূপালী ইলিশের আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানিসহ এ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত আছে দেশের ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ মানুষ।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ টনেরও বেশি ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে, যা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৯-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন। গত নয় বছরের ব্যবধানে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। আগামী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে ৬ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে; যার বাজার মূল্য ১৮ হাজার কোটি টাকা।
ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ইলিশ। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এই মাছ, যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের এক সুদূরপ্রসারি সাংস্কৃতিক অর্জন।
প্যাটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তরের সূত্রমতে, জিওগ্রাফিক্যাল ইনডেক্স বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ইলিশ মাছের নাম নিবন্ধন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডবিউটিও) বিশ্ব মেধাস্বত্ব কর্তৃপক্ষের (ডবিউআইপিআরও) সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। তদানুসারে ইলিশ এখন বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য।
সাম্প্রতিককালে ৬৮,৩০,৫৬৮ টন ইলিশ রপ্তানি করে ৪২৮৭.৬৪ কোটি টাকার সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর নানমুখী পদক্ষেপের ফলেই ইলিশের এই উল্লেখযোগ্য উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমন কারেন্ট ও বেহুন্দি জাল দিয়ে মাছ ধরা, যদিও সরকার জাটকা ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি, ঢাকা ও সাবেক জ্যাষ্ট সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা।
বিনিয়োগবার্তা/কেএসকে/এসএএম//