Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Saturday, 08 Oct 2022 06:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

ড: মিহির কুমার রায়: ঋণ উন্নয়নের একটি প্রয়োজনীয় উপকরন। বিশেষত: বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বৃহদকার অবকাঠামো উন্নয়নে এবং বর্তমানে ঘোষিত বাজেটের জিডিপির ৫ শতাংশের ঘাটতি মধ্যে দুই শতাংশের অর্থায়ন হয় বৈদেশিক সাহায্য থেকে। অর্থ্যাৎ জুন ২০২২ পর্যন্ত মোট সাহায্যের ৪০ শতাংশ দ্বিপাক্ষিক ও ৬০ শতাংশ বহুপাক্ষিক যার মধ্যে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ সবচেয়ে বেশি, যা মোট ঋণের যথাক্রমে ৩২. ৩৩ শতাংশ এবং ২৩. ৫২ শতাংশ আর দ্বিপাক্ষিক ঋণ এর মধ্যে জাপানের প্রায় ১৮ শতাংশ। 

সম্প্রতি ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রেসিডেন্ট মাসাতসুগু আসাকাওয়ার সঙ্গে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে এডিবির ক্রমবর্ধমান অর্থায়ন দাঁড়িয়েছে ২৭.৬ বিলিয়ন ডলার যার এর মধ্যে মোট বকেয়া ১১.৬৯ বিলিয়ন ডলার। 

বাংলাদেশ-এডিবি কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি (২০২১-২০২৫) জাতীয় উন্নয়ন ও লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি করা হয়েছে যরি আওতায় আগামী পাঁচ বছরে ১২-১৫ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তার জোগান থাকবে বলে আশা করা যায়। 

বাংলাদেশ অত্যন্ত সক্ষমতার সঙ্গে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করে চলেছে এবং ৫১ বছরের যাত্রায় কখনোই দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধে সরকার ব্যর্থ হয়নি। জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম ঋণের দেশের মধ্যে একটি যার হার মাত্র ৩৪ শতাংশ।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন সারাবিশ্বে প্রশংসিত হলেও কভিড এবং বর্তমান ভূ- রাজনৈতিক সংকটের কারণে খাদ্য, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং আর্থিক সংকট বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করেছে, সারা বিশ্বের মত মূল্যস্ম্ফীতি বাড়িয়েছে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করতে এডিবি থেকে বাজেট সহায়তার পাশাপাশি নীতিভিত্তিক ঋণ (পিবিএল) প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বর্তমানে ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলারেরএবং দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হতে পারে- ওষুধ, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল, পাট এবং পাটজাত পণ্য , দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, নার্সিং এবং আইটি। 

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ১১১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সাহায্য পেয়েছে এবং বাংলাদেশ কোনো বছর ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি যা একটি গৌরবের বিষয়।  

বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক ঋণস্থিতি ৫৬. ৬ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৭৭ শতাংশ হলো নির্ধারিত সুদ হার ও বাকি ২৩ শতাংশ ভাসমান হার। 

ঋণ নিয়ে সংকটে পতিত হওয়ার একটি উদাহরণ হলো নাইজেরিয়া এবং ঋণের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করে উন্নত হওয়া উদাহরন হলো জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।

বৈদেশিক সাহায্যের দুটি ধারা হলো অনুদান ও ঋণ। এখন বৈদেশিক সাহায্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য কতটা কার্যকর তা নিয়ে মতের পার্থ্যক্ষ রয়েছে দুই ধারার মধ্যে যার একটি হলো কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও টেকসই উন্নয়নের বিশেষজ্ঞ জেফ্রি স্যাকস্ ও বিপক্ষে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক উইলিয়াম এস্স্টারলি। 

বিতর্কের শুরু ২০০৫ সালে প্রকাশিত জেফ্রি স্যাকসের বেস্ট সেলার বই ‘দি এন্ড অব প্রভার্টি’র পর্যালোচনা যখন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

স্যাকসের বইয়ের মূল বিষয়বস্তুু ছিল কীভাবে পরিকল্পিত উন্নয়ন সাহায্যের মাধ্যমে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে চরম দারিদ্র্য দূর করা যায়, তার পন্থা নিয়ে। পরবর্তী সময়ে লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসে তিনি প্রত্যুত্তর দেন যে আমাদের ব্যর্থতার দিকে আঙুল না তুলে সফলতা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। 

গত বছর বাংলাদেশ সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বেশি ১০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা পেয়েছি এবং পাইপলাইনে আরো ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপর রয়েছে।  তারপর আরও বৈদেশিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বিশেষত: 

প্রথম: বিদেশি ঋণ তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তাা যার কারণ দেশজ বাজারের বিদ্যমান সুদের হার থেকে এই হার অনেক কম।

দ্বিতীয়ত: বৈদেশিক ঋণ সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদের জন্য দেওয়া হয় যমন: বিশ্বব্যাংকের লোনের ক্ষেত্রে মেয়াদ ২৫ বছর থেকে ৪০ বছর মেয়াদি হয়। তাছাড়া এর সঙ্গে গ্রেস পিরিয়ড ৫ থেকে ১০ বছর অন্তর্ভুক্ত থাকে, দক্ষিণ কোরিয়ার লোনের মেয়াদ গ্রেস পিরিয়ডসহ ৪০ বছর। জাপান থেকে যে লোন নেওয়া হয়েছে তার মেয়াদ ২০ বছর। বাংলাদেশ অদ্যাবধি যে ঋণ নিয়েছে তার গড় মেয়াদ ছিল ২৮ বছর এবং গ্রেস সময়কাল সাড়ে সাত বছর।

তৃতীয়ত: বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে কিছু শর্ত থাকে এবং তা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই শর্তাধীন দেশের জন্য মঙ্গলজনক এবং এতে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি জ্ঞান এবং প্রশিক্ষণ আদানপ্রদানের বিষয় থাকে যার ফলে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতি লাভ করা যায়। 

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আরো অনেক ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বিশেষ করে অনিশ্চিত বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ডলার সংকট যাতে ঘনীভূত না হয়, সেজন্য ঋণের সুযোগ গ্রহন করা অপরিহার্য বলে মনে করা হয়।

অনেকের মধ্যে ঋণ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে বিশেষ করে, শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতির কারণে অনেক অর্থনীতিবিদ-রাজনীতিক এখন ঋণকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করছে যা সংখ্যতত্বের মানদন্ডে টিকে না। কোনো দৃশ্যমান লাভ আমরা দেখিনি। 

বিষয়টির উত্তর অতি সহযেই দেয়া যায় যা অর্থনৈতিক মানদন্ডে বিচার্য্য যেমন বাংলাদেশকে প্রতি বছর ঋণ বাবদ পরিশোধ করতে হয় ২ বিলিয়ন ডলার আর শ্রীলঙ্কাকে করতে হয় ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হলো দেশটির জিডিপির ৬১ শতাংশ আর বাংলাদেশের তা ১৩ শতাংশ।

এছাড়া দেশটির মোট ঋণ (ঋণ জিডিপি অনুপাত) ১২০ শতাংশের কাছাকাছি, বাংলাদেশের তা ৪৫ শতাংশ।  শ্রীলঙ্কার বেশির ভাগ বৈদেশিক ঋণ কঠিন শর্তে নেওয়া আার বাংলাদেশ সহজ শর্তে এসব ঋণ নিয়েছে। 

শ্রীলঙ্কার প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হলো পর্যটন খাত যা করোনা মাহামারির কারণে গত দুই বছর এই খাতে ব্যাপক ধস নামে যার আঘাত লাগে সরাসরি রাজস্ব আয়ে। তারও আগে ২০০৯ সাল পর্যন্ত থামিল টাইগারদেও সাথে যে গৃহযুদ্ধ দীঘর্ সময়ে সংগঠিত হয়েছে তার ফলাফলও ভয়াবহ ছিল যেখানে পর্যটন খাত বিপদে ছিল। 

অপরদিকে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ঠিকই পরিশোধ করতে হয় দেশটিকে।। এদিকে বাংলাদেশের নেওয়া বেশির ভাগ মেগা প্রকল্পগুলো মূলত যোগাযোগ ও জ্বালানি উৎপাদনের জন্য।

এর মধ্যে পদ্মাসেতু নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং অন্য প্রকল্প  যেমন কর্তফুলী টানেল, মেট্রো রেল, ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর ও গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। 

তবে ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে যেমন বর্তমানে বাংলাদেশের ঋণের হার জিডিপির ৩৮ শতাংশ যা গত বছরের জুন পর্যন্ত মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৪৪ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা যা বৈদেশিক ঋণের এই হার জিডিপির ১৩ শতাংশ। 

আইএমএফের মতে বৈদেশিক ঋণের হার ৫৫ শতাংশের বেশি হলেই তা যেকোনো দেশের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে। শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে এসেছে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে। এর বিপরীতে ঋণ পরিশোধ করতে হবে ৪ বিলিয়ন ডলার। 

অপরদিকে বাংলদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলার নিচে যা দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে । তারপরও সরকার বিজার্ভ নিয়ন্ত্রনে কঠোর অবস্থানে রয়েছে যেমন অপ্রয়েজনীয় আমদানী পণ্য বন্ধ, বিদেশ সফরে নিয়ন্ত্রণ জোরধার, কম গুরুত্বপূণৃ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিরুৎসাহিত করন ইত্যদি।

তাছাড়াও বেশ কিছু মূল চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমন বানিজ্য ঘাটতি, রফতানী বাড়লেও রেমিটেন্স নিন্মমুখী। করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতিতে ঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে বিশেষ করে আমদানি ও কর্মসংস্থান জনিত ঝুঁকি। এর মধ্যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমায় আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। 

শ্রীলঙ্কার এই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ, ভারতসহ অন্য সব দেশ শিক্ষা নিতে পারে, এক্ষেত্রে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। এসব কর্মসূচি সময় মতো, সাশ্রয়ী ও দুর্নীতিমুক্তভাবে শেষ হয় সে বিষয়ে নজর দিতে হবে। 

দেশে বাস্তায়নাধীন মেগা প্রকল্পগুলোর নির্ধারিত সময়ে মধ্যে প্রকল্প শেষ করতে হবে, আগামীতে মূলস্ফিতী ও কর্ম সংন্থানকে আমলে আানতে হবে এবং সর্বপরি সুশাসন প্রতিষঠা করতে হবে, বাস্তবতার নিরিখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে, ঋণ করে ঘি খাওয়ার কৃষ্ঠি পরিহার করতে হবে, পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্যকরণের দিকে নজর দেওয়াসহ এক্সচেঞ্জ ব্যয় ম্যানেজমেন্ট করতে হবে, ব্যাংকে সঞ্চয় বাড়িয়ে তারল্য বৃদ্ধি করতে হবে, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতকে চাঙ্গা করে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে দরিদ্রপ্রবণ এলাকাগুলোতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে হবে, বৈদেশিক ঋণের ব্যাপারে আমাদের একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা করতে হবে যাতে এই সূচক কোনোভাবেই বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে না পারে এবং গতিটা যেন সেদিকে না হয়।

আমাদের রপ্তানি কি হারে বাড়ছে সেটা খেয়াল করা, রপ্তানি এবং এর পাশাপাশি রেমিট্যান্স এই দুটি আমাদের চলতি হিসাবের ভারসাম্যটা রক্ষা করে, চলতি হিসাবে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে যেন এটাকে কমানো যায়। এটার ভারসাম্য ঠিক রাখতে হলে বিষয়টিকে সমানে রাখতে হবে। 

এই চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে ফলে ডলারের বিপরিতে টাকার মূল্যমানের ক্রমাবনিতি লক্ষ করা যাচ্ছে যা কাম্য নয়।

এখানে উল্লেখ্য যে দেশটি আামাদের যা রক্তের বিনিময়ে  অর্জিত। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাবে প্রভাবন্বিত করুক সেই আশাই রইল।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি, ঢাকা ও সাবেক জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা।

বিনিয়োগবার্তা/কেএসকে/এসএএম//