
ড: মিহির কুমার রায়: গত ২৬ শে অক্টোবর বিশ্ব ব্যাংকের প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশ কিছু আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে যার মধ্যে আছে জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশ বেশ কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন কাটছাঁট করতে হচ্ছে যার প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদনে, জীবনমানে ও সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে। ফলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস করায় এবং মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করায় অর্থনৈতিক কাজে মন্দা আরও বাড়বে বলে প্রতিয়মান হয়।
বিশ্ব ব্যাংক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ২০২১ সালে সূচক ছিল ৯৪.৪ পয়েন্ট যা বেড়ে ২০২২-এ হয়েছে ১৫১.৭ পয়েন্ট, আগামী বছর তা কমে ১৩৪.৭ পয়েন্ট হবে, নন এনার্জি পণ্যের দাম বাড়বে যার মধ্যে এসব পণ্যের সূচক ২০২১ সালে ছিল ১১২ পয়েন্ট যা চলতি বছর বেড়ে হয়েছে ১২৩.৭ পয়েন্ট যা বছরের শেষ দিকে আরও বাড়তে পারে। তবে আগামী বছরের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে তা কমে হবে ১১৩.৭ পয়েন্ট। শিল্পের কাঁচামালের দাম বাড়বে এবং এসব পণ্যের সূচক ২০২১ সালে ছিল ৮৫.৫ পয়েন্ট, চলতি বছরে তা সামান্য কমে ৮১.২ পয়েন্ট হতে পারে, আগামী বছর তা আরও বেড়ে ৮৪.৭ পয়েন্ট হবে। ফলে শিল্পের খরচ বাড়বে। শিল্প পণ্যের দামও বাড়বে। ইউরোপে গ্যাসের সংকটের কারণে সারের দাম বাড়বে যা গত বছর সব ধরনের সারের মূল্য সূচক ছিল ১৩২.২ পয়েন্ট, চলতি বছর তা বেড়ে ২১৯.৫ পয়েন্ট হয়েছে, আগামী বছর তা হবে ২১৯.৮ পয়েন্ট। অর্থাৎ ২০২১ সালে যে পরিমাণ ১৩২ ডলারে কেনা হয়েছে তা আগামী বছর কিনতে লাগবে ২২০ ডলার, একইভাবে বাড়বে চালের দাম। গত বছর যে চাল ৩৩৫ ডলারে কেনা হয়েছে তা কিনতে এখন লাগছে ৪৩৫ ডলার যা আগামী বছর আরও বেড়ে ৪৩৭ ডলার হবে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি বন্ধ রাখায় বর্তমানে ৫৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে যেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো ৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট। দেশে বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে ৫২টি যার উৎপাদন সক্ষমতা সাত হাজার ১৬৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন বন্ধ রয়েছে। এছাড়া জ্বালানি তেলের অভাবে বন্ধ রয়েছে ১১শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক কেন্দ্র। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলে দেশের সব বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হতো যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এখন প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে গড়ে ৯ হাজার ২শ মেগাওয়াটের মতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে দেশীয় গ্যাসের পাশাপাশি ১ হাজার এমএমসিএফডি এলএনজি আমদানি করা হতো যা প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে শিল্প কারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা হতো।
এদিকে গ্যাসের অভাবে দেশের অনেক শিল্পোৎপাদন বন্ধ রেখেছে যার মধ্যে চিনি শিল্প গ্যাসের অভাবে উৎপাদন না হওয়ায় বাজারে চিনির দাম বেড়ে গেছে বিধায় সব গ্যাসনির্ভর সব শিল্পেরই একই অবস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়, চড়া মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে ইউরোপ-আমেরিকাসহ এশিয়ার দেশগুলোতেও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এতে বাজারে টাকার প্রবাহ কমেছে। ফলে অর্থনৈতিক মন্দায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এতে মূল্যস্ফীতির হার আগামীতে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। চাহিদা কমার কারণে আগামীতে বেশ কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে বলে বিশ্ব ব্যাংক আভাস দিয়েছে। তবে এগুলোর দাম আগামী বছরের মাঝামাঝি থেকে কমবে। এর মধ্যে রয়েছে সব ধরনের জ্বালানি, কৃষি পণ্যের মধ্যে গম, ভোজ্যতেল ইত্যাদি। মন্দা কাটিয়ে উঠার পর আবার হঠাৎ করে সব ধরনের পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাবে। এতে দামও বাড়বে। কিন্তু উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বাড়বে না। ফলে পণ্যের সংকট দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্ব ব্যাংক।
বৈশ্বিকভাবে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা আমাদের জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা জ্বালানির ওপর প্রভাব ফেলছে। আবার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে সংকটে ফেলছে যা পারস্পরিক সম্পর্কিত। সেই পরিস্থিতিতে প্রথমে আমাদের জ্বালানি সরবরাহের ওপর আলোকপাত করা দরকার। আমরা এখন কয়লা কিনতে পারছি, যদিও দামটা বেশি পড়ছে। আবার গ্যাসের ক্ষেত্রে যেখানে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি রয়েছে, সেখান থেকে গ্যাস কেনা যাচ্ছে। তবে স্পট থেকে গ্যাস কেনায় সমস্যা হচ্ছে। আর আমাদের নিজস্ব গ্যাস সরবরাহ দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা তেমন কোনো পরিকল্পনায় যেতে পারছি না। এখন আমরা নিজস্ব গ্যাস উৎপাদনে মনোযোগী হচ্ছি। তবে এখানে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে ডলার এখানে বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু এখন আমরা ডলার সংকটে পড়ে গিয়েছি। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হাজারটা তৈরি করে লাভ নেই, যদি প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত না করা যায়। এখন দুদিক থেকে সমস্যা তৈরি হয়েছে- একটা অর্থনৈতিক, আরেকটা নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন না বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা। এ পর্যন্ত সরকারের যত পরিকল্পনা হয়েছে, সেগুলোতে নিজস্ব উৎপাদনের চেয়ে আমদানির ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমদানি করা প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতে রপ্তানির বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। তবে ধীরে ধীরে আমদানি কমিয়ে নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টিতে জোর দিতে হবে। এ জন্য বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন পড়বে। আগামীতে বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও জাইকার যে ঋণ প্রদানের কথা রয়েছে, সেটা হলে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট অনেকটা কেটে যাবে। তখন আমদের বিদেশি বিনিয়োগের ওপর জোর দেয়া প্রযোজন, তবে সেখানেও সমস্যা রয়েছে সে সকল সংন্থার শর্তগুলো পূরন অনেক ক্ষেত্রে জটিল হয়ে দাড়ায় যা আমরা সহজেই দেখতে পাই। মনে রাখতে হবে, জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আত্মনির্ভরতা। পুরোটা না পারলেও যতটা পারা যায়, তার চেষ্টা থাকতে হবে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটা খুব জরুরি। বিশ্ব বাজারের স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের দামই বাংলাদেশের জন্য বড় চাপ। অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করতে সরকারকে অবশ্যই সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কারখানাগুলোর কাজ শেষ করতে হবে, কয়লা সরবরাহ ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ সংযোগের (ট্রান্সমিশন লাইনের) কাজ শেষ করতে হবে।
লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবীদ