
নিজস্ব প্রতিবেদক: পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারের নর্থসাউথ রোডে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত কুইন টাওয়ার থেকে আরো দুজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান শুরুর পর বিকাল ৪টার দিকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২১-এ। এছাড়া আহত ৩১ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ফুলবাড়িয়ায় বিআরটিসি বাস কাউন্টারের কাছে সিদ্দিকবাজারে কুইন স্যানিটারি মার্কেট হিসেবে পরিচিত সাততলা ভবনে গত মঙ্গলবার বিকাল পৌনে ৫টার দিকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মার্কেটের বেজমেন্ট, প্রথম ও দ্বিতীয় তলা বিধ্বস্ত হয়। দুই পাশে আরো দুটি বহুতল ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংকের কার্যালয়। এটির নিচতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতকাল দ্বিতীয় দিনের উদ্ধার অভিযানে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে মমিনুদ্দিন সুমন ও রবিন হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ব্যবসায়ী মমিনুদ্দিন সুমন বিধ্বস্ত ভবনটির নিচতলার আনিকা এজেন্সির মালিক। এছাড়া নিহত রবিন হোসেন ছিলেন তার দোকানের কর্মচারী। শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার ছেলে রবিন ঢাকার জুরাইনে থাকতেন। দুর্ঘটনায় মো. মুসা মিয়া নামে এক যুবকের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে মৃত্যু হয়েছে। তার শরীরের ৯৮ শতাংশই দগ্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন আইয়ুব হোসেন। তবে তার বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক আকতারুজ্জামান বলেন, ‘র্যাবের ডগ স্কোয়াডের মাধ্যমে মরদেহ দুটির সন্ধান পাওয়া যায়। ভবনের বেজমেন্টের একটি স্থানে অনেক মাছি ছিল। সেখানে মরদেহ থাকতে পারে এটা ভেবে আমরা ডগ স্কোয়াড কাজে লাগাই। প্রায় ২ ঘণ্টার চেষ্টায় মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। পরে সেগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়।’
ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অভিযানে শুধু লক কাটার ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধারের পর বেজমেন্টে জমে থাকা পানি অপসারণের কাজ শুরু করা হয়েছে। সাততলা ভবনটির পানির ট্যাংক ও সেপটিক ট্যাংক ফেটে বেজমেন্টে পানি জমে যায়। সেই পানি এবং বেজমেন্টে পড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ চলছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের উদ্ধারকাজ পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দীন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটা নিছক দুর্ঘটনা। তার পরও তদন্ত চলছে। এরপর পরিপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। আমরা রাজউক ও সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মূল জায়গায় কাজ শুরু করতে হলে তাদের পরামর্শ প্রয়োজন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকও গতকাল উদ্ধার অভিযান পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো মন্তব্য না করলেও ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধান করে দেখা হচ্ছে। এখনো বিস্ফোরকের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।’
ভেতরে আর কেউ আটকে নেই বলে ধারণার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব আবদুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী বলেন, ‘ডগ স্কোয়াড দিয়েও পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে আমরা এখনো অভিযান সমাপ্ত করিনি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, জমে থাকা গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণ। চার সদস্যের তদন্ত কমিটিকে পাঁচদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’
এর আগে গতকাল সকালে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ভবনটি পরিদর্শন করে। ভবনের ধ্বংসস্তূপ, আহত ও নিহত হওয়ার ধরন দেখে দলের সদস্যরা মনে করছেন, বেজমেন্টের বদ্ধ কোনো কক্ষে গ্যাস জমে সেটি গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছিল। সেখানে যেকোনো উপায়ে স্পার্ক (আগুনের স্ফুলিঙ্গ) হওয়ার পরই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য পাঁচটি উপায়ে গ্যাস জমতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সেগুলো হলো ভবনের মাটির নিচে পানির ট্যাংক থেকে গ্যাস নির্গত হতে পারে; দুটি ভবনের মাঝখানে একটি সেপটিক ট্যাংক ছিল, সেখান থেকে গ্যাস নির্গত হতে পারে; বিচ্ছিন্ন হওয়া কোনো গ্যাসের লাইন থেকে গ্যাস জমতে পারে বা দেয়ালে মিথেন গ্যাস জমে থাকতে পারে; পয়োনিষ্কাশন লাইনের পাইপ লিকেজ হয়ে গ্যাস জমতে পারে অথবা ভবনে থাকা বড় জেনারেটর থেকেও কোনোভাবে গ্যাস জমতে পারে।
বিনিয়োগবার্তা/এসএএম//