
ড: মিহির কুমার রায়: আগামী আর্থিক বছর ২০২৩-২৪ এর বাজেট নিয়ে এরি মধ্যে আলাপ আলোচনা বেশ কিছুদিন যাবত চলছে যা আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে অবগত হয়ে আসছি। এরি মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রাক-বাজেট বৈঠকে একগুচ্ছ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। এরি মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীলতায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এছাড়া ভর্তুকিতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের ব্যাপারেও সতর্ক করা হয়েছে, পাশাপাশি জোর দিতে বলা হয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়াতে। সূত্র মতে, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা এবং আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের আকার বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ চলতি বাজেটের তুলনায় এর আকার প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে যার মধ্যে ভর্তুকির আকার এক লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। মোট কথা হলো সব কিছু ঠিক থাকলে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় এক সভায় বাজেটের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে এবং গতানুগতিক ধারায় জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে।
এখানে উল্লেখ্য যে প্রতিবছরই বাজেট প্রণয়নের আগে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে পৃথকভাবে ধারাবাহিক বৈঠক করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ যা প্রাক-বাজেট বলা হয়। ওই বৈঠকে মূলত মন্ত্রণালয়গুলোর সম্ভাব্য ব্যয়ের আকার চূড়ান্ত করা হয়, পাশাপাশি কোন খাতে বেশি গুুরুত্ব দেওয়া দরকার, কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে- এসব বিষয়ে সুপারিশ নেওয়া হয়। সম্প্রতি শেষ হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট বৈঠকে উঠে আসা প্রন্তাবনাগুলো নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে অর্থ বিভাগ এবং এর মধ্যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা, অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকট নিয়ে অনেক প্রস্তাব আসছে। সেখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগামী বাজেটে আরও দিকনির্দেশনা রাখতে বলা হয়, এছাড়া অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়াতে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ে কৃষকের কাছ থেকে ধানচাল সংগ্রহ ও ক্রয় আরও জোরদার এবং কৃষিতে ভর্তুকি বাড়িয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা করার সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো, যদিও চলতি অর্থবছরে কৃষিতে ১৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি রয়েছে। এছাড়া আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি ও কর প্রণোদনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবে আরও বলা হয়, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, আগামী বাজেটে গুরুত্ব কোনটি পাবে-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখা, উভয়ের মধ্যে যে কোনো একটি অগ্রাধিকার দিতে হবে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দেওয়া প্রস্তাবের মধ্যে আরও আছে ব্যাংকের সুদহার পুনর্গঠন, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি সহনীয় পর্যায়ে রাখা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও ব্যক্তি আয়করমুক্ত সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ, দরিদ্র জনগণকে গুরুত্ব দিয়ে মহামারি-পরবর্তী দারিদ্র ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেওয়া এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এসএমই খাতে জোর দেয়া ইত্যাদি।
নানা কারণে আগামী বাজেট সরকারের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং এর কারণ, বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদে এটি হবে শেষ বাজেট, পাশাপাশি এই বাজেটে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ-এর ঋণ প্রভাব থাকবে, সংস্থার শর্তমতে, কর জিডিপির অনুপাত দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানোর এই উদ্যোগ নতুন বাজেটে থাকতে হবে, ফলে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে আইএমএফ-এর শর্ত পালন করাও কঠিন হবে, এরই মধ্য দিয়ে সরকারকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। এরি মধ্যে আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আয় বাড়ানোসহ ১০ সুপারিশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এগুলো হচ্ছে ভর্তুকি ও বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনা, অভ্যন্তরীণ ঋণ কম গ্রহণ ও বৈদেশিক ঋণ বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া, ঘাটতি বাজেট সংকোচন করে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমানো ইত্যাদি। আগামী বাজেটে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের প্রভাব থাকছে, ফলে কেমন হওয়া দরকার এ বাজেট, এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদেরও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, কেহ কেহ বলছে কর জিডিপির অনুপাত বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে সরকারকে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আগের তুলনায় বেশি ব্যয় করতে হবে, ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমাতে হবে, নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে, বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখতে হবে, কৃষি খাত জোরদার করতে হবে খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে কর আহরণের দিকে নজর দিতে হবে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে একটি কর কমিশন গঠন করতে হবে, মুক্তবাণিজ্যের দিকে জোর দিতে হবে, পাশাপাশি আয়করকে গুরুত্ব দিতে হবে, বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংযত হতে হবে, টাকা ছাপিয়ে বাজেটে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে, বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়ন করতে হবে, রাজস্ব সংস্কার কার্যক্রমের ঘোষণা, বাজেটে ঘাটতি সংকোচনের পথে যেতে হবে ইত্যাদি।
এ ছাড়াও অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য হলো প্রতি বছর দেখা যায় প্রথমে বাজেটের যে আকার ধরা হয় সংশোধিত বাজেটে তা অনেকটা কমানো হয়। তার পরও প্রকৃত ব্যয় সংশোধিত বাজেটের চেয়েও কম হয়। কাজেই বাজেটের যে আকার ধরা হয় সেটা অর্থহীন। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানোসহ বেশকিছু প্রণোদনা বাড়ানো ও ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বেতন-ভাতায় বরাদ্দ বাড়ানোটা এড়ানো যেত। তবে সরকার বেশকিছু জনবল নতুন করে নিয়োগ দিয়েছে, আবার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট রয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এমনিতেই বড় ভর্তুকির চাপে পড়তে হয়েছে সরকারকে। আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব থাকছে।
আগামী বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাড়তি ভর্তুকির চাহিদা। চলতি বাজেটে শুধু ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৫২ হাজার কোটি টাকা। আগামী বাজেটে সেটা বেড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মতামত হলো আসন্ন বাজেটের আর্থিক কাঠানো প্রস্তুত করা অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় কষ্টকর। কারণ ব্যয়ের বড় দুটি অংশ যাবে ভর্তুকি প্রণোদনা ও সুদ পরিশোধে। এ দুই খাতে প্রায় ৫৭ শতাংশ ব্যয় হবে। এর সঙ্গে বেতন-ভাতাসহ সরকারের অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যোগ করলে সেটা ৯০ শতাংশের ওপরে চলে যাবে। তাই উন্নয়নমূলক কাজকর্ম করার জন্য অর্থ খুব কমই থাকবে। এটিই আগামী বাজেটের সব চেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেবে।
চলতি অর্থ বছরের বাজেট বাস্তবায়নের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল কেন্দ্রীক রাজস্ব আহরন, অবকাঠামোগত ঘাটতি, অগ্রাধিকারভিত্তিক সরকারি ব্যয় নির্ধারন, ঘাটতি বাজেটের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়, বৈদেশিক ঋন প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, ব্যাক্তি ঋনের প্রতিবন্ধকতা, রফতানী আমদানী বানিজ্যে সমতা আনয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সঞ্চয় বিনিয়োগের ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি যা একেবারেই দৃশ্যমান। এখন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা রোড ম্যাপ তৈরি, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, প্রকল্পের গুনগত বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করলে অনেক চ্যালেঞ্জই মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এখন প্রশ্নটি হলো তা কিভাবে সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী তার চলতি অর্থবছরে বাজেট সমপনী বক্তৃতায় মহান জাতীয সংসদে বলেছিলেন সকল বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলা করে বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন অর্থের কোন রকম অভাব হবে না। এখন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা মানেই এর সাথে সংযুক্ত জনশক্তি তথা প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর সক্ষমতা যা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে যা সরকার অবগত আছে। কিন্তু এর উন্নয়নের গতিধারায় কবে নাগাদ এই সক্ষমতা একটি গ্রহনযোগ্য পর্যায়ে পৌছাবে তা বলা দুস্কর কিন্তু দেশ উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে যে গতিতে তার চেয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এর জন্য প্রশিক্ষন ও তদারকির কোন বিকল্প নেই সত্যি কিন্তু একটি রোড ম্যাপ ধরে আগাতে হবে। প্রায়শই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এন,বি,আর,) এর সক্ষমতা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীভূক্ত প্রকল্পগুলোর ব্যয় দক্ষতা/ব্যয়ের মান নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন শোনা যায়, বিশেষত; অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে যার ভিত্তিগুলো সরকারকে আমলে নেয়া উচিত। কারণ রাজস্ব আয়ের আহরণের একটি বড় প্রতিষ্ঠান হলো এন,বি,আর যার সাথে সরকারের স্থায়ীত্বশিলতার প্রশ্নটি জড়িত। সে ক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নৈতিক ভিত্তি তথা প্রশাসনিক কাঠামো আরো জোরদার করতে হবে, নতুন নতুন করদাতা সংগ্রহে উপজেলায় আরও অফিস স্থানান্তর করতে হবে এবং বেশী বেশী কর মেলার আয়োজন নতুন অঞ্চলগুলোতে করতে হবে। আবার উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয়ের মান উন্নয়ন ও অব্যাহত দুর্নীতি প্রতিরোধে উদ্যোগী মন্ত্রনালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থমন্ত্রনালয়ের অর্থ অনু বিভাগকে উন্নয়নের সহযাত্রী হিসাবে কাজ করতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//