
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের প্রায় তিন মাস পর ঢাকায় স্টাফ কনসালটেশন মিশন পাঠিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ঋণসহায়তার শর্ত পূরণের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার জন্য সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি গতকাল ভোরে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। পরে সকালেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা। এ সময় তারা ঋণের অর্থ ব্যবহারের অগ্রগতি ও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের হালনাগাদ তথ্য জানতে চেয়েছেন আইএমএফ প্রতিনিধিরা।
বৈঠকের বিষয়ে মঙ্গলবার বিকালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক বলেন, ‘বাংলাদেশকে দেয়া আইএমএফের ঋণের অর্থ ব্যবহারের অগ্রগতিসংক্রান্ত যে আলোচনা হওয়ার বিষয় রয়েছে, তার মধ্যে ডলারের বিনিময় হার একটিতে নিয়ে আসা, ঋণের সুদহার বাজারমুখী করা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনার পদ্ধতি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। তবে ঋণ নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য আইএমএফ প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কিছু কার্যক্রমকে আপডেট করা হবে। আসন্ন মুদ্রানীতিতে বেশকিছু সংস্কার আসবে। এর মধ্যে অন্যতম ব্যাংকঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করতে হবে। সিঙ্গেল রেটে ডলারের দর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ১০৩ টাকা দরে ডলার বিক্রি করছে। আকু পেমেন্ট ছাড়া বড় ধরনের আউট ফ্লো নেই। ফলে ডলারের বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানির ক্ষেত্রে কোনো রকম কড়াকড়ি আরোপ করেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ছিল সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর এলসি খোলার। অর্থনীতিতে যে ধরনের নীতি গ্রহণের প্রয়োজন হবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সে ধরনের নীতিই গ্রহণ করবে। এটিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ। সে মোতাবেক কাজও চলছে।
আইএমএফ গত ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর মধ্যে এক্সটেনডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি (ইসিএফ) বা বর্ধিত ঋণ সুবিধা ও এক্সটেনডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি (ইএএফএফ) বা বর্ধিত তহবিল সুবিধার আওতায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ৩৩০ কোটি ডলার এবং নতুন গঠিত তহবিল রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির (আরএসএফ) আওতায় আরো ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ১৪০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের তিনদিন পরই প্রথম কিস্তিতে ছাড় করে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে মোট সাত কিস্তিতে ঋণের পুরো অর্থ দেবে আইএমএম।
জানা গেছে, আইএমএফের ঋণ নিতে ছোট-বড় ৩৮টি শর্ত পূরণ করতে হবে বাংলাদেশকে। শর্তগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই আর্থিক খাতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আর্থিক খাতের মধ্যে আবার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ব্যাংক খাত, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বে। এর মধ্যে গত মার্চ পর্যন্ত অর্জন এবং আগামী জুন ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে যেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে সেগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি যাচাই করবে এবারের মিশন। এছাড়া ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে যেসব শর্ত বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে সরকার, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য আগামী বাজেটে কী কী উদ্যোগ থাকছে, তাও পর্যালোচনা করা হবে।
আইএমএফের প্রতিনিধি দলটি গতকাল অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এটা আইএমএফের রুটিন স্টাফ মিশন। প্রতি বছরের মতো এবারো হচ্ছে। বৈঠকে সংস্থাটির প্রতিনিধিরা বাজেট বাস্তবায়ন, সংশোধিত বাজেট, আগামী অর্থবছরের বাজেট এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। রাজস্ব আহরণ, সরকারের ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দের বিষয়েও তারা জানতে চেয়েছেন। এছাড়া সার্বিকভাবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের তথ্যও জানতে চেয়েছে আইএমএফ। মূলত ঋণ পাওয়ার প্রায় তিন মাস পর বিভিন্ন শর্ত পূরণ ও সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে আইএমএফ টিম। তবে আগামী অক্টোবরে সংস্থাটির আরেকটি মিশন আসবে। সেই মিশনে বাংলাদেশের শর্ত পরিপালন ও সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়টি পর্যালোচনা করে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড় করা হবে। তার আগে বর্তমান মিশনকে প্রস্তুতিমূলক মিশন বলা যায়। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আবারো বৈঠক করতে পারে আইএমএফ।
বিনিয়োগবার্তা/এসএএম//