Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Sunday, 21 May 2023 12:35
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারই বাংলাদেশের রপ্তানি আয়কে বাঁচিয়ে রেখেছে। এর মধ্যে অবশ্য একক বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানই শীর্ষে।

অন্যদিকে প্রবাসী আয়ে বরাবরই শীর্ষে থাকত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। তবে দুই অর্থবছর ধরে এখন আরব আমিরাতকে হটিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। আর চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের প্রবণতা বাকি সময়ে বজায় থাকলে শীর্ষ স্থানও দখল করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

বাংলাদেশ মূলত আমদানিনির্ভর দেশ। এখানে রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় অনেক বেশি। বাংলাদেশ মোট আমদানির প্রায় অর্ধেক করে চীন ও ভারত থেকে। ফলে যে বাণিজ্যঘাটতি হয়, তা পূরণ করতে হয় মূলত প্রবাসী আয় দিয়েই। রপ্তানি ও প্রবাসী আয় ছাড়াও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আর দুটি উৎস হচ্ছে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ঋণ। এই বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) ক্ষেত্রেও শীর্ষ স্থানে যুক্তরাষ্ট্র।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ২০ শতাংশেরই গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ১৯ শতাংশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা। আর ১৬ শতাংশ প্রবাসী আয় আসছে সেখান থেকে। অন্যদিকে মোট পণ্য আমদানির পৌনে ৪ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

রপ্তানিতে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র পণ্য রপ্তানিতে অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বাজার। মাঝে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে জার্মানি বাংলাদেশি পণ্যের শীর্ষ গন্তব্য হলেও সেটি বেশি দিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানির ২০ শতাংশই হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। যদিও মোট পণ্য রপ্তানির ৪৪ দশমিক ৬০ শতাংশের গন্তব্য ইইউ। এই বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৪২ কোটি ডলারের পণ্য। তারপর জার্মানিতে ৭৫৯ কোটি ডলার, যুক্তরাজ্যে ৪৮৩ কোটি ডলার, ফ্রান্সে ২৭১ কোটি ডলার এবং স্পেনে ৩১৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই চার দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ, ৪৯ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গত অর্থবছর ১ হাজার ৪২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির মধ্যে তৈরি পোশাকই ছিল ৮৬ শতাংশ, যা পরিমাণে ৯০১ কোটি ডলার। এ ছাড়া ৩১ কোটি ডলারের হোম টেক্সটাইল রপ্তানি হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকের ২১ শতাংশ এবং হোম টেক্সটাইলের ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র।

বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানি ৮ শতাংশ কমেছে। তারপরও দেশটিতে সর্বোচ্চ ৭৯৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকই ছিল ৬৯৫ কোটি ডলার, যা কিনা বাংলাদেশে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ১৮ শতাংশের কাছাকাছি।

এক দশকের বেশি সময় ধরে অপ্রচলিত বা নতুন বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগদ সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। তারপরও মোট পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্য ও কানাডার বাইরে অন্যান্য দেশ থেকে রপ্তানি ১৫ শতাংশের ঘরে। গত অর্থবছর নতুন দেশগুলোতে ৬৩৭ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। অবশ্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এই পণ্যের রপ্তানি তার চেয়ে ২৬৪ কোটি ডলার বেশি।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ইইউ আমাদের অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা বা জিএসপির অধীনে অস্ত্র ছাড়া অন্য যেকোনো পণ্য শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ দিয়েছে। সে কারণেই আমাদের প্রায় অর্ধেক তৈরি পোশাক রপ্তানির গন্তব্য বর্তমানে ইইউ। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জিএসপি সুবিধা না দিলেও দেশটিতে ২১ শতাংশ পোশাক রপ্তানি হচ্ছে। এটিকে আমরা আরও বাড়ানোর চেষ্টাও করছি।’

চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে দেশটি থেকে ক্রয়াদেশ সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা। আবার চীনা তুলা ব্যবহার করার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানি কমছে ভিয়েতনামের। এই দুই দেশের ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এমন তথ্য দিয়ে ফারুক হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদেরা সম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের কথা বলছেন। সেটি তাঁদের বিষয়। আমরা আমাদের ব্যবসা চালিয়ে যাব। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র এখনো আমাদের তৈরি পোশাকের বড় বাজার।’

আমদানিতে শীর্ষে চীন
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ হাজার ৫৬০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয় (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেড এবং সেবা খাতের আমদানিসহ মোট আমদানি ৮ হাজার ৯৩৪ কোটি ডলার)। বিপরীতে পণ্য রপ্তানি ছিল ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলার।

সেবা খাতের রপ্তানি ৮৮৮ কোটি ডলারের। যদিও গত বছর পণ্য ও সেবা রপ্তানি থেকে ৫ হাজার ২৪৭ কোটি ডলার দেশে এসেছে। আর প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলারের। তার মানে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় থেকে পাওয়া ৭ হাজার ৩৭৯ কোটি ডলার দিয়ে পুরো আমদানি ব্যয় মেটানো যায়নি। এখানেই ঘাটতি ছিল ১৮১ কোটি ডলারের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে চীন থেকে। তারপরের অবস্থানে আছে ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ব্রাজিল, কাতার ও সৌদি আরব। অর্থাৎ আমদানিতে ষষ্ঠ অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র।

বাংলাদেশ গত অর্থবছর চীন থেকে ১ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলার এবং ভারত থেকে ১ হাজার ৩৬৯ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ২৮৩ কোটি ডলারের পণ্য।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে মূলত বাংলাদেশ আমদানি করেছে খনিজ জ্বালানি (৭৯ কোটি ডলার), লৌহ ও ইস্পাত (৭৩ কোটি ডলার), তেলবীজ ও ফল (৪৪ কোটি ডলার), তুলা (২৯ কোটি ডলার) এবং যন্ত্রপাতি এসেছে ১৩ কোটি ডলারের।

প্রবাসী আয়ে শীর্ষে সৌদি আরব
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিভিন্ন দেশ থেকে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। তার মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫৪ কোটি ডলারের জোগানদাতা হচ্ছেন সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তারপরই সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর পরিমাণ ৩৪৪ কোটি ডলার। আর ইউএই থেকে গত বছর ২০৭ কোটি ডলারের তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতির তোপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মানুষ চাপে রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত কিংবা কাতারের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসী আয় বেশি এসেছে। আর প্রথমবারের মতো সৌদি আরবকে পেছনে ফেলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি থেকে সর্বোচ্চ ৩০৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। সৌদি আরব থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩০৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষস্থান দখল করতে পারে কি না, তা জানা যাবে চলতি অর্থবছর শেষে।

বিদেশি বিনিয়োগেও শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র
বিদেশি বিনিয়োগ টানতে এক শ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে সরকার। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীন, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা শিল্প গড়তে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) অন্য দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রই এগিয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ১১৫ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছে। তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এসেছে ১৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ বা ৪১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ, এটি সর্বোচ্চ। তারপর যুক্তরাজ্য থেকে ২৭১ কোটি ডলার, সিঙ্গাপুর থেকে ১৮৪ কোটি, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১৪৬ কোটি এবং চীন থেকে ১৩৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ৪১০ কোটি ডলারের এফডিআইয়ের মধ্যে গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম খাতে ২৯১ কোটি ডলার, বস্ত্র খাতে ১২ কোটি ডলার, ব্যাংকিংয়ে ২০ কোটি ডলার, বিদ্যুৎ খাতে ১৭ কোটি ডলার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২৪ কোটি ডলার এবং বিমায় ২৭ কোটি ডলার রয়েছে। সূত্র: প্রথম আলো

বিনিয়োগবার্তা/এসএইচবি//