
ড: মিহির কুমার রায়: বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। এই সংকট বাড়ছে ব্যাংক খাতেও। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋনের হারে শীর্ষে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, যা মোট ঋনের ১০.৯ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ যার পরিমান মোট ঋনের ৯.৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আমদানি ব্যয়, নিয়মিত ঋন পরিশোধ না করা, নিয়ন্ত্রন সংস্থার দুর্বল ঋণ তদারকী ইত্যাদি কারনেও দেশে খেণাপি ঋন বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋন দাড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা যা বিতরনকৃত ঋনের ৮.১৬ শতাংশ, এর ১ বছর আগে একি সময়ে এই হার ছিল ৭.৯৩ শতাংশ খেলাপি ঋনের, সেই হিসাবে ১ বছরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। যা গেল খেলাপি ঋনের হিসাব, তার সাথে যদি পুন:তফসীল ও পুনর্গঠন করা ঋন, আদালতের স্থগিতাদেশের কারনে খলাপি ঋণ দেখানো যাচ্ছে না এমন ঋণ ও বিশেষ নির্দেশিত হিসাবের ঋনকে খেলাপি হিসাবে দেখানোর পক্ষে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে না যায়, সে জন্য গত ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নোটিশ জারি করে বিশেষ ছাড় দেয়। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে আমানত ও ঋণ নিয়ে ২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের প্রান্তিকের মতই ছিল, তবে এই সময়ের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের একই সময়ের চেযে বেশি।
সময়ের আবর্তে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীরা সংসদে ঋন নিয়ে কথা বললেও বিগত ২০০৯ সালের পর থেকে টানা দশটি বছর বাজেটে খেলাপি ঋন নিয়ে কেহ কথা বলেননি যদিও বর্তমান অর্থমন্ত্রী ২০১৯ সালে ক্ষমতা গ্রহনের পরপরি বলেছিলেন কাল থেকে কোন প্রকার খেলাপি ঋন আর থাকবে না। অথচ বিগত নয়টি বছরে এই খেলাপি ঋন ২২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে এখন দাড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার উপরে। তারপর ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋনের প্রসঙ্গটি নিয়ে আসেন এবং ভাল ঋন সংস্কৃতি গড়ার লক্ষ্যে তাদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধার কথা বলেছিলেন। অর্থমন্ত্রী ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথাও বলেছিলেন যার বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। ক্রমাগত ভাবে খেলাপি ঋন বৃদ্ধির কারনে গত মহান জাতীয় সংসদে জনৈক সংসদ সদস্য কর্তৃক প্রশ্ন উত্থাপিত হলে অর্থমন্ত্রী তার উত্তরে বলেছিলেন ঋন খেলাপি হওয়ার কারন পাঁচটি যথা: এক: দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ম বহির্ভুত অনেক কিছু হয়েছে; দুই: ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে ঋন গ্রহিতা নির্বাচনে ব্যর্থ হয়েছে; তিন: ঋনের বিপরীতে রাখা পর্যাপ্ত জামানত, একি সস্পদ একাধিক ব্যাংকে জামানত রাখা ও জামানত বাজার মূল্যের চেয়ে বেশী দেখানো; চার: গ্রাহকের সকল দলিল সংগ্রহ ও সঠিক যাচাই না করা; পাঁচ: ঋন গ্রহিতার তহবিল ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা, প্রয়োজন ও সামর্থের বিচার না করে আতিরিক্ত ঋন প্রদান, সময় সময় ঋন সীমা বাড়ানো, ঋন তফসিল করন ও পুন:গঠন সুবিধা দেয়া ইত্যাদি। অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন ঋন খেলাপি হলে আদায় ও বিতরন ক্ষতিগ্রস্থ হয় যা সামষ্ঠিক অর্থনীতির বিবেচনায় জাতীয় আয় (জিডিপি)তে এর নেতীবাচক প্রভাব ফেলে। তবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ঋন দেয়ার সংস্কৃতি যে ঋন খেলাপির অন্যতম কারন তা মন্ত্রী মহোদয় উল্লেখ করলে তার উল্লেখিত কারনগুলো আরও সম্পূর্ণ হতো।
এখন আসা যাক খেলাপি ঋনের সংখ্যাতাত্বিক বিশ্লেষন নিয়ে যা বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে গড়মিল রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক সম্প্রতি বলেছে দক্ষিন এশিয়ায় খেলাপি ঋনের হার সবচাইতে বেশী যা বাংলাদেশে (৯.৪%) যা তাদের প্রকাশিত গ্লোবাল ইকনমিক প্রসপেকটাস শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়েছে। এর পরপরি রয়েছে ভূটান (১০.৯%), আফগানিস্থান (১০.৮%), ভারত (৮.৯%), পাকিস্থান (৮.২%) এবং শ্রীলঙ্কা (১০.৯%)। খেলাপি ঋন বাড়লে নানা সমস্যা দেখা দেয়, যেমন, তারল্য সংকট যা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্থ করে এবং ব্যাংকের মুনাফা কমিয়ে দেয় যার প্রভাব পড়ে কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে টিআইবি বলছে, ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা; এর সঙ্গে অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ ৫৪ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা, বর্তমানে (২০২২) সে অংকটা আরও বেশী। বিভিন্ন সময়ে খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হলেও তা কার্যকর না করে বারবার ঋণ পুনঃ তফসিলীকরণ ও পুন:গঠন করা হয়েছো
সম্প্রতি টিআইবি পরিচালিত ‘ব্যাংকিং খাত তদারকি ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় যাতে গত কয়েক বছরে খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান ধারা বিশ্লেষণের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ তদারকিতে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিকাঠামোর নানা দিক তুলে ধরা হয়। তাদের মতে খেলাপি ঋণ হ্রাসে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় না আনায় দিন দিন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। গত ১০ বছরে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪১৭ শতাংশ। প্রকৃতপক্ষে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন লাখ কোটি টাকারও বেশী। সেই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ ও ব্যাপক অনিয়মে জর্জরিত ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য এ খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠনসহ ১০টি সুপারিশ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯-২০১১ সাল পর্যন্ত খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণের হার পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯ সালের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে বৃদ্ধি ৪১৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশনায় খেলাপি ঋণের মাত্র ২ শতাংশ ফেরত দিয়ে পুনঃ তফসিলীকরণের মাধ্যমে ১০ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। এভাবে খেলাপি ঋণ আদায় না করেই গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমিয়ে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে গত জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।
টিআইবির প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা; ব্যাংক কম্পানি আইনের ৪৬ ও ৪৭ ধারা সংশোধন করে বাংলাদেশ ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া; বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য, গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ ও অপসারণ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত নীতিমালা করা; বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে তিনজন সরকারি কর্মকর্তার স্থলে বেসরকারি প্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধি করা; ব্যাংকসংশ্লিষ্ট আইনসমূহে আমানতকারীর স্বার্থ পরিপন্থী ও ব্যাংকিং খাতে পরিবারতন্ত্র কায়েমে সহায়ক সকল ধারা সংশোধন কিংবা বাতিল করা; রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ সকল বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগে অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে একটি প্যানেল তৈরি; আদালত কর্তৃক স্থগিতাদেশ প্রাপ্ত খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার বিধান প্রণয়ন করা; বারবার পুনঃ তফসিল করে বারবার খেলাপি হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করা; ব্যাংক পরিদর্শনের সংখ্যা ও সময়কাল বৃদ্ধি, প্রত্যক্ষভাবে পরিদর্শন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভাগগুলোর শূন্যপদসমূহ অবিলম্বে পূরণ; পরিদর্শন প্রতিবেদন যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সমাপ্ত ও এর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং পরিদর্শনে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা পরিদর্শক দলকে দেওয়া এবং তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি ও বাস্তবায়নে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশ ব্যাংক এক নির্দেশনা জারি করে বলেছে করোনার প্রভাবে কেহ বছরের ১লা জানুয়ারী থেকে ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২০ পর্যন্ত কেউ ঋন পরিশোধ না করলে তাকে খেলাপি করা যাবে না। বিশেষ সুবিধার কারনে অপরিশোধিত এ সব ঋনের উপর অরোপিত সুদ ব্যাংকের আয় খাতে স্থানান্তর ও প্রভিশন সংরক্ষন বিষয়ে পরে নির্দেশনা দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে করোনা ভাইরাসের এ সময়ে অনাদায়ী ঋন বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত দেখাতে পারলে এসব ঋনের সুদ আয় খাতে নেওয়া যাবে না। স্বল্প মেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋন সহ বিদ্যমান মেয়াদি ঋনের অপরিশোধিত কিস্তি বিলম্বে পরিশোধ হিসাবে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে জানুয়ারী, ২০২১ থেকে অপরিশোধিত ঋনের কিস্তির পরিমান ও সংখ্যা পুননির্ধরিত হবে।
দেশের ৩৯টিরও বেশী বেসরকারি ও ৪ টি সরকারি বানিজ্যিক ব্যাংক সাধারনত আর্থিক বাজারের অংশ হিসাবে স্বল্প মেয়াদে গৃহীতাদের ঋনের চাহিদা পূরন করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এই ব্যাংকগুলো দীর্ঘ মেয়াদে চার পাচ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋন দিয়েছে যার বেশির ভাগ খেলাপী ঋনে পরিনত হয়েছে। এখন বানিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিয়মনীতি ভঙ্গ করে ঋন দেয়া এবং ঋন খেলাপী হওয়ার মত একটি যাতনাকে বয়ে বেড়াচ্ছে যার ফলাফল তারল্য সংকট, মুনাফার ঘাটতি ও ইমেজ সংকট। অথচ দীর্ঘ মেয়াদে বৃহদাকার ঋন প্রদানের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংক যেমন বাংলাদেশ ডেবোলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), বেসিক ব্যাংক, রাকাব ইত্যাদি রয়েছে যারা সরকারি ব্যাংক হিসাবে সরকারের সাহায্যপুষ্ট হয়ে বেশি সময়ের অর্থায়নে অংশ নিতে পারে। এই অসংগতিগুলো দুর করা প্রয়োজন।
ব্যাংক খাতে গত বছরের জুন পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৭৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৯৮ হাজার ১৬৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। যা মোট ঋণ বিতরণের ৮.৬১ শতাংশ। গত বছর মার্চে খেলাপি ছিল ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ‘ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ বলা যায় সরকার যদি সচেষ্ট হয় তবে সমাজিকভাবে এই সকল খেলাপি ঋনের মোকাবেলা করাও সম্ভব আবার প্রশসনিক ভাবেও সম্ভব। এখন কোনটি ভাল হবে তা কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবে তবে সমস্যার অবশ্যি শান্তিুপুর্ণ সমাধান চাই ব্যাংকিং শিল্পের স্বার্থে।
স্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অনেকদিন ধরেই ব্যাংকিং সেক্টরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য কার্যকর ও শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলে আসছেন। কিন্তু অতীতে সরকার তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি। তবে আইএমএফ বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করার ক্ষেত্রে আর্থিক খাত সংস্কার, বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়ের ওপর জোর দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের শর্ত পরিপালনের লক্ষ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের কিছু সুযোগ-সুবিধা কার্টেল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের পৃথকভাবে চিহ্নিত করা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি আর কারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নন, তা নির্ধারণের জন্য উপযুক্ত মানদন্ড থাকতে হবে, উপযুক্ত ও কার্যকর মানদন্ড না থাকলে তা চিহ্নিত করা খুবই কঠিন, যারা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে ঋণখেলাপি হয়ে থাকেন, তাদের সহায়তা দিয়ে ঋণ পরিশোধে সামর্থ্যবান করে তোলা যেতে পারে। কিন্তু ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে একটি শ্রেণি আছেন, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছা করেই ঋণের কিস্তি আটকে রাখেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা সাধারণভাবে অত্যন্ত ক্ষমতাবান, যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি তাদের যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে যদি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কার্যকরভাবে কমিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের মাত্রা বর্তমানে একটা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে, ঋণখেলাপিদের কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে তা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারীদের খেলাপি হতে উদ্বুদ্ধ করবে, বিশেষ কোনো সুবিধা যদি দিতেই হয়, সেটা দিতে হবে তাদের, যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিরূপ পরিস্থিতির কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কারণে ব্যাংকিং সেক্টর একটা দুরবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে। কাজেই তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না, খেলাপি ঋণের প্রাচুর্যের কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে যা কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যায় না। তাই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থমন্ত্রনালয় ও ঋণের গ্রহীতারা একসাথে হয়ে কাজ করতে হবে যার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোন বিকল্প নেই।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি ও সাবেক জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//