Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Saturday, 10 Jun 2023 06:00
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

ড: মিহির কুমার রায়: একাদশ জাতীয় সংসদের চলমান ২৩তম অধিবেশনে ১লা জুন নতুন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে নতুন বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্ফফা কামাল, যার শিরোনাম ছিল ‘উন্নয়নের অভিযাত্রার দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা’, যার আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। এটি দেশের ৫২তম, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম ও বর্তমান অর্থমন্ত্রীর পঞ্চম বাজেট বলে অভিহিত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, লেনদেনের ভারসাম্য পরিস্থিতির উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা - এই তিন বিষয়কে এবারের বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সরকার, কৌশলও নির্ধারণ করেছেন, যাতে এসবের প্রভাব থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করে অর্থনীতিকে গতিশীল করা যায়। নির্বাচনী বছরে একদিকে জনগণকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা দেয়ার তাগিদ, অন্যদিকে দেশীয় অর্থনীতিতে বিদ্যমান তীব্র চাপে সম্পদের অপ্রতুলতার মধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে।

সংখ্যাতাত্বিক বিষয়ে দেখা যায়, এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে ৮৩ হাজার ৭২১ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেট চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১ লাখ ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। আর সংশোধিত বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৫.২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটও ছিল জিডিপির ১৫.২ শতাংশ। তবে সংশোধিত বাজেটে এটি কমে ১৪.৯ শতাংশ হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস হতে এবং ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস হতে নির্বাহ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে ৬.৫ শতাংশ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঠিক করেছে ৭.৫ শতাংশ। বাজেটের আয়-ব্যয়ের বিশাল ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর ভরসা করছে সরকার। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যক্তি করসীমা বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং কিছু বিলাসী পণ্যের আমদানিকে নিরুৎসাহিত করা, আমদানি পণ্যে ব্যাপকভাবে সম্পূরক শুল্ক আরোপ, জমি-ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ব্যয় বৃদ্ধি, দ্বিতীয় গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে কর আরোপে স্বল্প আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। কিন্তু সরকারি সেবা পেতে প্রত্যেক নাগরিককে দুই হাজার টাকা ন্যূনতম কর দেওয়ার বিধান কতটা যৌক্তিক হয়েছে, তা ভেবে দেখা দরকার। একজন দিনমজুরেরও সরকারি সেবা নিতে হয়, তাঁকেও কি দুই হাজার টাকা কর দিতে হবে? জনস্বার্থ ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন ধরনের পণ্যে শুল্ক কর ও ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য, পোশাক ও ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতির দাম কমতে পারে। যেমন– মাংস, এলইডি বাল্ব ও সুইচ-সকেট, ই-কমার্সের ডেলিভারি চার্জ, মিষ্টি, কীটনাশক, স্প্রেয়ার মেশিন, হাতে তৈরি বিস্কুট ও কেক, ম্যালেরিয়া ও যক্ষার ওষুধ, পশুখাদ্য, অপটিক্যাল ফাইবার, উড়োজাহাজ ইজারা, কনটেইনার, ব্লেন্ডার, জুসার, প্রেশার কুকারের মতো গৃহস্থালি সরঞ্জাম উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা আরও দুই বছর (২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত) বহাল থাকবে। একই সুবিধা পাবে ওয়াশিং মেশিন এবং মাইক্রোওয়েভ ও ইলেকট্রিক ওভেন উৎপাদনকারী কারখানা। তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার পণ্য উৎপাদনে অব্যাহতি সুবিধা তিন বছর (২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত) বাড়ানো হয়েছে। রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজার উৎপাদনে এখনকার ৫ শতাংশের অধিক ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ এক বছর বাড়বে। স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারের কাঁচামাল আমদানিতেও ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা আরও এক বছর থাকবে। সাবান ও শ্যাম্পুর দুটি কাঁচামালে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা এক বছর বহাল রাখা হচ্ছে। বাজেটে বেশ কিছু পণ্যে শুল্ক আরোপ বা আগের চেয়ে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে দামি গাড়ি, বাইসাইকেল, নির্মাণ সামগ্রী, জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন, সিগারেট, বাসমতি চাল, কাজুবাদাম, সোনা, খেজুর, সিমেন্ট, রড, বিদেশি আঠা বা গ্লু, ভ্রমণ খরচ, প্লাস্টিকের গৃহস্থালি পণ্য, ফ্রিজ, ফ্যান ও এক্সেলেটর, টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, টিস্যু, ন্যাপকিন, কোমল পানীয়, ওভেন, কলম, চশমা ও এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়তে পারে। দেশ-বিদেশ ভ্রমণে কর বাড়ছে দেশের অভ্যন্তরে আকাশপথে ভ্রমণ করের আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিদেশগামী বিমানযাত্রীদের কর ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। ডলার সাশ্রয়ের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ হ্রাস করা, কৃচ্ছতার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং নতুন রাজস্ব আয়ের খাত তৈরি করতে এ প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আকাশপথে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে যাত্রীদের ২০০ টাকা ভ্রমণ কর দিতে হবে। এছাড়া, বিমানে এক জেলা থেকে অন্য জেলা ভ্রমণেও দিতে হবে কর।

এখন অর্থনীতির বাস্তবতায় আমরা যদি বাজেটকে বিশ্লেষন করি তা হলে দেখা যায় বর্তমানে অর্থনীতির দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমন - প্রথমটা মূল্যস্ফীতি ও দ্বিতীয়টা সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা। মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৯.২০%, কোনো কোনো সময় ১০% এর কাছাকাছি বিরাজ করে। এটা বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে যদিও মূল্যস্ফীতির বিষয়টা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করার জন্য কী কৌশল নেওয়া হবে, তার কোন উল্লেখ নেই। সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় বিশেষ করে রাজস্ব আদায়, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা, অর্থনীতির অন্যান্য জায়গায় যে সংকট আছে, সেগুলো সামলে নেওয়ার জন্য কী করা উচিত, সে ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনা নেই, জোর করে সুদহার দীর্ঘ সময় ধরে বেঁধে রাখা হয়েছে যা কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়নি। রাজস্ব ক্ষেত্রে কর ও অন্যান্য ফি যেগুলো আছে, সেগুলো সমন্বয় করে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে আনার চেষ্টা করা যেত। সে ধরনের উদ্যোগও দেখা যায়নি। উদাহরণ হিসেবে জ্বালানির কথা বলা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যখন অনেক বেড়ে গেল, তখন দেশের বাজারেও দাম বাড়ানো হলো। সে সময় আমরা বলেছিলাম, কর সমন্বয় করে দামটা সহনীয় রাখতে। সেটা করা হয়নি। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রতিটা খাতকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনায় অসংগতি  আছে, প্রতিযোগিতার ঘাটতি আছে, যার সুযোগ নিচ্ছে সিন্ডিকেট যার প্রভাবে সাধারন মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ কিছু সময় ধরে জিনিসপত্রের দাম কমছে অথচ দেশের বাজারে সেটার কোনো প্রতিফলন নেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ও মাঠপর্যায়ে উদ্যোগগুলো কী হওয়া উচিত, সেটার কোনো প্রতিফলন এবারের বাজেটে নেই। বাজেট দেখে মনে হয়েছে মূল্যস্ফীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কমে আসবে, বাস্তবে সেটা সম্ভব নয়। সরকার ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেটা অর্জনের জন্য বিনিয়োগ লাগবে জিডিপির অনুপাতে ৩৩%। সরকারি বিনিয়োগ যদি ৬% মতো হয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ কত দরকার হবে, সেটা ধরেই বেসরকারি খাতে ২৭% বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এটা অনেকটা অঙ্কের হিসাবের মতো, হিসাবের মারপ্যাঁচে বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। 

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আমরা জিডিপির তুলনায় অনেক কম খরচ করি। এখন যেটা খরচ করি শিক্ষা খাতে কমপক্ষে তার দ্বিগুণ আর স্বাস্থ্য খাতে তিন গুণ খরচ করা উচিত। শিক্ষা খাতে এখন অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ হলো কোভিড মহামারিকালের শিখনক্ষতি। এ সময়ে শিখনক্ষতির পরিমাণ বেশ ভয়াবহ। বাজেটের কোথাও এই শিখনক্ষতি পূরণ করার জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া দরকার, সেই বিষয়টির উল্লেখ নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য হলো সমাজ উন্নয়নের একটি বড় ক্ষেত্র যার প্রভাব সমাজের সর্বশ্রেণীর মানুষের উপর পড়ে। পর্যালেচনায় দেখা যায় শিক্ষা বাজেট মোট বাজেট ১৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো হলেও আগের বছরের চেয়ে মাত্র ৮.২৪ শতাংশ বেড়েছে। শিক্ষা বাজেট ৮৮ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট বাজেটের ১১.৫৭ শতাংশ (চলতি বছরে ১২ শতাংশের বেশি ছিল)। জিডিপির শতাংশ হিসেবেও শিক্ষা বাজেট ছোট হয়ে এসেছে। চলতি বছরে ১.৮৩ শতাংশ থেকে কমে আসন্ন বছরে ১.৭৬ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, জিডিপির শতাংশ হিসাবে শিক্ষায় বরাদ্দের বিচারে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের তুলনায় পিছিয়ে আছি (দক্ষিণ এশিয়ার গড় ২.৮৫ শতাংশ, আমাদের গড় ১.৯৭ শতাংশ)। প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেট ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। এক দশক ধরেই এই অনুপাত অপরিবর্তিত আছে। বরাদ্দের গতানুগতিকতার কারণে আউট অব পকেট স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। মনে রাখতে হবে আমাদের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মাত্র ২৩ শতাংশ আসে সরকারের বরাদ্দ থেকে আর ৬৮ শতাংশই বহন করতে হয় ব্যক্তিমালিকানায়। তাই বাজেটে স্বাস্থ্যের অংশ বাড়ানো গেলে নাগরিকদের ওপর চাপ কিছুটা কমত। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়নের অদক্ষতার কারণেই হয়তো স্বাস্থ্যের অংশটি বাড়ানো যাচ্ছে না। সর্বশেষ ২০২১-২২-এর মোট বরাদ্দের ২৪ শতাংশই বাস্তবায়ন করা যায়নি এবং স্বাস্থ্য গবেষনা খাতে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্ধের একটি টাকাও খরচ হয়নি গবেষকের অনাগ্রহের কারনে যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ রয়েছে। বাংলাদেশ যদিও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অনেক উন্নতি করেছে, কিন্তু বড় রোগের চিকিৎসায় কোটি কোটি রোগীকে টেকসই সেবা দিতে পারছে না। তাহলে গরিব মানুষের ব্যয়বহুল চিকিৎসার দায়িত্ব কে নেবে? অবশ্যই সরকারকে নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষণা অনুযায়ী, সবার জন্য বড় রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোটি কোটি অসুস্থ নাগরিক নিয়ে উন্নত দেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই রোগের সব উৎস যে কোনো উপায়ে বন্ধ করতে হবে।

কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ আগামী অর্থবছরে টাকার অঙ্কে বাড়লেও খাতওয়ারি বরাদ্দের নিরিখে এবার এই খাতে বরাদ্দ শতকরা দশমিক ৩৩ ভাগ কমেছে। আগামী অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের শতকরা ৪.৬৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল ৩৩ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৪.৯৭ শতাংশ। কৃষির ওপর মোটামুটি নজর প্রতিটি বাজেটে থাকে। করোনাকালে বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ ছিল। এবারের বাজেটেও সহায়তা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার আছে। এটাকে ইতিবাচক বলতে হবে। কিন্তু কৃষি খাতে যে ব্যাপক উন্নয়ন ও যান্ত্রিকীকরণ দরকার, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেখছি না। কৃষি খাতের আধুনিকায়নের জন্য যে গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে যে সহায়তা আশা করা হয়েছিল, সেটি এই বাজেটে নেই।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে ২৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৩৩ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। জ্বালানি বিভাগের বরাদ্দ আগামী অর্থবছরের জন্য ৪৯ শতাংশ কমিয়ে ৯১১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ বিভাগের বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের ১৯ লাখ বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো সুখবর নেই। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল, গতিহীন পুঁজিবাজারে গতি ফেরার জন্য বাজেটে কর্পোরেট কর কমানোর পাশাপাশি দ্বৈত কর প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু কিছুই করা হয়নি। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় পুঁজিবাজার সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ করেননি। তিনি বিভিন্ন ধরনের যে কর কাঠামোর প্রস্তাব করেছেন, তাতেও পুঁজিবাজারের জন্য কোনো ছাড় নেই। তবে পুঁজিবাজারে বাড়তি কিছু চাপিয়েও দেওয়া হয়নি এবারের বাজেটে। এতে কিছুটা স্বস্তি পাবেন বিনিয়োগকারীরা। সরকার জিডিপির অনুপাতে ৫.২ শতাংশ বাজেট ঘাটতির কথা বলছে। এই ক্ষেত্রে অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে বেশ বড় পরিমাণ ঋণ নেওয়ার কথা বলছে। প্রশ্ন হলো, ব্যাংকিং খাত সরকারকে এত টাকা কীভাবে দেবে আর বেসরকারি খাতকে এতটা অর্থায়ন কীভাবে করবে? বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে অর্থ জোগানের বড় উৎসই হলো ব্যাংকিং খাত। কারণ, আমাদের পুঁজিবাজারের তেমনভাবে বিকাশ হয়নি। আমাদের ব্যাংকিং খাত এত বড় অর্থায়নের জন্য প্রস্তুত নয়। সে ক্ষেত্রে ২৭ শতাংশ বিনিয়োগ একেবারেই বাস্তবতাবিবর্জিত একটা পদক্ষেপ। সরকার যদি ব্যাংকিং খাত থেকে এত পরিমাণ টাকা নাও নেয়, তাহলে ঘাটতি মেটানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে যেতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে সরকারকে সেই অর্থায়ন করতে হবে টাকা ছাপিয়ে। সেটা কিন্তু মূল্যস্ফীতির ওপর আবার বাড়তি একটা চাপ সৃষ্টি করবে। বিনিয়োগের এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঠিক করার চেয়ে, অর্থনীতি যে পুরো একটা দুষ্টচক্রের মতো জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে, সেই দিকটা সমাধানের চেষ্টা দরকার ছিল এবারের বাজেটে।

আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট ৬৬ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পক্ষ থেকে ভর্তুকি হ্রাসের চাপ থাকলেও এ বরাদ্দ ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে টাকার বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধির কথা বলছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উত্থাপনের সময় সহায়ক প্রকাশনা হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগ থেকে ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি’ প্রকাশ করা হয়। বিপিডিবি সূত্র ব্যবহার করে সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আগামী অর্থবছরে ডলারের বিনিময় হার ১ টাকা বাড়লে শুধু বিদ্যুতেই ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে ৭৪৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। টাকার অবমূল্যায়নে ভর্তুকির ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরকারের প্রকল্প ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়বে। অনেক সরকারি বৃহৎ প্রকল্প আমদানি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে সরকারের আর্থিক বোঝা আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। সরকারের রাজস্ব আহরণেও এর নেতিবাচক প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, ডলারের বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতিতে বেসরকারি খাতও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের আশঙ্কা, ডলারসহ প্রধান বৈদেশিক মুদ্রাগুলোর বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন সরকারের ঋণের বোঝাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। একই সঙ্গে তা সরকারের আয় ও ব্যয়—দুটোর ওপরই ফেলতে যাচ্ছে মারাত্মক ও নেতিবাচক প্রভাব। বাংলা টাকার বিপরীতে ইউরোর বিনিময় হার বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ, জাপানি ইয়েনের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে সাড়ে ১২ শতাংশের কাছাকাছি যদিও সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি। 

দারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যাপক প্রসার বাজেটে দেখা যায় না। এবার যেটা বাড়ানো হয়েছে, সেটা অপর্যাপ্ত। নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, দরিদ্র ও অতিদরিদ্রের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমে গেছে। কিন্তু গবেষণায় বলছে, বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এমনকি নতুন করেও অনেকে দরিদ্র হচ্ছে। এ ব্যাপারে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটবে। দারিদ্র্যহার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সরকারি হিসাবেই দেখা যায় ১৭ কোটি মানুষের তিন-চার কোটি লোক দরিদ্র। দুই কোটি লোক অতিদরিদ্র, যা নেপাল ও শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যার সমান। এই দারিদ্র্য অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে যে মহা কর্মযজ্ঞ প্রয়োজন, সেটা বাজেটে অনুপস্থিত বলে মনে হয়।

সে যাই হউক না কেন দেশে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, গত দেড় দশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক ও অবকাঠামোসহ সব ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছে এবং তার মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি টেকসই ভিত্তি স্থাপিত হছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাপ্রসূত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনের উদ্যোগগুলো প্রশংসার দাবি রাখে সত্যি কিন্তু এর বাস্তবায়ন শতভাগ না করা গেলে কাঙ্খিত অর্জন সম্ভব নয় । তার জন্য সরকারের ধারাবাহিকতার প্রয়োজন রয়েছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন যা নিয়ে ঘরে-বাহিরে আলোচনা, সড়গরম মাঠ-ময়দান, রাজনীতি বর্তমানে দেশ অঙ্গন ছাড়িয়ে আন্তর্জ্যাতিক পরিমন্ডলে বিচরন করছে, যা নিয়ে সমাজের মানুষের ভাবনার শেষ নেই। বাজারে মূল্যবৃদ্ধি রয়েছে, সমাজের মানুষের কষ্ট আছে, তবুও সরকারের মানবিক সুবিধাগুলো পেয়ে যা  কিছুটা হলেও স্বস্থিতে রয়েছে। বাজেট আসবে বাজেট যাবে, সরকার ও আসা যাওয়ার মধ্যে থেকে গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এর মধ্যেই দেশের মুক্তিযোদ্ধের পক্ষের শক্তি যারা বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে তাদের বিগত ১৪ বছরের পথ পরিক্রমায় দেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কাজেই আগামীতে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং  অসাম্প্রদায়িক বাংলদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে আগামীতেও সরকার পরিচালনায় সহায়তা করি এই প্রত্যাশা রইল ।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ও সাবেক জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি। 

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//