
ড: মিহির কুমার রায়: গত ১৩ জুন চারদিনের সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪ ও ১৫ জুন অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক সামিট: সোশ্যাল জাস্টিস ফর অল’-এ যোগদানের জন্য সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভা পৌছেন। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক সামিট ২০২৩: সকলের জন্য সামাজিক ন্যায়’ হলো সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমর্থন করার জন্য বিস্তৃত, সমন্বিত ও সুসঙ্গত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা মোকাবেলায় সোচ্চারদের একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈশ্বিক ফোরাম। দুইদিনের শীর্ষ সম্মেলনে আরো টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব গড়তে সামাজিক ন্যায়বিচারের মূল ভূমিকা তুলে ধরে এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে এগিয়ে নিতে ও নীতির সুসঙ্গততা নিশ্চিত করার জন্য বর্ধিত এবং আরো ভালো ভাবে সমন্বিত যৌথ পদক্ষেপের কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়। এখানে উল্লেখ্য এই ফোরাম সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি বৈশ্বিক জোট গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও অবহিত করার একটি সুযোগ দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম অফিসের ৩৪৭তম অধিবেশনে গভর্নিং বডি স্বাগত জানিয়েছে। সম্মেলনে বেশ কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের অতিথিদের পাশাপাশি মালিক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুদিন খুবি ব্যাস্ত সময় কাটান এবং বিভিন্ন ফোরামে বক্তব্য দেন যা ছিল খুবি প্রাণবন্ত ও বস্তুনিষ্ঠায় ভরপুর। প্রধানমন্ত্রী সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় প্যালেস ডি নেশন্সে ‘ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক সামিট, ২০২৩’-এর পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ভাষণ দেন। তিনি বিশ্বব্যাপী শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার প্রয়াসে সামাজিক ন্যায়বিচারে বিনিয়োগ করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, একমাত্র সামাজিক ন্যায়বিচারই স্থায়ী শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি রচনা করতে পারে। বিশ্বব্যাপী শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের প্রয়াসে সামাজিক ন্যায়বিচারকে সকলকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’ এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছেন তিনি যেমন ১. এই জোটটিকে একটি মাননির্ধারক বা দরকষাকষির ফোরামের পরিবর্তে একটি পরামর্শমূলক বা অ্যাডভোকেসি প্লাটফর্ম হিসাবে গড়ে তোলাই বাঞ্ছনীয় হবে; ২. বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামাজিক ন্যায়বিচারকে এক আন্তর্জাতিক মহল কর্তৃক অন্য মহলের বিরূদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে এই জোটকে সতর্ক থাকতে হবে; ৩, এই জোটকে একটি নিয়মতান্ত্রিক বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায় সামাজিক ন্যায়বিচারকে একটি সংরক্ষণবাদী হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার না করে, বরং এর ব্যাপক প্রসারে ভুমিকা রাখার বিষয়ে প্রচারণা চালাতে হবে; ৪. শোভনকর্ম ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করার জন্য এই জোটের বিষয়ে আইএলওর নিজস্ব অংশীজনদের থেকে ব্যাপক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে; ৫. পরিশেষে, দেশের তরুণ সমাজকে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রবক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই জোটকে মনোযোগী হতে হবে।
পরে প্রধানমন্ত্রী প্যালাইস ডি নেশনসে সুইস কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট অ্যালেইন বারসেটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর সেখানে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বিকালে প্রধানমন্ত্রী প্যালাইস ডি নেশনসে ‘ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক সামিট ২০২৩’ এর প্লেনারিতে ভাষণ দেন। শেখ হাসিনা মাল্টার প্রেসিডেন্ট ডক্টর জর্জ ভেলার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন, এরপর আইএলও মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হাউংবোর সঙ্গে বৈঠক করেন। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী আইএলও এর সদর দপ্তরে ডিজি আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নৈশভোজে যোগ দেন। ১৫ই জুন তিনি ডব্লিউইএফ কার্যালয়ে এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ক্লাউস শোয়াবের সঙ্গে একটি বৈঠকের পর ‘এ টক এট দ্য ডব্লিউইএফ’-এ যোগদান করেন। সেখানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ‘নিউ ইকোনমি অ্যান্ড সোসাইটি ইন স্মার্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সন্ধ্যায় ডব্লিউটিওর মহাপরিচালক ড. ওকোনজো-আইওয়ালা তার বাসস্থানে সাক্ষাৎ করেন। একই সন্ধ্যায় একটি সামাজিক সংবর্ধনায়ও যোগ দেন।
প্রধানমন্ত্রী তার দুই দিনের ব্যস্ততম সময়ে বিভিন্ন ভাষনে বলেন, ‘বর্তমান শতাব্দীর বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্বের জন্য একটি নতুন সামাজিক চুক্তি তৈরি করতে হবে। এই সামাজিক চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হবে- টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সবার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।’ উল্লেখ্য যে, শ্রম অধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশ আইএলওর ১০টি মৌলিক সনদের মধ্যে আটটিতে অনুস্বাক্ষর করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পেশাগত স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা বিষয়ক দুটি নতুন মৌলিক আইএলও সনদ অনুস্বাক্ষরের বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা উচিত। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, শ্রম অধিকার নিয়ে সোচ্চার কয়েকটি উন্নত দেশ এখন পর্যন্ত নিজেরা অধিকাংশ মৌলিক আইএলও সনদ অনুস্বাক্ষর করেনি। যেমন, একটি বড়ো শিল্পোন্নত দেশ মাত্র দুটি মৌলিক সনদ অনুস্বাক্ষর করেছে।’ শিশু শ্রমের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণে বাংলাদেশ সম্প্রতি আইএলও সনদ ১৩৮ অনুস্বাক্ষর করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার আটটি ঝুঁকিপূর্ণ খাতকে শিশু শ্রমমুক্ত ঘোষণা করেছে। এছাড়া, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত এক লাখ শিশুকে উপানুষ্ঠানিক ও কারিগরি শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম চলছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি একটি সুস্থ ও নিরাপদ আগামী প্রজন্মের স্বার্থে দেশের শিশু শ্রমের অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই।’ তিনি আরও বলেন, তারা আইএলও’র সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৩ ও ২০১৮ সালে দুইবার বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ সংশোধন করেছেন। অধিকন্তু, বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এ সংশোধন করা হয়েছে। এ বছর নাগাদ শ্রম আইন, ২০০৬-এ আরো সংশোধনী আনার কাজ চলছে। ইতোমধ্যেই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ প্রয়োগের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল ও সাতটি শ্রম আদালতের সঙ্গে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আরো ছয়টি শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়া, সামাজিক অংশীদারদের অংশগ্রহণে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি, দেশের কারখানাগুলোর জন্য একটি ‘শিল্প পুলিশ’ ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব তৈরি পোশাক কারখানার নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশের মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোতে সে অনুযায়ী প্রতিকার করা হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার অর্ধেকেরও বেশি এখন বাংলাদেশে অবস্থিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অর্জনকে এগিয়ে নিতে আমরা একটি ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড পলিসি’ প্রণয়ন করেছি এবং আমি আশা করি আমাদের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের ন্যায্য মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব এই ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করবেন। বর্তমান সরকার পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি জাতীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করছে এবং ৩২টি শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা শ্রমিকদের নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, সরকার কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে শ্রম পরিদর্শকের সংখ্যা ৭১১ জনে উন্নীত করেছে। আইএলও’র প্রযুক্তিগত সহায়তায় একটি ওয়েব-ভিত্তিক ‘শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থাপনা অ্যাপ্লিকেশন’ (লিমা) চালু করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শ্রমিক, নিয়োগকর্তা এবং সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক পরিষদ (টিসিসি) দেশের সামগ্রিক শ্রম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও অগ্রগতি অব্যাহত রেখেছে। পোশাক শিল্পের জন্য আলাদা টিসিসি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের সরকারই গার্মেন্টস শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ১৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ হাজার টাকা করেছে। সরকার বিভিন্ন শিল্প খাতে সম্মিলিত দর কষাকষির মাধ্যমে নূন্যতম মজুরি নির্ধারণের জন্য একটি নীতি কাঠামো প্রণয়নের পরিকল্পনা করেছে।
শ্রমিকদের জন্য অনলাইন ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনসহ তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনের হার ২০১৩ সালে ৬০ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। গার্মেন্টস সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা গত নয় বছরে বেড়েছে নয়গুণ। এছাড়াও, শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়ার বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এবং নন-ইপিজেড এলাকার জন্য দুটি পৃথক টোল-ফ্রি হেল্প-লাইন চালু করা হয়েছে। পোশাক কারখানার শ্রমিকদের পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে তাদের বিবরণ সহ ডাটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। শ্রম আইনে নারী শ্রমিকদের জন্য চার মাসের বেতনসহ ছুটি ও মাতৃত্বকালীন সুবিধার বিধান রাখা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চলে সাশ্রয়ী মূল্যে ১ হাজার ৫৩০ জন কর্মজীবী নারীর জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে ৬ হাজার ৪৩০টি দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। শিল্প ও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বা হয়রানির বিরুদ্ধে ‘জিরো-টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ‘বাংলাদেশ লেবার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’-এর তত্ত্বাবধানে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন খাতে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। এছাড়াও, রপ্তানিমুখী শিল্পে শ্রমিকদের পরিবারসহ তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহায়তার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ‘কেন্দ্রীয় তহবিল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০২২ সালে, গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিকদের জন্য একটি ‘কর্মসংস্থান ইনজুরি ইন্স্যুরেন্স স্কিম’ পাইলট ভিত্তিতে চালু করা হয়েছে। সরকার রূপকল্প-২০৪১-এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার করেছে। সে লক্ষ্যে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৯.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ৮০ হাজার যুবক-যুবতীকে উন্নত প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। দেশের ৬ লক্ষ ৫০ হাজার আইটি ফ্রিল্যান্সারকে মূলধারার অর্থনীতির ধারায় আনতে নিবন্ধিত করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বর্তমান ১৭ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে সমুদ্র গবেষণা, অ্যারোনটিক্স, বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি ও সীমান্ত প্রযুক্তির বিষয়ে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হচ্ছে। সরকার সামগ্রিক অভিবাসন খরচ কমাতে ও অভিবাসী কর্মীদের সহজে ঋণ প্রদানের জন্য ‘প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে।
মানবিক গতিশীলতা ও সামগ্রিক কর্মপরিবেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বব্যাপী শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের প্রয়াসে সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। স্থায়ী শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচারকে একমাত্র ভিত্তি আখ্যায়িত করে এই শান্তি-উন্নয়ন-ন্যায়বিচারের জন্য বিশ্ব নেতাদের কাছে পাঁচটি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে যা আগেই উল্লেখিত হয়েছে। এই শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক জোট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসহ সব আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রে সামাজিক ন্যায়বিচারকে স্থান দেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের সরকার জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক অংশীজনদের সঙ্গে আরো আলোচনার মাধ্যমে এ বৈশ্বিক জোটে যোগ দেয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে আমরা দুঃখী-মেহনতি মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের মূল লক্ষ্য কৃষি ও অকৃষি খাতে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনীতির সবস্তরে শ্রমিক অধিকার সুরক্ষা ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। আমার সরকার ইতোমধ্যে কৃষি-শ্রম ও ব্যবসাবান্ধব হিসেবে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সফলতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সক্ষমতা অর্জন করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সমাজ নির্মাণের পথে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে সরকার। কোভিড-১৯ অতিমারির সময় আমরা রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন পরিশোধে ৫৮৮ মিলিয়ন ডলার, দরিদ্র পরিবারসমূহে বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের জন্য প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার এবং ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রায় ১৫৬ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করি। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় আমরা এক কোটি নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে স্বল্পমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করছি। সদ্য ঘোষিত বাজেটের ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া ও আইটি খাতের বিপুল সম্ভাবনা তুলে ধরে বলেন, বাজেটে ৯ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ও ইনোভেশন সেন্টারের মাধ্যমে ৮০ হাজার তরুণ-তরুণীকে অগ্রসর প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। দেশের সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সারকে নিবন্ধনের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
উপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে এই সামিট থেকে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে তার সার্বিক দর্শন, কর্মসূচী ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরতে পেরেছে যা একটি বড় প্রাপ্তি বলে সুশীল সমাজ মনে করেন। বাংলাদেশ সরকার সমাজের সর্বস্তরে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধ পরিকর যা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ আছে। বাংলাদেশকে বলা হয় মানবতার মা যা আন্তর্জ্যাতিক ভাবে স্বিকৃত। তাই এই সীমিত প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তির ভাগটাই দেশকে দিয়েছে। আশা করা যায় বর্তমান সরকার আগামীতেও একি ভাবে দেশের মানুষের মানবিক দিকগুলোকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে ন্যায় বিচার দিয়ে যাবে এই প্রত্যাশা রইল।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি, ঢাকা ও সাবেক জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//