Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Sunday, 14 Jun 2026 18:07
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

নরসিংদী প্রতিনিধি, বিনিয়োগবার্তা : সালফি ও নাজা আজো খুঁজে তাদের বাবাকে । নরসিংদীর প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেন তাদের বাবা। ছোট শিশু নাজার মায়ের, দাদু ও চাচাদের কাছে একই কথা -তার বাবা কবে, কখন ফিরে আসবে। চোট্ট এই শিশুর এই প্রশ্নের জবাব কে দিবে? কিভাবেই বা বলবে তার তাদের আদরে বাবা সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে অন্য দুনিয়ায়। অপরদিকে সালফির সময় কাটে বাবার ছবি দেখে।

১ নভেম্বর বুধবার নরসিংদীর জনপ্রিয় পৌর মেয়র লোকমান হোসেনের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর সন্ত্রাসীরা শহরের জেলা আওয়ামীলীগের অস্থায়ী কার্যালয়ে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে তাকে।

লোকমান হত্যাকান্ডের ৬ষ্ঠ বর্ষে জনবন্ধু লোকমান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫ দিন ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি।

জানা যায়, ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে দ্বিতীয় বারের মতো পৌর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ৮ মাসের মাথায় খুন হন লোকমান হোসেন। নির্মম হত্যার এই ঘটনা আজো মেনে নিতে পারেনি নরসিংদীবাসী।

এদিকে লোকমান হোসেনের ছোট দুই শিশু সন্তান সালফি এবং নাজার আজও অপেক্ষায় আছে তাদের বাবা ফিরে আসবে। লোকমানের পত্নী তামান্না নুসরাত বুবলীর চোখের পানিও এখন শুকিয়ে গেছে। স্বামীর চলে যাওয়ায় তার স্মৃতি বুকে নিয়ে বিচারের অপেক্ষায় দিন গুণছেন।

উল্লেখ্য, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ্ নেওয়াজ ভূঁইয়ার ছেলে লোকমান হোসেন কলেজ জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৪ সালে নরসিংদী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন  পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিশাল ভোটের ব্যবধানে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। জনপ্রিয়তার কারণে ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন লোকমান হোসেন। আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল মতিন সরকারকে ১৯ হাজার ৯০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন তিনি।

মেয়র লোকমান নরসিংদী পৌরসভায় ১০০ কোটি টাকারও বেশি উন্নয়ন কাজ করে শহরকে সুন্দর ও আধুনিক রূপ দেন। আবার ট্যাক্স আদায়ে সরকারের পৌরসভা পারফরমেন্স রিভিউ কমিটির বিবেচনায় ২০০৬ সালে নরসিংদী পৌরসভা শ্রেষ্ঠ স্থান দখল করে। ফলে ২০০৮ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-এডিবি’র বিবেচনায় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ মেয়রের পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ঢাকা বিভাগীয় মেয়র সমিতির সভাপতিও ছিলেন।

দ্বিতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ৮ মাস পর ২০১১ সালের ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় সংঘটিত লোকমান হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে অস্থির হয়ে উঠে গোটা নরসিংদী জেলা, আলোচনার ঝড় উঠে দেশজুড়ে। হত্যাকান্ডের দুই দিন পর লোকমান হোসেনের ছোট ভাই বর্তমান পৌর মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল বাদী হয়ে তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর ছোট ভাই সালাউদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে প্রধান আসামী করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের দুই মাসের মধ্যে একমাত্র বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত মামলার অন্যতম আসামী মোবারক হোসেন মোবা ছাড়া একে একে সকল আসামীরা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনে বের হয়ে যায়।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটি দীর্ঘ ৮ মাস তদন্ত শেষে এজাহারভুক্ত ১৪ জন আসামীর মধ্যে প্রধান আসামীসহ ১১ আসামীকে বাদ দিয়ে এজাহার বহির্ভূত ১২ জনকে অভিযুক্ত করে নরসিংদী চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তৎকালীন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি মামুনুর রশিদ মন্ডল। কিন্তু এজাহারভুক্ত আসামীদের বাদ দেওয়ায় এ অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট হতে পারেননি লোকমানের পরিবার। বাদী পক্ষ থেকে অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে নারাজি আবেদন জানানো হলে বিজ্ঞ আদালত উক্ত নারাজি আবেদন খারিজ করে দেন। পরে বাদী জেলা জজ আদালতে রিভিউ পিটিশন দাখিল করলে তাও খারিজ হয়ে যায়।

আবেদন খাজির হওয়ার পর উচ্চ আদালতের স্মরণাপন্ন হয় মামলার বাদী নিহত লোকমানের ছোট ভাই বর্তমান পৌর মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল। তবে পুলিশী তদন্তে এ হত্যা মামলার এজাহার বহির্ভূত আসামী কিলার শরিফ বলে খ্যাত শরিফুল ইসলাম শরিফসহ তার অপর ৩ সহযোগীকে অস্ত্র মামলায় আদালত ১০ বছরের কারাদন্ড প্রদান করে।

লোকমান হত্যা মামলার বাদী ও নিহত মেয়র লোকমান হোসেনের ছোট ভাই বর্তমান পৌর মেয়র কামরুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমানে উচ্চ আদালতের নির্দেশে জুডিশিয়াল তদন্তে রয়েছে মামলাটি। যতক্ষণ পর্যন্ত লোকমান হত্যার যথাযথ বিচার না হবে ততক্ষণ আইনী লড়াই চালিয়ে যাবো। এজন্য নরসিংদীবাসী আমার পাশে আছে।’

নিহত লোকমানের স্ত্রী তামান্না নুসরাত বুবলী বলেন, মেয়র লোকমান হত্যার বিচার না হলে মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে। আমার মত প্রত্যেক নরসিংদীবাসীই চায় লোকমান হত্যার সঠিক বিচার। স্বামী হারানোর পর তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন বলেও তিনি জানান। এ জন্য আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ তার পাশে রয়েছে বলে দাবী করেন তিনি।

লোকমান হত্যাকান্ডের ৬ষ্ঠ বর্ষে জনবন্ধু লোকমান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫ দিন ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে, ১ নভেম্বর সকাল ৭ থেকে ৯ টা পর্যন্ত পৌর কববস্থানে লোকমানের সমাধিতে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল সাড়ে ৯টায় মিলাদ, দোয়া ও গণভোজ। বেলা সাড়ে ১১টায় লোকমানে হোসেনের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন।এ ছাড়া বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে মিলাদ মাহফিল দোয়া ও গণভোজ এবং মসজিদ-মন্দিরে বিশেষ প্রার্থণা, ২ নভেম্বর জনবন্ধু লোকমান সংগ্রাম পরিষদের আয়োজেন সকাল ১০টায় নরসিংদী জেলাখানা মোড় হতে শিক্ষাচত্বর পর্যন্ত খুনিদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন। ৩ নভেম্বর নরসিংদী জেলা ও শহর পূজা উদ্যাপন পরিষদের আয়োজনে সকাল ৯টায় পৌর মিলনায়তনে বিনামুল্যে চক্ষু চিকিৎসা শিবির। ৪ নভেম্বর লোকমান সংগ্রাম পরিষদের আয়োজেন মাধবদী হাই স্কুল মাঠে মিলাদ মাহফিল ও বিকালে জনবন্ধু লোকমান হোসেন ফাউন্ডেশনের আয়োজেন পৌর মিলনায়তনে তরুন কবি শাহ আলম এর কাব্যগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠান ‘তোমার মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দিয়েছে’ এবং ৫ নভেম্বর নরসিংদী জেলা ও শহর আওয়ামীলীগের আয়োজেন জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে স্মরণসভা হবে।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উচ্চ আদালত হতে এই চাঞ্চল্যকর মামলাটির পূন:তদন্ত করার নির্দেশ দেয়ায় জনবন্ধু লোকমান হোসেন ফাউন্ডেশন সহ নরসিংদীবাসীর মনে লোকমান হত্যার বিচার কাজ দ্রুত নিস্পত্তি হবে বলে আশার সঞ্চার হয়েছে।

(এসএইচআর/এসএএম/ ৩১ অক্টোবর ২০১৭)