
প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা, ঢাকা: সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাসায় ফিরে হঠাত্ হূদরোগে আক্রান্ত হন রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। তাৎক্ষণিক তাকে নিয়ে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের দিকে রওনা হন স্বজনরা। কিন্তু রাস্তায় যানজটের কারণে হাসপাতালে পৌঁছতে সময় লেগে যায় প্রায় ২ ঘণ্টা। হাসপাতালে পৌঁছার পর চিকিত্সকরা পরীক্ষা করে জানান, রোগী পথেই মারা গেছেন (ব্রট ইন ডেড)।
শুধু জাহাঙ্গীর হোসেন নন, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতি মাসে শতাধিক রোগী নিয়ে আসা হয়, যাদের মৃত্যু হয় পথেই। চিকিৎসকরা বলছেন, হূদরোগে আক্রান্তের প্রথম ১ ঘণ্টার মধ্যে ৫০ শতাংশ রোগী মারা যায়। ১ ঘণ্টার মধ্যে যদি রোগীকে যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেয়া যায়, তাহলে ‘ব্রট ইন ডেড’ ৮০ শতাংশ কমানো যায়। এই ১ ঘণ্টাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। গোল্ডেন আওয়ারকে কাজে লাগাতে যানজটের এ শহরে শুধু করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ)-সমৃদ্ধ অ্যাম্বুলেন্স জরুরি। কারণ এ ধরনের অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালের মতোই সিসিইউ সুবিধা থাকে। এছাড়া ভেন্টিলেটর, ইসিজির ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্স-টেকনিশিয়ানও থাকে অ্যাম্বুলেন্সে।
হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এপিএম সোহরাবুজ্জামান বলেন, হঠাত্ বুকে ব্যথা অনুভূত হওয়ার ১ ঘণ্টার মধ্যে যদি প্রাইমারি এনজিওপ্লাস্টি করা যায়, তাহলে রোগীর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ৯৫ শতাংশ। এজন্য রোগীদের হাসপাতালে আনার ক্ষেত্রে সিসিইউ-সমৃদ্ধ অ্যাম্বুলেন্সের বিকল্প নেই।
বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা দেশে সিসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা ১৫টির বেশি নয়। রাজধানীর ল্যাবএইড, ইউনাইটেড, অ্যাপোলো, ইব্রাহিম কার্ডিয়াকসহ বেশকিছু বেসরকারি হাসপাতালে দুটি বা একটি করে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে কয়েকটি সিসিইউ অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। তবে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটসহ সরকারি হাসপাতালগুলোয় এ ধরনের বিশেষ অ্যাম্বুলেন্স নেই।
এ বিষয়ে ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম বলেন, পরিবহনের জন্য রোগীর মৃত্যু দুঃখজনক। ইমার্জেন্সি রোগীদের জন্য আমাদের দেশে কোনো চিকিৎসা নেই। সরকার একা এ কাজ করতেও পারবে না। এজন্য প্রয়োজন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)। পিপিপির আওতায় যদি ৫০০ সিসিইউ-সমৃদ্ধ অ্যাম্বুলেন্স চালু করা যায়, তাহলে হূদরোগে মৃত্যুহার কমবে।
তিনি আরো বলেন, সরকারের ভর্তুকি দিয়ে হলেও একটা অ্যাম্বুলেন্স যেন বছরে অন্তত ৩০ জন রোগীকে সাপোর্ট দেয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। যদি ১০০ অ্যাম্বুলেন্স ৩০ জন করে রোগীকে সেবা দেয়, তাহলে বছরে তিন থেকে পাঁচ হাজার রোগীকে বাঁচানো যাবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের গ্রামগঞ্জে অ্যাম্বুলেন্স চলে গেছে। সেখানকার নার্স, টেকনিশিয়ানরা এখন বাসায় গিয়ে হূদরোগের চিকিৎসা করছেন। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
যানজট রাজধানী ঢাকার একটি বড় সমস্যা। চলতি বছর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ১০ বছরে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি প্রতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে সাত কিলোমিটারের নিচে নেমে এসেছে, যা হেঁটে চলার গতির তুলনায় সামান্য বেশি। এ কারণে ঢাকায় দিনে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যানজটে যে শুধু কর্মঘণ্টাই নষ্ট হচ্ছে তা না। এ কারণে স্নায়ু ও মস্তিষ্কের সমস্যা, কানের রোগ, মেরুদণ্ডের সমস্যা, মানসিক চাপ, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানাবিধ রোগে ভুগছে নগরবাসী। এছাড়া যানজটের কারণে মুমূর্ষু রোগীরা নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে পৌঁছতে না পারায় পথে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত চলতি বছরের লোকাল হেলথ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মোট অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে ৬৮৫টি। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত পর্যায়ে ৭২টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে ১৮টি অকেজো রয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলা হাসপাতালের মোট ১৯২টি অ্যাম্বুলেন্সের ৯৬টিই অকেজো পড়ে আছে। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি করে অ্যাম্বুলেন্স থাকার নিয়ম থাকলেও সেখানেও অধিকাংশ বিকল পড়ে আছে।
(এএইচএন/ ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭)