
মনজুরুল আলম: সকাল বেলা। পকেটে হাত দিয়েই মেজাজটা খারাপ হলো। কারণ, পকেটে আছে মাত্র ১০ টাকা। রিক্সায় চড়ার কথা ভাবতেও পারছি না। অথচ মমির সাথে দেখা করার কথা ঠিক ১১টায়। আমার মেস থেকে ইউনিভার্সিটির দুরত্ব না হলেও ৩ কিলোমিটার।
এই পথ হাটা কোনই ব্যাপার ছিল না। কিন্তু সময়ের অভাবে সে চিন্তা বাদ দিতে হলো। ঠিক করলাম আগে একটা সিগারেট কিনি। তারপর চিন্তা করব কি করা যায়।
সিগারেটে সুখ টান দিতেই বুদ্ধি পাখা মেলে দিল। তাৎক্ষনিক উঠে পড়লাম একটা রিক্সায়। রিক্সাওয়ালাকে বললাম, মামা ইউনিভার্সিটি চলো। রিক্সাওয়ালা কথা শুনে কিছুটা তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে তাকালো।
তারপর বলল, ২০ টাকা হলে যাবো। বললাম চলো কোন সমস্যা নাই, চলেন। সিগারেটে টান দিতে দিতে ভাবতে লাগলাম। এভাবে আর কতদিন মেয়েটাকে ঠকাবো।
মমির সাথে আমার সম্পর্ক ২ বছর হলো। এই সময়ে মেয়েটার কাছ থেকে অনেক নিয়েছি। দেয়ার ইচ্ছে থাকলেও বিশেষ সুবিধা এখনো করতে পারিনি। দেয়ার মধ্যে দিয়েছি – কিছু কবিতা। আজকাল যা অচল। মাঝে মধ্যে নিজেকে নিজের কাছে বিস্ময় লাগে।
পার্কে বসে মমির কানের কাছে মাছির মতো ভন-ভন করা। ভালোবাসা নামের রোজ একগাদা কবিতা আবৃত্তি। কবিতা আবৃত্তির নামে ভালোবাস আর ভালো থাকার আত্নসংলাপ। পিঠটান করে দীর্ঘ মাঠে শুয়ে মমির ঠোঁট এর দিকে চেয়ে থাকা, এর চেয়ে বেশি এগুনোর সাহস নেই। এটা মেয়েটা বেশ ভালোই বোঝে।
২ টা টিউশনি করে ঘর ভাড়া দেয়া, নিজের খরচ চালানো সত্যিই কঠিন। বিশাল ঢাকা শহরে তারপরেও জীবন চলে যাচ্ছে। রেলগাড়ির মতো ধুকে ধুকে চলা।
ইচ্ছে করে বাড়ির খবর বেশি নেয়া হয় না। খবর নিতে গেলে অনেক অভিযোগ। ছোট বোনের অভিযোগ, বাবার অভিযোগ। মা হয়ত কিছুই বলবে না। তারপরও তার দু’চোখের চাহনিতে সে আমার ভিতর পর্যন্ত দেখে ফেলবে। তাই তো মায়ের চোখের দিকে তাকাতে পারি না। বাড়ির কথা মনে পড়লেই চোখ দুটো ভিজে যায়। ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি রিক্সা চলে এসেছে।
মমিকে দেখতে পাচ্ছি। গেটে দাঁড়িয়ে তার বন্ধবী সুমার সঙ্গে কথা বলছে। মাঝে মধ্যে ভাবনা হয়, সত্যি কি সে আমাকে ভালোবাসে? নাকি টাইম পাস করে। যা করবে করুক। আমার আগে চাই রিক্সা ভাড়া।
রিক্সাওয়ালাকে বললাম, গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। রিক্সা থেকে নেমেই মানিব্যাগে হাত দিলাম। বললাম, ভাংতি নাই। মমিকে বললাম, ২০ টাকা ভাংতি হবে? মমি হাসতে হাসতে টাকা বের করে দিল। এই জন্য মেয়েটাকে এত ভাল লাগে। চাওয়ার আগেই দিয়ে দেয়। রিক্সাওয়ালাকে বিদায় দিয়ে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম।
মমি সুমাকে বিদায় করে দিয়ে বলল চলো যাই তারপর আমরা দুজন রাস্তার পাশ ধরে হাঁটতে লাগলাম। মমি একটা লাল জামা পরেছে। ও এমনিতেই ফর্সা। লাল জামায় মমিকে পরীর মতো লাগছে।
কথা বলতে বলতে আমি মাঝে মধ্যে হারিয়ে যাই আমার নিজস্ব ভূবনে। যেখানে দেখি বাবার করুণ মুখ, মায়ের ছেঁড়া শাড়ী, বোনের পুরনো স্যান্ডেল। এসময় হঠ্যাৎ বাম পাশ দিয়ে একটা প্রাইভেট কার দ্রুত বেরিয়ে গেল।
সামান্য ধাক্কা খেলাম, তবে টের পেলাম না। তবে চোখের ওপর ঝাপসা লাল রঙ যেন ঝলসে গেল। এরপরে হুড়মুড় করে পালানোর শব্দ। এক, দুই, পাঁচ, দশ, একশ করে অনেক মানুষ। অনেক শব্দ। কানে বাজছে অনেক মানুষের শব্দ। মানুষ এতো জোরে কথা বলে কেন? তারা বোঝেনা, অতি শব্দ মানুষের মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ায়।
আমার চোখের ভেতর আরো হাজার চোখের ভিড়। গোল কালো স্বচ্ছ চোখ। শিশুদের এমনচোখে তাকাতেই ইচ্ছে করে। লাল চোখ, ভীষণ খারাপ লাগে। ঘোলা চোখ, পচা ডিমের মতো। ঠিক বৃদ্ধ বয়সী মানুষের চোখ। দেখতে ভালো লাগে না। চোখের কোণে কোণে ময়লা। অপরিষ্কার চোখে মাছি বসে।
টের পেলাম রাস্তায় শুয়ে আছি। চার পাশে দেখছি লাল রং। রক্তে ভেসে যাচ্ছি আমি। মমি চিৎকার করে লোক ডাকছে। কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। তবে তার প্রজাপতির মতো অদ্ভুত আচরণ দেখতে বেশ ভালো লাগছে। কি যে সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে সে- লালপরী।
চোখ ভরে আসছে ঘুম। আমি চলে যাচ্ছি আমার গ্রামে। আমার মায়ের কাছে। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। পাশে কে যেন বলছে- ওনাকে তাড়াতাড়ি রিক্সায় তোলেন।
আমার দু’চোখ বাবাকে খুঁজছে। বাবা তুমি কোথায়? তোমাকে অনেকদিন দেখিনি বাবা। তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে চাই।
(এমএ/এসএএম/ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)