
মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, নরসিংদী: ৪৭তম মহান স্বাধীনতা দিবস আজ। এদিনটি বাঙালি জাতির জন্য বিশেষ স্মরণীয়। আর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গৌরবের ও মর্যাদার। এদিনে কিছুটা হলেও জাতি তাদেরকে স্মরণ করে। দেশ স্বাধীন হবার পর কয়েক দফায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরী করা হয়েছে। তারপরও অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত হয়নি। তাদের মধ্যে নরসিংদীর প্রবীণ সাংবাদিক নিবারণ রায় একজন। গত বছরের শেষের দিকে যাচাই বাছাই পূর্বক পূণরায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুত হয়, সেই তালিকায় নিবারণ রায়ের নাম থকলেও স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও মেলেনি তার মুক্তিযোদ্ধার সনদ।
সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা নিবারণ রায় ১৯৫২ সালের ৩০ আগস্ট জন্ম করেন। তাকে সবাই দাদা বলে ডাকেন। সাদাসিধে সহজ সরল মানুষ। তাকে বিলাসি কোনো পোশাক পড়তে কোনোদিন দেখেনি কেউ। সাদা রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি অথবা সাদাসিদে সার্ট-পেন্ট এই ছিল তার ড্রেস।
১৯৭১’এ কলমের পরিবর্তে হাতে তুলে নেন অস্ত্র । তখন কী তার পোশাক পাল্টে গিয়েছিল? জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু জানা হয়নি।
রণাঙ্গনের সেই দিনগুলোয় কী কলমটা তিনি তুলে রেখেছিলেন? কলমে যেমন তুখোড়, অস্ত্রের ভাষাতেও একই রকম দক্ষতার কথা বলেছেন তিনি। অস্ত্র হাতে নিয়েও রনাঙ্গণে থেকেও তিনি কলম চালাতে ভুলে যাননি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর মুক্তিবাহিনীর হামলার খবর তিনি পরিবেশন করতেন তৎকালীন সাপ্তাহিক বাংলার বাণী পত্রিকায়। মুক্তিযুদ্ধে এই কলম যোদ্ধার বিশেষ অবদান থাকলেও স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও মেলেনি তার মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র। তবে সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের নরসিংদী সদর উপজেলার ‘খ’ তালিকায় তার নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
সাংবাদিক নিবারণ রায় জানান, ছেলেবেলা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন ভাষণ রেডিওতে শুনতে শুনতে তিনি বেড়ে ওঠেন। মূলত তখন থেকেই তিনি রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন। ১৯৬৯ সালে তিনি সাটিরপাড়া কালিকুমার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ভর্তি হন নরসিংদী সরকারি কলেজে। মূলত তখনই যুক্ত হন ছাত্র রাজনীতিতে। তিনি ১৯৬৯ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত নরসিংদী কলেজ শাখার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন নারায়রণগঞ্জ মহকুমা (উত্তর অঞ্চল রাজনৈতিক জেলা) ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে জড়িত হয়ে পড়লেও তার মনে লালিত স্বপ্ন ছিল, সাংবাদিক হওয়ার।
ছাত্র অবস্থায় তিনি বাংলার বাণী পত্রিকার মাধ্যমে যুক্ত হন সাংবাদিকতায়। তখন কোন ফ্যাক্স ছিল না, টেলিফোন থাকলেও ঠিকমতো ডায়াল টুন পাওয়া যেত না। পত্রিকার প্যাডে সংবাদ লিখে ডাকযোগে সংবাদ পাঠাতে হতো পত্রিকা অফিসে। সময় লাগত ৩ থেকে ৪ দিন। মাঝে মধ্যে সংবাদ পাঠানো হতো টেলিগ্রামেও, তারপরও সময় লাগত ১ থেকে ২ দিন। পত্রিকা থেকে সম্মানি পেতেন মাসিক ২০০ টাকা, লাইনেস পেতেন ১০ পয়সা ও ছবির জন্য পেতেন ১০ টাকা। তিনি যখন প্রথমে বাংলার বাণী পত্রিকার সাথে যুক্ত হন তখন বাংলার বাণী ছিল সাপ্তাহিক, মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাপা হতো আগরতলা থেকে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মুজিব বাহিনীর প্রধান শেখ ফজলুল হক মনি’র সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশ হয় দৈনিক হিসেবে।
নিবারণ রায় বলেন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পর নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলে শত শত যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। ২৫ মার্চ রাতে বাঙালির ওপর হানাদারদের হামলা শুরু হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন নিবারণ রায়।
৩,৪ ও ৫ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী জঙ্গি বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে নরসিংদী বাজার পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দেয়। এ সময় নিহত হয় ১৩ জন নিরিহ বাঙালী। এর পরেই শুরু হয় প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও চোরাগুপ্তা হামলা। তখন গোটা শহরে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে ক্যাপ্টেন সায়গলের নেতৃত্বের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি হানাদারদের প্রতিরোধ করতে নরসিংদীতে আনসার ও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। তখন নিবারণ রায়সহ ছাত্রলীগ নেতা (পরে মেজর) সামসুল হুদা বাচ্চুর নেতৃত্বে নজরুল ইসলাম হীরু (বর্তমান পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী),আলী আকবর, নুরুল ইসলাম গেন্দু, মানিক লাল সাহা, হারাধন সাহা, ফজলুল কাদের সওদাগর, সুভাষ সাহা, আব্দুল গফুর ভূইয়া, কেশব লাল সাহা, খালেকুজ্জামান, আবুল হায়াৎ সরকার, হারুন অর রশিদ, আবুল কাসেম, জগদীশ আচার্য (গনেশ), ক্ষিতিশ ঘোষ, স্বপন সাহা (পরে সাংবাদিক), মাহমুদ হাসান,মজিবুর রহমান, আক্রাম হোসেন, আপেল মাহমুদ (সঙ্গীত শিল্পী) ও মেজবাহ উদ্দিন ইরানসহ আরো অনেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কোম্পানিকে স্বাগত জানান।
ওই সময় পাকি বাহিনী পাঁচদোনায় হামলা চালিয়ে নরসিংদী টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখল করে নেয়। শুরু হয় চোরাগুপ্তা হামলা। তখন নিবারণ রায় নরসিংদী থেকে পালিয়ে যান নবীনগর থানার একটি গ্রামে, তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে। এ সময় এলাকায় শুরু হয় গণডাকাতি। তিনি কোনাবন বর্ডার দিয়ে আগরতলা যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু যাওয়ার পথে পাক বাহিনীর গাড়ির সামনে পড়েন। রাস্তার পাশের পাটখেতে লুকিয়ে কোন মতে জীবন রক্ষা করেন। পরে নৌকায় করে নদী পার হয়ে চলে যান আগরতলা। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে চলে যান আসামের শীলচর ও করিমগঞ্জ এলাকায়। ওই খানে দুই মাস অবস্থানের পর আবার চলে আসেন আগরতলায়। পরে আগরতলা থেকে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। সব শেষে বাংলাদেশে এসে নরসিংদীর আলোকবালী মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পে এসে যোগ দেন।
১৯৭১ সাল সেইদিনটি ছিল ডিসেম্বর মাস। নরসিংদী মুক্তদিবসের ঠিক ৩ দিন আগে ঘটনা। নরসিংদীর সদর উপজেলার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বালুসাইর এলাকায় বাংলার মুক্তিসেনারা পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকবাহিনী মাধবদী থেকে ভিতর পথে নরসিংদী অভিমুখে রওনা করলে এখবর পৌছায় আলোকবালী মুক্তিযোদ্ধ ক্যাম্পে। আলোকবালী মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বালুসাইর এলাকায় এসে তাদের উপর হামলা চালায়। শুরু হয় পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ। এসময় মক্তিযোদ্ধাদের সাহায়্যে এগিয়ে আসে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর বীর জোয়ানরা। ব্রিজের দক্ষিন পাশে অবস্থান নেয় পাক বাহিনী আর উত্তর পাশে মুক্তিযোদ্ধারা। এ যুদ্ধে পাক বাহিনীর অন্তত ৪/৫ সেনার প্রাণ হানি ঘটে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাক সেনারা। ৭১’এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের এমনই এক সম্মুখ যুদ্ধের বর্ণনা দেন নিবারণ রায়।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাকশাল ঘোষণা করলে ৪টি পত্রিকা বাদে বাংলার বাণী পত্রিকাসহ সব পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন তিনি যোগ দেন নরসিংদী সংবাদদাতা হিসেবে দৈনিক ইত্তেফাকে। ১৯৮১ সালের দিকে শিবপুরের বিশিষ্ট ঠিকাদার আব্দুল আউয়ারের স্ত্রী সিতারা বেগমকে অপহরণ করে ঢাকায় আটকে রাখে সন্ত্রাসী ইমদু ও তার বাহিনী। তৎকালীন নরসিংদীর তরুণ সাংবাদিক নিবারণ রায় এ খবরটি ইত্তেফাক অফিসে পাঠাতে কম কাঠখড় পোড়াননি। ইত্তেফাকে ছাপার পর ব্যাপক আলোচিত হয় সংবাদটি। এর পরে তৎকালীন যুব মন্ত্রী আবুল কাশেমের বাসা ঘেড়াও করে ইমদুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বর্তমানে নিবারণ রায়ের বয়স ৬৬ বছর। দেখলে বুঝাই যায় না তার বয়স এতোটা। সাংবাদিকতা করছেন গত ৪৬ বছর ধরে। নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি হিসেবেই দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছেন দৈনিক ইত্তেফাকে ।
নরসিংদীর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নিবারণ রায় টানা ২২ বছর ধরে এই পদে ছিলেন। এছাড়া তিনি ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সন, ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সন ও সর্বশেষ ২০১০ থেকে ২০১২ সন পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭২ সালে মাত্র ৪/৫ জন সাংবাদিক নিয়ে নরসিংদী প্রেসক্লাব গঠন করেন। বর্তমানে ক্লাবের সদস্য সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। বর্তমানে (২০১৮ সন) তিনি আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জেলার একজন পথিত যশা সাংবাদিক সশরিরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেও তার স্বীকৃতি আজও মেলেনি সত্যি তা দু:খজনক। দেশের স্বাধীনতায় যাদের অংশীদারিত্ব আছে তারা সকলে তাদের সেই স্বীকৃতি পাক এটাই নরসিংদীবাসীর দাবী।
(এসএইচআর/এসএম/ ২৬ মার্চ ২০১৮)