
মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, বিনিয়োগবার্তা, নরসিংদী: মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতরের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। তবে ঝামেলা এড়াতে এরই মধ্যে অনেকেই সেরে ফেলছেন ঈদের কেনাকাটা। বছরের এই একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে কেনাকাটার ধুম। তাই ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতাদের আগমনে জমে উঠেছে নরসিংদীর মার্কেট, বিপনী বিতান ও শপিংমলগুলো। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে নরসিংদী জেলা শহরসহ মাধবদী ও প্রত্যেকটি উপজেলা সদরের বিভিন্ন শপিংমলগুলো ক্রেতাদের আগমনে সরগরম হয়ে উঠছে বাড়ছে ক্রেতাদের ভিড় । এরই মধ্যে বেশ জমে উঠেছে ঈদ বাজার। তবে সন্ধ্যা হলেই ভিড় বাড়তে থাকে তা চলে অনেক রাত পর্যন্ত। দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও খুব একটা আক্ষেপ নেই ক্রেতাদের। ঈদের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই জমে উঠতে শুরু করেছে ঈদ বাজার।
নরসিংদীর ঈদবাজারে এবার দেশি কাপড়ের চাহিদা বেশি। এরই মধ্যে শহরের মার্কেট ও বিপণিবিতান গুলোতে চলছে গভীর রাত পর্যন্ত ঈদের কেনাকাটা। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, খেটে খাওয়া মানুষ সাধ্যমতো ঈদের কেনাকাটা করছেন। বড় বড় বিপণিবিতানের পাশাপাশি ফুটপাতের দোকানদাগুলোতেও কেনাকাটায় মানুষের ঢল নেমেছে। ফুটপাতের দোকানগুলোতে সাধারণত রিকশা চালক, দিনমজুরসহ সাধারণ মানুষের ভিড় বেশি। শহরের সিএন্ডবি রোডের সিটি সেন্টার, নয়ন তারা প্লাজা, কাজী সুপার মার্কেট, সদর রোডের ইন্ডেক্স প্লাজা, ইসলাম প্লাজা, সুলতান শপিং কমপ্লেক্স, স্টেশন রোডের নিয়াজ মার্কেটসহ আশপাশে অন্যান্য মার্কেট গুলো এবং নরসিংদী বাজারের পুরাতন পোস্ট অফিস রোড, কালীবাড়ী রোডের বিভিন্ন বিপণী বিতানগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে কেনাকাটায় ব্যস্ত ক্রেতারা। এবার ঈদ মার্কেটে এসেছে হরেক রকম বাহারী ডিজাইনের রঙ-বেরঙের পোশাক। বিক্রেতারা জানান, এবছর বিদেশি পোশাকের চেয়ে দেশি পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের ঝোঁক বেশি। তরুণীদের পছন্দের কিছু ভারতীয় পোশাক বিক্রি হওয়ার বাইরে বিদেশি পোশাকের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ নেই ক্রেতাদের।
গত শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শহরের বিভিন্ন শপিং সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। তরুণ-তরুণীরা ব্যস্ত হাল-ফ্যাশনের পোশাক ক্রয়ের জন্য। তরুণ- তরুণীদের পছন্দের পোশাক পাওয়া যাচ্ছে সিটি সেন্টার, নয়ন তারা প্লাজা, কাজী সুপার মার্কেট, ইন্ডেক্স প্লাজা, সুলতান শপিং কমপ্লেক্স, ইসলাম প্লাজা, স্টেশন রোড, সদর রোড, কালীবাড়ী রোডের বিভিন্ন বিপণী বিতানগুলে।
সরেজমিনে নরসিংদীর ঈদ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এবার ভারতীয় কাপড়গুলোকে পেছনে ফেলে বাজার দখল করেছে দেশি সুতি কাপড়গুলো। গরমকাল থাকার কারণে দেশি সুতি থ্রিপিসগুলো পছন্দ ও বিক্রির শীর্ষে রয়েছে। সমানতালে বিক্রি হচ্ছে ইন্ডিয়ান গাউন ও কাজ করা লং ফ্রকগুলো। এ ছাড়া, টুপার্ট, ফোরপার্ট, কুর্তি, জিপসি, সারারা, গারারা ফোরপিস অরগেন্ডিও বিক্রি হচ্ছে বেশ।
বরাবরের মতো এ বছরও হিন্দি সিনেমা আর সিরিয়ালের নাম অনুসারে বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় পোশাকগুলো। গত বছরের অরগেন্ডি, বাহুবালী, দেবসেনা, রাখীবন্ধন বাজিরা মাস্তানির মতো এবার বিক্রির শীর্ষে দেশি সুতি থ্রিপিসগুলো।
অপর দিকে, ভারতীয় গাউন, লাসা কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। লংফ্রক দুই হাজার থেকে আট হাজার টাকা। এ দিকে, চাহিদার শীর্ষে ছেলেদের ক্যাটলোক পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে। এ ছাড়া, জিন্স প্যান্ট, গ্যাবার্ডিং প্যান্টের পাশাপাশি কালার ফুল শার্ট, চেক শার্ট, এক কালার শার্ট রয়েছে পছন্দের তালিকায়। বিক্রি হচ্ছে ছোটদের লেহেঙ্গা। এছাড়া টপ, স্কার্ট ও ফ্রকও রয়েছে ছোটদের পছন্দের তালিকায়। এ ছাড়াও বিভিন্ন পাড়ায় গজিয়ে উঠা শপিং মল গুলোতে নতুন-নতুন দোকানে পাওয়া যাচ্ছে অত্যাধুনিক গার্মেন্টস আইটেমের পোশাক।
নয়নতারা প্লাজা ও কাজী সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, একেকটি দোকান সাজাতে কোটি টাকার বেশি পোশাক দোকানে তুলতে হয়েছে। সিএ বি রোড, সদর রোড ও সুলতান শপিং কমপ্লেক্সের বড় নামি-দামি শো-রুমগুলোতে বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে পোশাক তোলা হয়েছে ঈদকে কেন্দ্র করে। তারা ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলে চোখের আলোকে জানান।
রুচিশীল ক্রেতারা তাদের ছেলে- মেয়েদের একটু দামি পোশাক কেনার জন্য ভিড় করছেন দর্জিবাড়ী, কটন ফ্যাশন, মার্ক-৩, লোটো, ম্যানস্ জোন, রং , গ্রামীন, ভূঁইয়া ফ্যাশনসহ শহরের বিভিন্ন নামি-দামি শো-রুমগুলোতে। এ সব শো-রুমগুলোতে ছেলেদের জন্য এবার এসেছে বিভিন্ন ডিজাইনের পাঞ্জাবি। নগরীর বিপণী বিতানসহ শিশুদের পোশাকের দোকানগুলোতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। ক্রেতাদের ভিড়ে দোকানের কর্মচারীদের কথা বলার কোনো ফুসরত নেই।
সদর রোডের মার্ক-৩ শো-রুমের স্বত্বাধিকারী মনিরুজ্জামান মনির জানান, ঈদকে সামনে রেখে রমজানের সপ্তাহ দুয়েক আগেই গ্রাহকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে নতুন নতুন ডিজাইনের বিভিন্ন পোশাক তাদের শো-রুমে স্থান পেয়েছে। তাদেও কালেকশন গ্রাহকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। রমজানের শুরুর দিকে বেচাকেনা আশানুরোপ না হলেও এখন বেশ ভালই বেচা-বিক্রি হচ্ছে।
সিএন্ডবি রোডের শরীফ ম্যানসনের মৃধা ক্লথ স্টোরের দোকানী জানান , তুলনামূলকভাবে গতবছরের চেয়ে এ বছরে পোশাকের দাম কিছুটা কম রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন নামে বিক্রি হওয়া তরুণীদের পোশাকগুলোর দাম একটু চড়া। বাকি পোশাক স্বল্প দামের কারণে ভালো বিক্রি হচ্ছে। তরুণ-তরুণীদের কেনাকাটার পাশাপাশি বেশিরভাগ নব-বিবাহিত নারীরা ভিড় করছেন শাড়ির দোকানে। এখানকার শাড়ির বাজার দীর্ঘদিন একচেটিয়া দখল করে রেখেছেন সুলতান শপিং কমপ্লেক্স ও সিএন্ডবি রোডের কয়েকটি নামি-দামি শাড়ি কাপড়ের শো-রুমগুলো।
ইনডেক্স প্লাজার কাকতারুয়া’র দোকানি জানান, বিক্রির দিক দিয়ে দেশি সুতি থ্রিপিসগুলো ভালোই বাজার ধরেছে। পাশাপাশি ইন্ডিয়ান গাউনের বিক্রিও ভালো। গরমকালে সুতি কাপড়ে আরাম বেশি বলে দেশীয় সুতি থ্রি-পিস পছন্দ করছে নারী ক্রেতারা।
শিবপুরের সৃস্টিগড় এলাকা থেকে কেনাকাটা করতে আসা কলেজছাত্রী সুমাইয়া ইসলাম জানান, গাউন কাপড়ের পাশাপাশি দেশি সুতি থ্রি-পিস নিয়েছে। দাম গত বছর থেকে কিছুটা বেশি মনে হলেও কাপড় পছন্দ হয়েছে তাই দাম বেশি হলেও তাই আর দামের কথা চিন্তা না করেই নিয়েছে।
সুন্দরী ক্লথ স্টরের স্বত্বাধিকারী দুলাল সাহা ও দুলহান ক্লথ স্টোরের শরিফ জানান, দেশি কাপড়ের পাশাপাশি ভারতীয় ও পাকিস্তানি কালেকশনও ভালো চলছে। তবে বিক্রি বেশি দেশি সুতি কাপড়ের। ক্রেতার চাহিদানুসারে আমরা দেশি-বিদেশি দুই ধরনের পোশাকই বিক্রি করছি।
এবারের ঈদ মার্কেটে কাতান শাড়ি বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে, জামদানি বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে, সিল্কের শাড়ি ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা, বালুচরী পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাহারী নামের শাড়ির মধ্যে ইমন নামের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া শাড়িটির মূল্য পাঁচ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়াও সুলভ মূল্যে শাড়ি ও যাকাতের কাপড় বিক্রি করছেন নরসিংদী বাজারের জিন্নাহ পার্কের আশপাশের কাপরের দোকান গুলো।
একটি সরকারী দপ্তরের কর্মকর্তা আব্দুল আল-মামুন বলেন, মূলত ঈদে পোশাক কেনাকাটার আনন্দই আলাদা। তবে গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় সিরিয়াল ও মুভির বিভিন্ন চরিত্রের নামের সাথে মিল রেখে পোশাকের কদরই বেশি দেখছি।
ছেলেদের পাঞ্জাবির বাইরে বাহারি ডিজাইনের প্যান্ট, শার্ট ও ফতুয়া বিক্রি হচ্ছে । ছেলেদের একচেটিয়া পোশাক বিক্রি করছে সদর রোড ও স্টেশন রোডের বেশ কয়েকটি শো-রুম ।
নরসিংদীর বানিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত মাধবদী শহরের বিভিন্ন বিপনী বিতানগুলোতে নারী-পুরুষ ও শিশু কিশোরদের উপচে পড়া ভীড় লক্ষ্য করা গেছে। জেলার উপজেলা শহর গুলোতেও একই চিত্র দেখে গেছে।
এদিকে ঈদকে সামনে রেখে ব্যাপক ব্যস্ত সময় পার করছেন নগরীর টেইলার্সগুলোর দর্জিরা। সময়মত পোশাক ডেলিভারি দেয়ার চিন্তায় তারা দিন-রাত সমানতালে কাজ করে যাচ্ছে। দর্জিরা জানান, ১৫ রমজানের পর আর কোনো নতুন অর্ডার নেওয়া হয়নি। কিন্তু যে অর্ডার তারা নিয়েছে তা সময় মত ডেলিভারি দিতেই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
(এসএইচআর/এসএএম/ ০৭ জুন ২০১৮)