
প্রারম্ভিকাঃ সংশোধিত “কর্পোরেট পরিচালন কোড” (Corporate Governance Code) এর একটি খসড়া সংস্করণ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর ৬২০তম সভায় (১৯ ডিসেম্বর ২০১৭) উপস্থাপন করা হয় এবং জনমত যাচাইয়ের জন্য অনুমোদিত হয়। সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ধারা ৩৩(১) অনুসারে বহুল প্রচারিত দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশের মাধ্যমে কোন খসড়া বিধি/কোড-এর উপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসমূহের মতামত, পরামর্শ বা আপত্তি নেয়া এবং তা বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। খসড়া “কর্পোরেট পরিচালন কোড” ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে বিএসইসি-র ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় এবং ৪ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখের মধ্যে মতামত প্রদানের অনুরোধ রাখা হয়। এর পরদিন উক্ত খসড়া কোডটি একটি ইংরেজী পত্রিকা এবং দুটি বাংলা পত্রিকায় ছাপা হয়।সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উক্ত খসড়া কোডের উপর ব্যাপক মতামত ও পরামর্শ পাওয়া যায়। গত ০৩ জুন ২০১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত বিএসইসি-র ৬৪৬তম সভায় খসড়া কোডটি জনমত জরিপে প্রাপ্ত মতামত বা পরামর্শ পর্যালোচনা করে সংশোধন বা পরিবর্তন বা পরিমার্জনপূর্বক চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয় বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশের জন্য। ঐ সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে খসড়া পরিচালন কোডের আর্থিক রিপোটিং ও প্রকাশ (Financial Reporting and Disclosure) অংশটি উক্ত কোডের অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে উলি¬খিত অংশের উপর জনমত জরিপে প্রাপ্ত মতামত বা পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে পৃথক একটি প্রজ্ঞাপন (Notification) জারি করার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। বর্তমান নিবন্ধে চূড়ান্তকৃত “কর্পোরেট পরিচালন কোড ২০১৮” এবং পূর্ববর্তী “কর্পোরেট পরিচালন নির্দেশিকা ২০১২” (Corporate Governance Guidelines 2012) এর একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
কর্পোরেট পরিচালন নির্দেশনা নিয়ে বিএসইসি’র উদ্যোগঃ
বিএসইসি (৮ জুন ১৯৯৩ তারিখে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা এসইসি নামে প্রতিষ্ঠিত; ১০ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে পরিবর্তিত নাম হয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা বিএসইসি) ২০ ফেব্রুয়ারী ২০০৬ তারিখে প্রথম “পরিপালন কর বা ব্যাখ্যা দাও” (comply or explain) ভিত্তিতে “কর্পোরেট পরিচালন নির্দেশিকা“ তালিকাভুক্ত কোম্পানীর জন্য একটি প্রজ্ঞাপন হিসেবে জারি করে, যা বাংলাদেশ গেজেটে ২৬ এপ্রিল ২০০৬ তারিখে প্রকাশিত হয়। “কর্পোরেট পরি

চালন“ (Corporate Governance) সংক্রান্ত পৃথক নিয়মাধীনকরণ (regulation)–এর যাত্রা মূলত: এখান থেকেই। ২০০৬ সনের কর্পোরেট পরিচালন নির্দেশিকায় যে পাঁচটি শিরোনাম যুক্ত করা হয় তা হলঃ পরিচালনা পর্ষদ; মুখ্য আর্থিক কর্মকর্তা, অভ্যন্তরীণ নিরিক্ষা প্রধান ও কোম্পানী সচিব; নিরীক্ষা কমিটি; বহি:স্থ/বিধিবদ্ধ নিরীক্ষক; এবং কর্পোরেট পরিচালনের রিপোর্টিং ও পরিপালন। এর প্রায় সাড়ে ছয় বছর পর বিএসইসি ০৭ আগস্ট ২০১২ তারিখে নতুন “কর্পোরেট পরিচালনা নির্দেশিকা” জারি করে, যা ৩০ আগস্ট ২০১২ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়। এটি পূর্বের “পরিপালন কর বা ব্যাখ্যা দাও” প্রয়োগ-কৌশল বদলিয়ে বাধ্যতামূলক (পরিপালন কর) করা হয় এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখ থেকে পরিপালন সময়সীমা বেধে দেয়া হয়। ২০১২ সনের নির্দেশিকায় নতুন দুটি শিরোনাম যুক্ত করা হয়: অধীনস্থ কোম্পানী; এবং মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও মুখ্য আর্থিক কর্মকর্তার কর্তব্যসমূহ। ২০০৬ সনের নির্দেশিকা থেকে ২০১২ সনের নির্দেশিকায় সবকিছুই রাখা হয় এবং বাধ্যতামূলকভাবে তা পরিপালন করা হচ্ছে কিনা, তার জন্য চর্চারত পেশাজীবি হিসাববিদ বা সচিবের কাছ থেকে “পরিপালন সনদ” নেয়ার বিধান করা হয়। এরপর ১৮ আগস্ট ২০১৩ তারিখে অধিকারমূলক শেয়ার (Rights Share) ইস্যুর ক্ষেত্রে এবং ২৮ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখ থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের ক্ষেত্রে “কর্পোরেট পরিচালন নির্দেশিকা” পরিপালন বাধ্যতামূলক করা হয়।
২০১৬ সনের মে মাসে বিদ্যমান “কর্পোরেট পরিচালন নির্দেশিকা”-র সংস্কারের জন্য বিএসইসি একটি কমিটি করে এবং উক্ত কমিটি ২০১৭ সনের মধ্য ডিসেম্বরে তাদের প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর খসড়া অনুমোদন, জনমত জরিপ এবং ব্যাপক পর্যালোচনার পূর্বের নির্দেশিকা বাতিল করে ০৩ জুন ২০১৮ তারিখে নতুন “কর্পোরেট পরিচালন কোড“ জারি করেছে, যা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখের মধ্যে তালিকাভুক্ত কোম্পানীসমূহকে পরিপালন করতে হবে।
কর্পোরেট পরিচালন সংক্রান্ত ২০১২ সনের নির্দেশিকা ও ২০১৮ সনের কোডের তুলনামূলক পর্যালোচনাঃ
বিএসইসির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০০৬-২০০৭ এ উল্লেখ করা আছে, “বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন এর উন্নয়নকল্পে” ২০০৬ সনের “কর্পোরেট পরিচালন নির্দেশিকা“ জারি করা হয় (পৃ: ১৪)।এর প্রায় ছয় বৎসর সাড়ে পাঁচ পর ২০১২ সনের নির্দেশিকা ছিল আরো এক ধাপ অগ্রগতি। “পরিপালন কর” ভিত্তিক ২০১২ সনের নির্দেশিকাটির প্রায় পাঁচ বৎসর দশ মাস এবারই প্রথম প্রজ্ঞাপনটির শীর্ষে একটি শিরোনামও দেয়া হয়েছে: Corporate Governance Code (কর্পোরেট পরিচালন কোড)। নীচে নতুন কোডের শিরোনাম অনুযায়ী পূর্বতন নির্দেশিকার সাথে নতুনভাবে যুক্ত শর্তসমূহ ও সংশোধনীসমূহ আলোচনা করা হলঃ
১। পরিচালনা পর্ষদ: এখানে বেশ কিছু নতুন শর্ত এবং পূর্বের কিছু শর্তে সংশোধনী বা পরিবর্তন এসেছে, যা নিচে উল্লেখ করা হল:
(ক) পরিচালনা পর্ষদের আকার: এখানে কোন পরিবর্তন আসেনি, অর্থাৎ পর্ষদের আয়তন হবে ৫ জনের কম নয় এবং ২০ জনের বেশী নয়। তবে এক্ষেত্রে পূর্বে একটি শর্ত (Proviso) ছিল, যা অনাবশ্যক বিধায় বাতিল করা হয়েছে। উক্ত শর্তে (Proviso) বলা ছিল যে, ব্যাংক, ব্যাংক ব্যতীত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানী এবং বিধিবদ্ধ সংস্থার ক্ষেত্রে যোখানে বাংলাদেশ ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, ইত্যাদি প্রাথমিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে, সেসব কোম্পানীর পর্ষদ উক্ত প্রাথমিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেভাবে নির্ধারণ করবে সেভাবে কর্পোরেট পরিচালন নির্দেশিকার আয়তনের সাথে যতদূর অসামঞ্জস্য নয়, ততদূর পরিপালন সাপেক্ষে নির্ধারণ করবে।
(খ) স্বতন্ত্র পরিচালক: এখানে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংজ্ঞায় নতুন একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে: কোম্পানীর কোন নির্বাহী অবসরের পর কমপক্ষে দুটি আর্থিক বৎসর উক্ত কোম্পানীর স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারবেন না। অন্যান্য পরিবর্তনসমূহ নিম্নরূপ:
(i) পর্ষদের এক-পঞ্চমাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে ভগ্নাংশকেও পূর্ণ একজন ধরতে হবে, যা পূর্বে স্পষ্ট ছিল না। যেমন: পর্ষদের আয়তন ১১ হলে, স্বতন্ত্র পরিচালক হবে তিন জন, যদিও এক-পঞ্চমাংশ হয় ২.২ জন।
(ii) “স্বতন্ত্র পরিচালক“ এর সংজ্ঞায় পরিবর্তন:
∙ কোম্পানীর মনোনীত পরিচালক বা কোম্পানীর সহযোগী বা সহোদরা প্রতিষ্ঠান, অধীনস্থ ও সৃজনকারী বা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এক শতাংশ বা তার বেশী শেয়ার গ্রহীতা স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারবেন না।
∙ স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেক (Trading Right Entitlement Certificate ev TREC) গ্রহীতা বা পুঁজিবাজার মধ্যস্থাতাকারী কোম্পানীর স্বতন্ত্র পরিচালক কোন তালিকাভুক্ত কোম্পানীর স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারবেন।
∙ কোন নিরীক্ষা ফার্মে যদি পূর্ববর্তী তিন বৎসরে কোন তালিকাভুক্ত কোম্পানীর অভ্যন্তরীন নিরীক্ষা সেবা দান বা বিশেষ নিরীক্ষা সম্পাদন বা কর্পোরেট পরিচালন কোডের পরিপালন সনদ প্রদান করে থাকে, তবে উক্ত ফার্মের কোন অংশীদার বা নির্বাহী স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারবেন না।
∙ একজন ব্যক্তি পূর্বের তিনটির স্থলে এখন পাঁচটি তালিকাভুক্ত কোম্পানীর স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারবেন।
(iii) স্বতন্ত্র পরিচালকের মেয়াদের স্পষ্টীকরণ: পূর্বের বিধান অনুসারে কোন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ছয় বৎসর স্বতন্ত্র পরিচালক থাকতে পারতেন। এখন উক্ত দুই মেয়াদ শেষে এক মেয়াদ বা তিন বৎসর বাদ দিয়ে উক্ত ব্যক্তি আবারও দুই মেয়াদ স্বতন্ত্র পরিচালক থাকতে পারবেন।
(iv) স্বতন্ত্র পরিচালকের যোগ্যতা: পূর্বের অস্পষ্ট যোগ্যতার স্থলে এখন স্পষ্ট করাসহ যোগ্যতার ক্ষেত্রে আরো কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে:
∙ পূর্বের “ব্যবসায়ী নেতা“-র স্থলে এখন কমপক্ষে দশ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনসম্পন্ন তালিকাবর্হিভূত কোম্পানীর বা তালিকাভুক্ত যে কোন কোম্পানীর উদ্যোক্তা বা পরিচালক বা কোন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক বণিক-সভা বা ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্য হিসেবে “ব্যবসায়ী নেতা“ হতে হবে।
∙ পূর্বের “কর্পোরেট নেতা“-র স্থলে এখন অন্যূন দশ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনসম্পন্ন তালিকা বহির্ভূত কোন কোম্পানীতে বা যে কোন তালিকাভুক্ত কোম্পানীতে কমপক্ষে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, অর্থ বা হিসাব প্রধান বা কোম্পানী সচিব বা অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিপালন প্রধান বা আইন সেবার প্রধান বা সমরূপ পদমর্যাদার অধিকারী কোন প্রার্থী হিসেবে “কর্পোরেট নেতা“ হতে হবে।
∙ পূর্বের “সরকারী আমলা“ (Bureaucrat)-এর স্থলে এখন প্রক্তন সরকারী কর্মকর্তা বা বিধিবদ্ধ বা স্বায়ত্তশাসিত বা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কর্মকর্তা, যিনি জাতীয় বেতন-স্কেলের অন্যূন ৫ম গ্রেডের পদে কর্মরত ছিলেন এবং যাঁর অর্থনীতি বা বাণিজ্য বা ব্যবসায় বা আইন বিষয়ে স্মাতক ডিগ্রির শিক্ষাগত পশ্চাতপট রয়েছে।
∙ পূর্বের পেশাজীবী (Professional)-এর স্থলে এখন চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট বা কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্ট্যান্ট বা চার্টার্ড সেক্রেটারী-এর সাথে নতুন যুক্ত হয়েছে: কমপক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চর্চারত কোন উকিল বা চার্টার্ড আর্থিক বিশ্লেষক বা চার্টার্ড সার্টিফায়েড একাউন্ট্যান্ট বা সার্টিফায়েড পাবলিক একাউন্ট্যান্ট বা চার্টার্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্ট্যান্ট বা সমরূপ যোগ্যতাধারী পেশাজীবী।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পূর্বের অভিজ্ঞতা ১২ বৎসরের জায়গায় দু’বছর কমিয়ে ১০ বৎসর করা হয়েছে।
(ঘ) পর্ষদ সভাপতি এবং এমডি/সিইও-এর দ্বৈততা: এখানে নতুন দুটি শর্ত এসেছে:
∙ কোন তালিকাভুক্ত কোম্পানীর এমডি এবং/অথবা সিইও অন্য কোন তালিকাভুক্ত কোম্পানীতে একই পদে থাকতে পারবেন না।
∙ পর্ষদ সভাপতির অনুপস্থিতিতে কোন নির্দিষ্ট পর্ষদ সভার জন্য অ-নির্বাহী পরিচালকদের একজনকে অবশিষ্ট পর্ষদ সদস্যগণ উক্ত সভার জন্য সভাপতি নির্বাচিত করতে পারবেন এবং সেক্ষেত্রে সভাপতির উপস্থিতির কারণ সভার কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
(ঙ) শেয়ার গ্রহীতাদের নিকট পরিচালকদের প্রতিবেদন : এখানে নতুন বেশ কিছু শর্ত এসেছে:
∙ একটি বিবৃতি যাতে উলে¬খ থাকবে নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারগ্রহীতা কর্তৃক সংঘটিত কোন অবমাননাকর কাজ বা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শুধু তাদের স্বার্থে সংঘটিত কর্মকান্ড থেকে সংখ্যালঘু শেয়ার গ্রহীতাদের রক্ষা করা হয়েছে এবং পতিকারের কার্যকরী ব্যবস্থা আছে;
∙ অভ্যন্তরীণ লভ্যাংশ হিসেবে কোন বোনাস শেয়ার বা স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়নি মর্মে পর্ষদের বিবৃতি;
∙ সিইও বা এমডি কর্তৃক স্বাক্ষরিত ব্যবস্থাপনার আলোচনা ও বিশ্লেষণ, যাতে কোম্পানীর অবস্থা ও কর্মকান্ডের বিশদ বিশ্লেষণ আর্থিক বিবরণীসমূহের পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত আলোচনাসহ থাকবে এবং অন্যান্যের মধ্যে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহের উপর আলোকপাত করতে হবে:
(১) আর্থিক বিবরণী তৈরির হিসাব নীতি ও প্রাক্কলন;
(২) হিসাব নীতি ও প্রাক্কলনের পরিবর্তন, যদি থাকে, যেখানে আর্থিক কর্মসম্পাদন বা ফলাফল এবং আর্থিক অবস্থা তথা নগদ প্রবাহের উপর তার প্রভাব, উক্ত পরিবর্তনের সংখ্যাগত প্রকাশসহ।
∙ কর্পোরেট পরিচালন কোড-এর সংযুক্তি-ক অনুসারে সিইও এবং সিএফও কর্তৃক পর্ষদের নিকট প্রদত্ত ঘোষণা বা প্রত্যয়ন।
এছাড়া ৪টি বিদ্যমান শর্তে পরিবর্তন আনা হয়েছে:
∙ ঝুঁকি ও উদ্বেগের উপর নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ: এখন ঝুঁকি ও উদ্বেগের উপর তথ্যের মধ্যে অভ্যন্তরীন ও বহি:স্থ ঝুঁকি উপাদানসমূহ, অস্তিত্ব রক্ষার উপর হুমকি এবং পরিবেশের উপর ঋণাত্মক প্রভাব সংক্রান্ত তথ্য থাকতে হবে।
∙ সম্পর্কিত পক্ষের স্পষ্টতর তথ্য প্রকাশ: পূর্বের সম্পর্কিত পক্ষের তথ্য প্রকাশকে আরো স্পষ্টতর করার জন্য এ সংক্রান্ত লেনদেনের পরিমান, সম্পর্কিত পক্ষের প্রকৃতি ও লেনদেনের প্রকৃতিসহ বিস্তারিত আলোচনা দিতে বলা হয়েছে।
(চ) পরিচালনা পর্ষদের সভা: এখানে নতুন একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে আইসিএসবি কর্তৃক গ্রহীত সাচিবিক মান অনুসরণ করার বিষয়ে। এ শর্ত অনুসারে পর্ষদ সভা অনুষ্ঠানে ও কার্যবিবরণী লিপিবদ্ধকরণে এবং এ সংক্রান্ত বই ও দলিল সংরক্ষণে আইসিএসবি কর্তৃক গ্রহীত প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশ সাচিবিক মানসমূহ অনুসরণ করতে হবে, যদি তা কর্পোরেট পরিচালন কোড এর বিধানের সাথে অসামঞ্জস্য নয়।
(ছ) পর্ষদের সভাপতি, অন্যান্য সদস্য এবং সিইও-র জন্য আচরণবিধি: পূর্বেও এ ধরনের বিধান ছিল, কিন্তু এখন এটি “মনোনয়ন ও পারিশ্রমিক কমিটি” (Nomination and Remuneration Committee) এর সুপারিশে হতে হবে এবং এটি কোম্পানীর ওয়েবসাইটে দিতে হবে। উক্ত আচরণবিধিতে অন্যান্যের মধ্যে যে বিষয়গুলি থাকতে হবে, তা হল: প্রাজ্ঞ আচরণ ও ব্যাবহার; গোপনীয়তা; স্বার্থ-সংঘাত; আইন, বিধি ও প্রবিধান পরিপালন; আন্ত:স্থ ক্রয়-বিক্রয়ের নিষেধাজ্ঞা; পরিবেশ, কার্মচারী, খরিদ্দার ও সরবরাহকারীদের সাথে সম্পর্ক; এবং স্বাধীনতা।
২। অধীনস্ত কোম্পানীর পরিচালনা পর্ষদের পরিচালন: এখানে কোন নতুন শর্ত নেই। ২০১২ সনের কর্পোরেট পরিচালন নির্দেশিকার পঞ্চম শর্ত হিসেবে এটির শিরোনাম “অধীনস্ত কোম্পানী“-এর স্থলে উপরোক্তভাবে বদলানো হয়েছে।
৩। এমডি বা সিইও, সিএফও, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিপালন প্রধান এবং কোম্পানী সচিব: এখানে যেসব শর্ত নতুন এসেছে, তা হলো:
∙ শিরোনামের পদগুলিতে পৃথক ব্যক্তিকে নিয়োগ দতে হবে।
∙ কোন তালিকাভুক্ত কোম্পানীর উক্ত পদগুলির কোন ব্যক্তি অন্য কোন কোম্পানীর নির্বাহী পদে একই সাথে থাকতে পাবেন না।
∙ পর্ষদের অনুমোদন ব্যতীত উক্ত পদগুলোর কাউকে সরানো যাবে না এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জকে জানাতে হবে।
∙ কোম্পানী সংশ্লিষ্ট বছরে কোন প্রতারণামূলক, বেআইনী বা কোম্পানীর পর্ষদ বা পর্ষদ সদস্যদের জন্য প্রণীত আচরণ-বিধি ভঙ্গ করে কোন লেনদেনে যুক্ত হয়নি, তা এমডি বা সিইও এবং সিএফও কর্তৃক প্রত্যয়নপূর্বক বার্ষিক বিবরণীতে প্রকাশ করতে হবে।
৪। পরিচালনা পর্ষদের কমিটি: এটি নতুন শিরোনাম হিসেবে যুক্ত হয়েছে এবং পূর্বের নিরীক্ষা কমিটির সাথে মনোনয়ন ও পারিশ্রমিক কমিটি যুক্ত হয়েছে।
৫। নিরীক্ষা কমিটি: এক্ষেত্রে যেসব নতুন/সংশোধিত শর্ত এসেছে, তা নিম্নরূপ:
∙ নিরীক্ষা কমিটিতে সদস্য হিসেবে পূর্বে পর্ষদের সভাপতি এবং কমপক্ষে একজন স্বতন্ত্র পরিচালকসহ অন্যকোন পরিচালক থাকতে পারতেন। এখন নির্বাহী পরিচালকগণ এবং পর্ষদ সভাপতি নিরীক্ষা কমিটির সদস্য হতে পারবেন না। কমপক্ষে একজন স্বতন্ত্র পরিচালক এখনো থাকতে হবে।
∙ নিরীক্ষা কমিটির কোন সভা নিয়মিত সভাপতির অনুপস্থিতিতে নির্ধারিত কোরাম থাকা সাপেক্ষে উপস্থিত বাকী সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি মনোনীত করে উক্ত সভা পরিচানা করা যাবে।তবে নিয়মিত সভাপতির অনুপস্থিতির কারণ লিপিবদ্ধ করতে হবে।
৬। মনোনয়ন ও পারিশ্রমিক কমিটি (এনআরসি): এখানে নতুন শিরোনামের অধীনে ২৯টি নতুন শর্ত দেয়া হয়েছে, পাঁচটি উপ-শিরোনামে। নিচে প্রধান বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো: (১) পরিচালনা পর্ষদের প্রতি দায়িত্ব; (২) এনআরসি গঠন; (৩) এনআরসি-র সভাপতি; (৪) এনআরসি-র সভা; (৫) এনআরসি-র ভূমিকা। এনআরসি মূলতঃ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের এবং কোম্পানীর শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহীদের মনোয়নের নির্ণায়কসমূহ এবং তাঁদের পারিশ্রমিক প্রদানের বিষয়টি স্থির করবে এবং তার তদারকি করবে।
৭। বহি:স্থ বা বিধিবদ্ধ নিরীক্ষক: এক্ষেত্রে যেসব বিষয় নতুন এসেছে বা সংশোধিত হয়েছে, তা নিম্নরূপ:
∙ বহি:স্থ/বিধিবদ্ধ নিরীক্ষক স্বার্থ-সংঘাত সৃষ্টিকারী কোন সেবা দিতে পারবে না।
∙ উক্ত নিরীক্ষকের প্রতিনিধিকে শেয়ারগ্রহীতাদের প্রশ্নোত্তরের জন্য যে কোন শেয়ারগ্রহীতাদের সভায় (বার্ষিক বা অসাধারণ) উপস্থিত থাকতে হবে।
∙ উক্ত নিরীক্ষক সংশি¬ষ্ট কোম্পানীর কোন বিশেষ নিরীক্ষা করতে পারবে না।
৮। কোম্পানী কর্তৃক ওয়েবসাইট সংরক্ষণ: নতুন শিরোনামে এখানে নিচের তিনটি নতুন শর্ত এসেছে:
∙ স্টক এক্সচেঞ্জের সাথে সংযোগসহ কোম্পানীর একটি আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইট থাকতে হবে।
∙ তালিকাভুক্তির তারিখ থেকে কোম্পানীর ওয়েবসাইটকে সচল রাখতে হবে।
∙ স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্তির প্রবিধানমালা অনুসারে প্রযোজ্য বিষয়গুলির পূর্ণাঙ্গ তথ্য উক্ত ওয়েবসাইটে থাকতে হবে।
৯। কর্পোরেট পরিচালনের রিপোর্টিং ও পরিপালন: এক্ষেত্রে নতুন যে বিষয়টি এসেছে, তা হলো যে পেশাজীবী উক্ত পরিপালন সনদ দিবেন, তার নিয়োগ হতে হবে শেয়ারগ্রহীতাদের বার্ষিক সাধারণ সভায়।
উপসংহার:
নতুন প্রণীত কর্পোরেট পরিচালন কোড ২০১৮ সঠিকভাবে হৃদয়ে ধারন করে পরিপালন করলে, তালিকাভুক্ত কোম্পানীর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা সত্যিকারভাবেই সুশাসনের স্তম্ভগুলির উপর দাঁড়াবে। এ স্তম্ভগুলি হলো: ন্যায্যতা (fariness), জবাবদিহীতা (accountability), স্বচ্ছতা (transparency), এবং দায়িত্বশীলতা (transparency)। এর ফলে কোম্পানীর টেকসই উন্নয়ন যেমন ত্বরান্বিত হবে, তেমনি সুশাসনের সুনামে কোম্পানী পাবে একটি চিরস্থায়ী মর্যাদার আসন। নতুন কর্পোরেট পরিচালনা কোডটি তালিকাভুক্ত সকল কোম্পানী নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুশাসনের ভয়ে পরিপালন না করে, স্বেচ্ছায় পরিপালন করবে, সেই প্রত্যাশা রইল।
লেখক: কমিশনার, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)