
আর্থিক শিক্ষা (Financial Education) বলতে আমরা বুঝি, ‘‘যে পদ্ধতির মাধ্যমে আর্থিক বাজারে বিনিয়োগকারীগণ আর্থিক পণ্য, ধারণা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের উপলদ্ধি ও জ্ঞান বৃদ্ধি করতে পারে। তথ্য, নির্দেশনা এবং বাস্তবসম্মত পরামর্শের মাধ্যমে আর্থিক ঝুঁকি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সম্যক জ্ঞানের ভিত্তিতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিনিয়োগ সংক্রান্ত সহযোগিতার জন্য কোথায় যেতে হবে জানা এবং সর্বোপরি আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে বিনিয়োগকারীদের দক্ষতা ও ধারণা বৃদ্ধিই আর্থিক শিক্ষা। একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনে যে সকল আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় তার যথাযথ দক্ষ ও সচেতন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই আর্থিক শিক্ষার উদ্দেশ্য। এই জন্য আর্থিক শিক্ষার বিষয়বস্তু হবে আর্থিক বিষয়ে প্রাথমিক ধারণাসমূহ যেমন: মূল্যস্ফীতি, সাধারণ ও চক্রবৃদ্ধি সুদ, আর্থিক পণ্য ও খাতসমূহ নিজস্ব মূলধন ও ঋণের ব্যবহার, ঝুঁকি ও হ্রাসকরণের পদ্ধতি এবং আর্থিক পরিকল্পনার মূল বিষয়সমূহ ইত্যাদি।
বিনিয়োগ শিক্ষা (Investor Education) বলতে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে বিভিন্ন বিনিয়োগ পণ্য যাচাইপূর্বক সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনকে বুঝায়। যথাসময়ে সঠিক সঞ্চয় ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত বিনিয়োগকারী একদিকে যেমন নিজের ভবিষ্যৎ আর্থিক স্বচ্ছলতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে তেমনি আর্থিক বাজারের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দেশের অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধিতেও অবদান রাখতে পারে। আর্থিক শিক্ষা ও বিনিয়োগ শিক্ষা সমার্থক হলেও এর ব্যবহারিক পার্থক্য রয়েছে। এই শিক্ষা দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রচার করা এবং সাধারণ মানুষকে আর্থিক বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা প্রদান করাই হচ্ছে আর্থিক স্বাক্ষরতা (Financial Literacy)। একজন বিনিয়োগকারীর জীবনব্যাপি আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিতকরণে তার জ্ঞান ও দক্ষতার ভিত্তিতে আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাই হচ্ছে আর্থিক স্বাক্ষরতা।
২০০৭-২০০৯ সালে বিশ্ব আর্থনৈতিক বিপর্যয় পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে ১৫ কোটি নতুন গ্রাহক যুক্ত হচ্ছিল। যদিও পরবর্তীতে এই বৃদ্ধির হার কমে গেছে তথাপিও উল্লেখযোগ্যভাবে নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হচ্ছে। বিপুল জনসংখ্যার কারণে এর মধ্যে অধিকাংশ নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশসমূহে যেখানে বিনিয়োগ শিক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার উদ্যোগ এখনও প্রাথমিক অবস্থায়।
বিনিয়োগ পণ্য অদৃশ্য। অন্যান্য পণ্যের মতো এগুলিকে ধরা যায় না, স্বাদ গ্রহণ করা যায় না, অনুভব বা অন্য কোন ভাবেই দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা যায় না, সুতরাং বিনিয়োগ পণ্যের বৈশিষ্ট্য, ঝুঁকি এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত হওয়াই এগুলি বুঝার একমাত্র উপায়, বিনিয়োগ পণ্যের আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটির মেয়াদ, ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ফলাফল সম্পর্কে জানা যায় না। দীর্ঘসময় পরে মেয়াদ শেষে এর প্রকৃত ফলাফল লাভ করা যায়। এই দু’টি বৈশিষ্ট্যের কারণে বিনিয়োগ পণ্যের বিক্রেতা যদি এর সম্পূর্ণ বৈশিষ্ট্য এবং ক্রেতার উপর তার সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে প্রকাশ না করে এবং যদি দ্রব্যটি ক্রেতার আর্থিক অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয় তবে ক্রেতা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
সাধারণতঃ দু’টি কারণে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এবং আর্থিক পণ্যের উপর আস্থা হারাতে পারে। প্রথমতঃ যদি কোন ক্ষতিকর এবং বাজে ধরণের বিনিয়োগ দ্রব্যে বিনিয়োগ করে এবং দ্বিতীয়তঃ কোন বিনিয়োগ পণ্য যদি নির্দিষ্ট কোন ক্রেতার ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা এবং মনোভাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়। ক্ষতিগ্রস্থ বিনিয়োগকারী সঞ্চয় ও বিনিয়োগ মনোভাব পরিত্যাগ করে, আর্থিক বাজারে তারল্য হ্রাস পায় এবং সার্বিকভাবে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সুতরাং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার জন্য তাদের সুরক্ষা সংক্রান্ত আইনী কাঠামো প্রণয়নসহ সকল কর্মসূচী গ্রহণ অপরিহার্য। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা সংক্রান্ত পদক্ষেপসমূহ সাধারণভাবে নি¤œরুপঃ
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোঃ
বিনিয়োগকারীগণ যেন সকল প্রতিষ্ঠান থেকে যথাসময়ে সকল প্রকার আর্থিক সেবা বিষয়ক সহযোগিতা পায় তার ব্যবস্থা করা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ আর্থিক সেবা সংক্রান্ত একটি বিশেষায়িত বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা।
বিনিয়োগকারীদের অবহিতকরণ ও তথ্য প্রকাশঃ
বিনিয়োগ দ্রব্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ বিনিয়োগকারীদের কাছে সহজ ও বোধগম্যভাবে প্রকাশ করা।
কোন নির্দিষ্ট প্রকার বিনিয়োগ দ্রব্যের চুক্তিপত্রের শর্তাবলী সংক্ষিপ্ত আকারে একটি আদর্শ ছকে প্রকাশ করা।
এই ধরণের চুক্তির শর্তাবলী কোন পেশাগত সংস্থা দ্বারা প্রস্তুত করা যা উক্ত সংস্থা কর্তৃক এর সদস্যসমূহকে ব্যবহারের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
বিক্রেতা কর্তৃক পূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে এবং কোন গুরুত্বপূর্ণ ও বস্তুগত তথ্য গোপন করা হয় নাই এই মর্মে অঙ্গীকার প্রদান করা ।
প্রকাশিত তথ্য প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবসম্মত হতে হবে এবং দ্রব্যটির সকল প্রকার বৈশিষ্ট্য এবং কোন ধরণের বিনিয়োগকারীর জন্য প্রস্তুতকৃত তা প্রকাশ করতে হবে। শুধুমাত্র গুণাবলী প্রকাশ করে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা যাবে না।
ব্যবসা পরিচালনাঃ
আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত এবং নিবন্ধিত হতে হবে। যে সকল ব্যক্তি আর্থিক সেবা বা আর্থিক দ্রব্য বিক্রয়ের কাজে নিয়োজিত থাকবেন তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে এবং এই কাজ সম্পাদনের জন্য সনদ গ্রহণ করতে হবে।
প্রতারণামূলক বা অসাধু কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য হতে হবে।
আর্থিক সেবা প্রদানকারী এবং আর্থিক দ্রব্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানসমূহের যথাযথ ও সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে দায়ী করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যাদির গোপনীয়তা রক্ষা এবং স্বীয় তথ্যাদি পরীক্ষার অধিকার থাকতে হবে।
এই সকল প্রতিষ্ঠানসমূহের অভ্যন্তরীণ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দ্বারা স্বার্থ-সংঘাতপূর্ণ কার্যাবলী বন্ধের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনঃ
আর্থিক সেবা প্রদানকারী এবং আর্থিক দ্রব্যাদি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। মানসম্মত আর্থিক বিবরণী প্রকাশ, মালিকানার প্রভাবমুক্ত পেশাদারী পরিচালনা, সেবা গ্রহণকারী এবং বিনিয়োগকারীদের অধিকার সংরক্ষণ এবং পূর্ণ তথ্য প্রাপ্তিÍর নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এই সকল প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, কর্মরত এবং সর্ম্পকযুক্ত ব্যক্তিবর্গের সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি থাকতে হবে এবং তা পরিপালনের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অভিযোগ নিস্পত্তি:
আর্থিক সেবা গ্রহণকারী এবং আর্থিক বিনিয়োগকারীরা কোন কারণে সংক্ষুদ্ধ হলে সংশ্লিষ্ট স্তরসমূহে অভিযোগ গ্রহণ এবং দ্রুত নিস্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রমে বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্থ হলে দায়ী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কর্তৃক ক্ষতিপূরণ এবং দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
নিয়ন্ত্রকের নজরদারীঃ
নিবন্ধনকৃত আর্থিক সেবা প্রদানকারী ও অনুমোদিত আর্থিক দ্রব্যাদি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে এবং সংশ্লিষ্ট আইন পালন করছে কিনা তা নিয়ন্ত্রকের যথাযথ নজরদারীতে থাকতে হবে এবং ব্যত্যয়সমূহের বিরুদ্ধে যথাসময়ে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বিনিয়োগ শিক্ষাঃ
উপরের বিষয়গুলি আর্থিক বাজারে সু-শাসন ও মানসম্মত কার্যক্রম নিশ্চিতকরণের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক আইনগত কাঠামো প্রণয়ন ও তদারকীর মাধ্যমে নিশ্চিত করা গেলেও সুরক্ষার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে বিনিয়োগকারীর মনোভাব ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। উপযুক্ত সময়ে যথাযথ বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে কোন বিনিয়োগকারী কোন মানস্মত বিনিয়োগ দ্রব্যে বিনিয়োগ করে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে আবার একই দ্রব্যে উপযুক্ত সময়ে যথাযথ পরিমাণ বিনিয়োগ করে আরেকজন বিনিয়োগকারী লাভবান হতে পারে। এই কারণে বাহ্যিক প্রভাবের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষমতা তার আর্থিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। বিনিয়োগকারীর এই সক্ষমতা অর্জনের সহায়ক হিসেবে কাজ করে যথাযথ বিনিয়োগ শিক্ষা।
আর্থিক বাজারে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আর্থিক দ্রব্য সংযোজিত হচ্ছে এবং ক্রমাগত এদের বৈশিষ্ট্য সমূহ জটিল আকার ধারণ করছে। এই জটিল বৈশিষ্ট্যের আর্থিক দ্রব্য বিনিয়োগকারীদের কাছে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করার পাশাপাশি তাদের বিনিয়োগ সংক্রান্ত সাধারণ ধারণা প্রদানের মাধ্যমে সঠিক মনোভাব ও অভ্যাস গড়ে তোলা এবং বিনিয়োগ দক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য প্রয়োজন যথাযথ বিনিয়োগ শিক্ষা। বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন বিনিয়োগকারী তার নিজের পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারে এবং সচেতন বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি আর্থিক বাজারে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল এবং প্রতারণামূলক আর্থিক দ্রব্যাদির প্রচলন কমিয়ে দিতে পারে।
বিনিয়োগ শিক্ষা থেকে মূলতঃ সাধারণ বিনিয়োগকারীগণ উপকৃত হয়ে থাকেন। অন্যান্যের মধ্যে তারা জেনে-বুঝে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সুবিন্যস্ত আর্থিক এবং অবসর জীবনের পরিকল্পনা প্রণয়ন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিক আস্থা অর্জন, অধিক সঞ্চয় ও বিনিয়োগ অভ্যাস গড়ে তোলা, সম্পদের সুষম ব্যবহার এবং বিনিয়োগকারীদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে অধিক সচেতনতা অর্জন করতে পারেন। আর্থিক বাজারে তথ্যের অসামঞ্জস্যতা দূরীকরণে আইনী কাঠামো ও তদারকীর পাশাপাশি বিনিয়োগ শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। উদাহরণস্বরুপ বিনিয়োগ শিক্ষা একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীদের বাজে বিনিয়োগ দ্রব্য ও সেবা ক্রয়ে বিরত রাখে অপরদিকে তেমন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সিকিউরিটিজ ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান সমূহকে বাজে বিনিয়োগ সেবা ও দ্রব্য বিক্রয়ে নিরুৎসাহিত করে। বিনিয়োগ শিক্ষা সঠিক বিনিয়োগ দ্রব্য ও সেবা নির্ধারণ, প্রতারণামূলক, অসাধু, অনিয়ন্ত্রিত কার্যাবলী চিহ্নিত করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে। বিনিয়োগ শিক্ষা নিম্নোক্তভাবে বিনিয়াগকারীদের সচেতনতা ও সুরক্ষা বৃদ্ধি করে থাকেঃ
আর্থিক বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা প্রদানঃ
বিনিয়োগকারীদের সরল ও চক্রবৃদ্ধি সুদ, মূল্যস্ফীতি, ঝুঁকি ও এর ব্যবস্থাপনার কৌশল, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের বিভিন্ন খাত ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা প্রদানের মাধ্যমে তাদের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বিনিয়োগ পণ্য ও সেবার বৈশিষ্ট্য, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও মুনাফা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিষয়ে ধারণা প্রদানঃ
বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন বিনিয়োগপণ্য ও সেবার বৈশিষ্ট্যসমূহ, সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিসমূহ এবং বিনিয়োগ ও মুনাফা প্রাপ্তির মেয়াদ ও সম্ভাবনা এইসব বিষয়ে সম্যক ধারণা প্রদান করা।
উপযুক্ততা নির্ধারণঃ
কোন বিনিয়োগকারীর আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা, বিনিয়োগের সঠিক মেয়াদ ইত্যাদি নির্ধারণপূর্বক তার জন্য কোন ধরণের বিনিয়োগ উপযুক্ত তা নির্ধারণে সহযোগিতা করা।
আর্থিক পরিকল্পনা প্রণয়নঃ
একজন বিনিয়োগকারীর আয়-ব্যয়, সম্পদ, জীবনের বিভিন্ন স্তর ও সময়ে অর্থের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার, বিনিয়োগ বিন্যস্তকরণ ও তা থেকে ভবিষ্যত আয় ইত্যাদির ভিত্তিতে কয়েকটি বিকল্প আর্থিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং এইগুলির মধ্যে সবচাইতে উপযুক্ত পরিকল্পনাটি গ্রহণ করা।
বিনিয়োগকারীদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানা:
বিনিয়োগ শিক্ষা বিনিয়োগকারীদের আর্থিক বাজারের আইন-কানুন, বিভিন্ন ধরণের বিনিয়োগে তাদের অধিকার, করণীয় ও বর্জনীয় বিভিন্ন বিষয়ে অবহিত করে থাকে।
আর্থিক প্রতারণা ও প্রলোভন থেকে সুরক্ষাঃ
বিনিয়োগ শিক্ষার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন ধরণের আর্থিক প্রতারণা, স্বল্প-সময়ে অধিক মুনাফা লাভ, ঝুঁকিহীন বিনিয়োগ ইত্যাদি প্রলোভন সম্পর্কে জানতে পারে এবং এসব থেকে সাবধান থাকতে পারে।
অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ থেকে সুরক্ষাঃ
বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় তাদের ঝুঁকি ধারণের ক্ষমতা ও ঝুঁকি গ্রহণের মনোভাব যাচাই না করে ক্ষমতাতিরিক্ত বিনিয়োগ দ্রব্যে বিনিয়োগ করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আবার ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের পুরোটা এমনকি ঋণকৃত অর্থ বিনিয়োগ করে অধিক ঝুঁকি গ্রহণ করে থাকে। বিনিয়োগ শিক্ষা এই ধরণের সাধ্যাতিরিক্ত ঝুঁকি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে থাকে।
যাচাই বাছাই ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধিঃ
বিনিয়োগ শিক্ষা বিভিন্ন স্তরের বিনিয়োগকারীদের আর্থিক দ্রব্য সংক্রান্ত তথ্য ও শর্তাদি বুঝা এবং আর্থিক বিবরণীর সাধারণ বিষয়সমূহের ব্যাখ্যা উপলদ্ধি করার সাধারণ পদ্ধতি অবহিত করে থাকে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা জেনে-বুঝে, বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।
অভিযোগ দাখিল ও সংক্ষুদ্ধতা নিরসনের উপায় জানাঃ
বিনিয়োগকারীরা যখন কোন কারণে সংক্ষুদ্ধ হয় তা নিরসন এবং সু-বিচার প্রাপ্তির অধিকার এবং পদ্ধতি বিনিয়োগ শিক্ষার মাধ্যমে জানতে পারে।
বিনিয়োগ সংস্কৃতি ও মনোভাবের পরিবর্তনঃ
বিনিয়োগ শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সংক্রান্ত ভুল ধারণা ও অভ্যাস পরিবর্তন করে তাদেরকে সঠিক বিনিয়োগ সংস্কৃতি ও মনোভাব আয়ত্ব করানো। এই পরিবর্তনের জন্য বিনিয়োগ শিক্ষা বিস্তারকে একটি সামাজিক প্রচারণায় রূপদান করা প্রয়োজন।
গুজব থেকে সুরক্ষাঃ
বিনিয়োগকারীদের গুজবের ভিত্তিতে বিনিয়োগের অভ্যাস পরিত্যাগ করিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যাদি বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজস্ব বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য বিনিয়োগ শিক্ষা ভূমিকা পালন করে।
অন্যকে অনুসরণ করা থেকে সুরক্ষাঃ
বিনিয়োগকারীদের একটি সাধারণ অভ্যাস হচ্ছে বড় বিনিয়োগকারীদের অনুসরণ করে বিনিয়োগ করা যা তাদেরকে প্রায়শঃ ক্ষতির সম্মুখীন করে থাকে। বিনিয়োগ শিক্ষা বিনিয়োগকারীদের সঠিক পথচলার উপায় বাতলে দেয়।
সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষাঃ
বিনিয়োগ শিক্ষা সকল বিনিয়োগকারীর সমান অধিকার, তথ্য প্রাপ্তির অধিকার, মতামত প্রদানের অধিকার ইত্যাদি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে থাকে।
উল্লেখিত বিষয়গুলি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সঠিক বিনিয়োগ শিক্ষাই বিনিয়োগকারীদের সচেতন করার মাধ্যমে তাদের স্বীয়-সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি আর্থিক বাজারে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রকদের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্যমে বাহ্যিক ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা প্রদান করা যায়।
লেখক: মাহবুবুল আলম, নির্বাহী পরিচালক,
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)