Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Tuesday, 28 Jul 2026 02:18
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

মো.জাভেদ হাকিম:  মাহেন্দ্রক্ষণ এক দিবাগত রাতে, নানা হুলুস্থুল আর সদরঘাটের যানজট ঠেলেঠুলে চড়ি গিয়ে ভোলার বেতুয়াগামী জাহাজে।

দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুরা বরাবরের মতো এবারও রোমাঞ্চকর অভিযানের অংশ হিসেবে প্রমত্তা মেঘনা নদীর মোহনায় জেগে উঠা এক চর বেছে নিয়েছিলাম। চরটির চারদিকেই অথৈ পানি। শুধু মাঝে এক খন্ড খালি জমি। যত দূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি।সাগর ভেবে অনেকেই ভুল করবেন। সকাল ৮টয় বেতুয়া হতে ট্রলারে চেপে ঠিক সন্ধ্যায় গিয়ে পৌছি। মাঝে শুধু ঢালচরে ছিল জুম্মার বিরতি। নামাজ শেষে কিছুটা সময়, ছবির মতো সুন্দর গ্রাম গুলো ঘুরে ঘুরে দেখি।নদী পারের নারকেল-খেজুর বিথী নজড় কেড়ে নেয়। পাকা ধানের আটি কৃষকের মাথায় বয়ে চলার দৃশ্য আর সবুজে ঘেরা চারপাশ সৃষ্টি করেছে এক ভিন্ন জগত। যে ভূবনের মানুষগুলো অধিকাংশই সাদা মনের।শহুরেদের মত নেই কোন আহামরি বিলাসিতা। বরং আমরাই গ্রাম্য লাজুক তরুণী স্বপ্নাকে দেখে দিবা স্বপন দেখি।  নিপাত যাক সেসব আঠালো-রসালো কাহিনী ।

ঘুরাঘুরির ফাঁকে স্থানিয় কিছু মানুষের সাথে বেশ আলাপ জমে। তাঁরা যখন শুনল আমরা ভোলার সর্ব দক্ষিণে শিপচরে রাত্রি যাপন করব তখন নানান ভয়ানক বাণী শুনাতে থাকল। তাদের সাবধান বাণীতে আমাদের কয়েকজন নতুন মুখ ভয়ে কুকড়ে উঠল। কিন্তু না গিয়ে উপায় নেই। কারণ দে-ছুট এর সংবিধান মেনেই সঙ্গী হয়েছেন। সুতরাং পিছু হটার সুযোগ নেই। আমাদের দুঃসাহসিক অভিযানের কথা শুনে মানুষ বাড়তে থাকল। মাঝির ভাবসাবও খুব ভাল ঢেকছিল না। তার ভাষ্য রাতে থাকবেন কেমনে? জোয়ারে চর তলিয়ে যায়। তরিৎ সিধ্বান্তে অবাঞ্চিত জটলা আর ফাও খাজুরা প্যাচাল এড়ানোর জন্য দ্রুত শিপচরের পথে-  ট্রলার ছাড়তে বলি। চতুর মাঝি বেরাজি মনে ট্রলার ছাড়ে।  আমারা ভেসে চলছি কখনো ঘোলা জলে কখনো সচ্ছ জলে আবার কখনোবা নীলাভ জলে সাদা বক, পান কৌড়ি, কানিবকসহ নানান পাখির উড়াউড়ি,ডলফিনের লুকোচুরি, সি গালের খুনসুটি সঙ্গী করে শুধু ভেসেই চলছি। সাথে নদী থেকেই জেলেদের কাছ থেকে কেনা, তাজা মাছের ধুমধামে রান্না আর খাওয়া দাওয়াত চলছেই। একটা সময় দৃষ্টির সিমানা থেকে হারিয়ে গেল বসত ভিটার চরগুলো। আশে পাশে  আর কোন নৌযানও নেই। প্রকৃতির পিনপতন নিরবতা। হঠাৎ চোখে ধরা দেয় এক ঝাক পরিযায়ীর, ডুবন্ত চরে অবাধ বিচরণের নয়ন জুড়ানো দৃশ্য। ঘড়ির কাটায় তখন বিকেল প্রায় পৌণে পাঁচটা। তেজোদীপ্ত সূর্যটাও ওইদিনের জন্য, লাল আভা ছড়িয়ে অথৈ নোনা জলে ডুব দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। সে এক অন্যরকম অপার্থীব সুখ সুখ ভাব সবার মাঝে। প্রায় আড়াই ঘন্টা ট্রলার চলার পর ঠিক সন্ধ্যায় সেই কাঙ্খিত সপ্নের শিপচরের দেখা মিলে। উচ্ছ্বাসে সবাই গদগদ। ভাটা থাকায় চর থেকে কিছুটা দূরে মাঝি নোঙ্গর গাড়ে।আমরা একে একে সিঁিড় বেয়ে এক হাটু শীতল জলে নেমে চরে গিয়ে উঠি। সবার মাঝে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করল। যেন হানাদার হটিয়ে এই মাত্রই শিপচর বিজয় করেছি। ফিতা বিহীন মোবাইল ক্যামেরায় হরেক আইটেমের ফটোসেশনে সবাই মহা ব্যস্ত। দেড় যুগ আগের মত যদি ফিতা ক্যামেরা নিয়ে ঘুরতে যেত, তাহলে বেহুদা ডঙ্গে ফটো তোলার মজা কারে কয় তা টের পাইতে সময় লাগত না। ঘোর অন্ধকার হবার আগেই,সংগঠনের আগামীর অহংকার এক তরুণকে পাঠানো হল তাঁবু গাড়ার জায়গা নির্ধারণ করার জন্য।তার দেখানো মত জায়গাতেই রোহিঙ্গা স্ট্যাইলের তাঁবু ফেললাম। রান্না ও বার বি কিউ’র জন্য শুরু হল দৌড় ঝাপ। কেউবা লাকড়ি যোগারে ব্যস্ত। সারা রাত চলবে ক্যাম্পফায়ার। আমরা ছাড়া আর কোন মানবের অস্থিত্ব নেই আজ এই চরে। তবে দানবের পদচারণা যে থাকবে না তা কিন্তু শিওর বলা যাবে না।চাদ বিহীন আকাশে তারার মেলা। বাড়তি পাওনা, সেরাত ছিল উল্কা বৃষ্টি দেখার সুবর্ন সুযোগ। সেই সঙ্গে বেসুর গলায় গান-বাদ্য আর বার বি কীউ চলল সমান তালে।পুরো একটি চরে শুধুই “দে-ছুট” এর দামালেরা। ভাবতেই অন্যরকম ভাললাগা মনে দোল দেয়ে। রাত একটায় তাঁবুতে ঢুকি। দুই ঘন্টা বাদেই রাত প্রায় তিনটায় তাঁবু ছেড়ে বাহিরে আসি।চারপাশ নৈঃশব্দ। অন্ধকারেরও যে আলো আছে তা এখানে বুঝা যায়। আকাশ পানে তাকিয়ে দেখি লক্ষ-কোটি তারার আসর। ভোকাল আইয়ুব বাচ্চুর, সেই তারা ভরা রাতে/ আমি পারিনি বুঝাতে / তোমাকে আমার মনের কথা। ছাত্র জীবনে শোনা গানের কথা গুলো মনে পড়ে যায়। গার্ল ফ্রেন্ড আঁখী আমাকে ফিতাওয়ালা ওডিও ক্যাসেটটি গিফট করেছিল। জানি না ওর মনে কি ছিল। শিপচরের রাতের সাময়িক মুহূর্ত গুলো, জীবদ্বশায় এক অন্যরকম স্মৃতি হয়ে মনের গহীনে গেঁথে রয়।বেশ কিছুক্ষণ বাহিরে থেকে বাতাসের তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে আবারো তাঁবুতে ফিরি । ক্লান্তি দূর করতে ঘুমানোর চেষ্টা কিন্তু শিপন সাহেব তার বউর সাথে সেল ফোনে যেই না রসালো আলাপ জুড়ালো ওমনি যেন সবার ঘুম প্রতিবাদ জানাতে মেঘনার পানিতে ডুব দিল। রাত পোহালো।

চরে থাকা পাখ পাখালির কিচিরমিচিরে ভোরের আলো ফুটে। ধীরে ধীরে পূর্ব দিগন্তে নীলাভ আসমান রক্তিম সূর্যোদয়। সূর্যটা দেখে মনে হয় যেন আস্ত একটা আগুনের কুন্ডলি জলের বুক চিরে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। সে এক অন্যরকম শিহরণ জাগানো অনুভূতি।আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি। চরের বুকে তুলে ধরি লাল সবুজের পতাকা। দক্ষিণা হাওয়ায়  লাল-সবুজের পতাকা পতপত করে উড়ে।

ভৌগলিক অবস্থানে নজরকাড়া সৌন্দর্যের এই চরের আয়তন জানার সুযোগ হয় নাই, গুগোল ম্যাপেও পাই নাই। নদীরপার দেখলে মনে হবে যেন এটা কোন সমুদ্র তীর।  চরটির নামকরণ সম্পর্কে যতটুকুন জেনেছি, আজ হতে বহু বছর আগে নাকি বিদেশী এক শিপ এখানে আটকা বা ডুবে গিয়েছিল। সেই থেকেই নাকি এর নাম শিপচর। নাম দিয়ে কাম নাই। সরকার যদি শিপচরের প্রতি দৃষ্টি দেন, তাহলে স্বল্প আয়ের ভ্রমণ পিয়াসিরা দূর দেশের দ্বীপ গুলোতে যেতে না পারার বেদনা- অনেকটাই ঘুচাতে পারবেন প্রকৃতি হতে প্রাপ্ত, আমাদের এই শিপচর ভ্রমণে।

যাবেন কী ভাবেঃ- ঢাকার সদরঘাট নৌ-টার্মীনাল হতে রাত ৮টা ও ৮টা ৩০ মিনিটে ভোলার বেতুয়া’র উদ্দেশ্যে জাহাজ ছেড়ে যায়।ভাড়া ডাবল কেবিন ১৬০০/=ও সিঙ্গেল কেবিন ৯০০/=টাকা। এছাড়া ডেকে মাত্র ১৫০/=টাকা। বেতুয়া হতে চরফ্যাসন বাজার যাবেন মটরবাইক বা অটো’তে।সেখান থেকে আবারো যে কোন বাহনে চড়ে কচ্ছপিয়া ঘাট। ঘাট হতে গিয়ার ওয়ালা রিজার্ভ ট্রলারে শিপচর।ভাড়া নিবে দৈনিক ৪/৫ হাজার টাকা।  বসা যাবে একত্রে ২৫/৩০ জন।হাতে তিন দিনের সময় ও বেতুয়া হতেই ট্রলারে চাপলে, সব চাইতে বেশী সুবিধা হবে।

থাকবেন- খাবেন কোথায়ঃ-শিপচরে কোন বসতি নেই সুতরাং তাঁবু বাস বা ট্রলারই ভরসা।  হাট-বাজার নেই। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার পানি ও ওষুদসহ রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে এবং বাজার সদাই করেই ট্রলারে উঠবেন। তবে আগেই মাছ কেনার দরকার নেই। নদীতে থাকা জেলে নৌকা হতে সুলভ মূল্যে নানান পদের মাছ কিনে রসনা মিটাতে পারবেন।

(জাভেদ/শামীম/ ২৬ আগস্ট ২০১৮)