
মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, নরসিংদী: সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দফায় দফায় দাম বৃদ্ধির ফলে অস্থিতিশীল সুতার বাজার ও বিদেশি কাপড় আমদানির ফলে লোকসান গুনছেন নরসিংদীর টেক্সটাইল শিল্প মালিকরা। বছরের পর বছর ধরে লোকসানের মুখে পড়ে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে এই শিল্প। নরসিংদীতে টেক্সটাইল শিল্পকে বাঁচাতে অবাধে কাপড় আমদানি বন্ধ ও সরকারিভাবে সুতার দাম নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন টেক্সটাইল শিল্প মালিকরা।
বস্ত্রশিল্পে নরসিংদী জেলার রয়েছে সোনালি ইতিহাস। ‘প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার’খ্যাত বাবুরহাটের (শেখেরচর) অবস্থানও এ জেলায়। বর্তমানে দেশীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কাপড় নরসিংদীর টেক্সটাইলে উৎপাদন হয়ে থাকে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। এখানকার বেশিরভাগ বস্ত্র ব্যবসায়ী বংশ পরম্পরায় কাপড় উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। একসময় জেলার প্রায় প্রতি গ্রামেই হস্তচালিত তাঁতের মাধ্যমে বোনা হতো শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, বিছানার চাদর। কালের বিবর্তনে হস্তচালিত তাঁতকল অনেকটাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে তার স্থান দখল করে নিয়েছে যন্ত্রচালিত তাঁতকল। এখন এ জেলায় উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রচালিত তাঁতে তৈরি হচ্ছে থ্রি-পিস, শার্টপিস, শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, বিছানার চাদরসহ অন্যান্য দেশীয় কাপড়।
কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নরসিংদী জেলায় ছোট-বড় টেক্সটাইল শিল্পের সংখ্যা ১ হাজার ৫ শ’। আর এসব কারখানায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারীসহ সুতা, রং, কাপড় ব্যবসায়ীসহ প্রিন্টিং ও ফিনিশিং কারখানাগুলো।
দীর্ঘদিন ধরে দফায় দফায় সুতার দাম বৃদ্ধির ফলে এসব টেক্সটাইল মিলগুলোতে কাপড়ের উৎপাদন খরচ বাড়লেও দেশীয় বাজারে বাড়েনি কাপড়ের দাম। শিল্প মালিকদের অভিযোগ, সরকারের তদারকি না থাকায় দিনের পর দিন সুতা ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে তার মাধ্যমে নানা অজুহাতে বাড়ানো হচ্ছে সুতার দাম। এছাড়াও রংয়ের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক দফায়। এতে বছরের বেশির ভাগ সময়ই লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
এছাড়া অবাধে বিদেশি কাপড় আমদানির ফলে অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না উৎপাদিত দেশীয় কাপড়। অস্থিতিশীল সুতার বাজার ও বিদেশি কাপড় আমদানির কারণে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে জেলার ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প। বছরের পর বছর ধরে টেক্সটাইল শিল্পের অব্যাহত এ মন্দাভাবের কারণে ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানা গড়ে তোলা শিল্প উদ্যোক্তারা পড়েছেন বিপাকে।
নরসিংদী ডিআরপি টেক্সটাইলের মালিক সুশিল কুমার সাহা বলেন, ‘আমরা যারা ক্ষুদ্র টেক্সটাইল শিল্পের মালিক তারা বেশি বিপাকে পড়েছি। বিদেশি কাপড়ের প্রভাব ও সুতার দাম বাড়ায় কাপড় উৎপাদন খরচ না উঠে আসায় লোকসান গুনেই যাচ্ছি। ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানা গড়ে তোলার কারণে বন্ধও করতে পারছি না।’
মাধবদীর টেক্সটাইল শিল্প মালিক শফিকুল ইসলাম, শেখ মোহাম্মদ রুমন, মকবুল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন শিল্প মালিক জানান, ক্রমাগত বেড়ে চলেছে সুতার দাম। এটা নিয়ন্ত্রন করতে সরকারী ভাবে কোন তদারকি নেই। যার ফলে যখন-তখন আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম বৃদ্ধির অজুহাতে সুতার দাম বেড়ে যায়। কিন্তু সে তুলনায় কাপড়ের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। বছরের বেশির ভাগ সময়ই সুতার দাম বেড়ে থাকে বলে দাবি তাদের। এর পেছনে সুতা ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট থাকতে পারে বলে মনে করেন তারা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মাধবদী বাজারের সুতা ব্যবসায়ী বিনয় দেবনাথ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম বাড়াসহ নানা কারণে সুতার দাম বেড়ে থাকে, আবার কমেও যায়। এখানে সিন্ডিকেট বলে কিছু নেই। সুতা ব্যবসায়ীরা দেশের সুতা উৎপাদনকারী স্পিনিং মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সুতার দাম নির্ধারণ করে থাকেন।’
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সুতার বাজার স্থিতিশীল ও বিদেশি কাপড় আমদানি না হলে টেক্সটাইল শিল্প টিকিয়ে রাখা যাবে। টেক্সটাইল শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তুলার দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুতার দাম নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন সময়ে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে আসছি। আশা করি সরকারের আসন্ন টেক্সটাইল নীতিমালায় এসব বিষয় থাকবে।
(এসএইচআর/এসএএম/ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮)