Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Monday, 15 Jun 2026 17:27
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, বিনিয়োগবার্তা, নরসিংদী: নরসিংদী জেলার ৬টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের  ছাতার মতো গড়ে উঠেছে প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতাল। আর এ সব ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো  সরকারী স্বাস্থ্য সেবার দৈন্যদশাকে কাজে লাগিয়ে কিছু পুঁজিপতি  ও ডাক্তার মিলে ক্লিনিকের নামে চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ বাণিজ্য। ফলে সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিরাজ করছে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা ।

নরসিংদী স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলার ৬ টি উপজেলায় নিবন্ধিত প্রাইভেট ক্লিনিক রয়েছে ৪৮ টি  ও অথচ বাস্তবে রয়েছে দেড় শতাধিক প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতাল। এসব ক্লিনিক বা প্রইভেট হাসপাতালগুলোতে মানা হচ্ছে না সময়োপযোগী সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতাল সংক্রান্ত শর্তসমূহ না মানার কারণে তদারকি কর্মকর্তা ও কর্মচারীচারীরা হয়ে পড়ছে দূর্নীতিগ্রস্থ। অপরদিকে দালালদের দৌরাত্ম্যে ক্লিনিক মালিকদের সেবা প্রদানের মনোভাব না থাকায় এবং স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীলদের তদারকির, সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারীদের যোগ্যতা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে নরসিংদী প্রাইভেট ক্লিনিক সমূহে রোগিদের সেবা প্রাপ্তির চেয়ে প্রতারিতই হচ্ছে বেশী। আর এ কারণে নরসিংদীর বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে ভুল চিকিৎসায় ঝড়ে যাচ্ছে তাজা তাজা প্রাণ।

বিগত বছরগুলোতে ব্রিটিশ বাংলা হাসপাতাল লি:, সুপ্রীম জেলারেল প্রাইভেট হাসপাতাল, জমজম জেলারেল প্রাইভেট হাসপাতাল, মুক্তি জেলারেল হাসপাতাল, ন্যাশনাল জেনারেল  এন্ড চাইল্ড হাসপাতাল, ওয়েলকাম হাসপাতাল, দাস্তগীর মেডিকেল সেন্টার এন্ড হাসপাতাল ও সততা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগির মৃত্যু ঘটেছে বেশ কয়েক জনের।

জানা যায়, ক্লিনিক ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই পেশায়  চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, সরকারী চাকুরিজীবি ও বিভিন্ন পেশায় প্রভাবশালী ব্যাক্তি হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ অনিয়মগুলো নিয়ন্ত্রন করতে পারছেনা। আবার কখনো কখনো নির্বিকার ভূমিকার পালন করছে বলে ভুক্তভোগি সাধারণ মানুষ জানায়।

সরকার প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোর নিয়ম শৃঙ্খলার জন্য ১৯৮২ সালে এক অধ্যাদেশ জারি করে। এ অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বেসরকারী হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে প্রতি ১০ শষ্যায় একজন করে ডাক্তার ও তিনজন করে নার্স এবং শষ্যা প্রতি ৮ বর্গফুট স্থান বরাদ্ধ রাখতে হবে কিন্তু প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো তা মানছে না। অধ্যাদেশ অনুযায়ী সব ধরণের ফি, পরীক্ষা চার্জ, শয্যা ভাড়ার প্রকাশ্য তালিকা রাখার বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

ক্লিনিক ব্যবসায়ীদের নীতিমালায় আরো আছে প্রত্যেকটি ক্লিনিক সরকারী প্রকৌশলি কর্তৃক প্রদত্ত ডিজাইন মোতাবেক সুস্থ সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে তৈরি হতে হবে। সরকারের অনুমতি বা রেজিষ্টেশন করে কার্যক্রম শুরু করতে হবে এবং প্রতি বছর রেজিষ্টেশন নবায়ন করতে হবে। অথচ নরসিংদীতে ক্লিনিক মালিকরা এ শর্ত পূরন না করে শহরের অলিগলিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গড়ে তুলছে প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতাল। প্যাথলজি ক্লিনিকের জন্য মেডিকেল অফিসার, অভিজ্ঞ প্যাথলজিষ্ট, ডিপ্লোমাধারী টেকনিশিয়ান, রাসায়নিক সংরক্ষনাগার, ক্লিনিকের যাবতীয় যন্ত্রপাতিসহ স্বাস্থ্য দপ্তরের মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত অনুমতিপত্র থাকা বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ক্লিনিক তা অমান্য করে স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু অসাধু লোকজনকে মাসোহারা দিয়ে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়াও অস্ত্রোপাচারের ক্লিনিকের জন্য পরমানুশক্তি কমিশনের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও বেশীরভাগ ক্লিনিকগুলো তা মানছেনা। ক্লিনিকের জন্য ২০ ইঞ্চি পুরুত্বের দেয়ালসহ কক্ষের দরজা-জানালায় লেদে ও সিটের প্রটেকশন দেওয়ার বিধান রয়েছে। ডিপ্লোমাধারী টেকনিশিয়ান মেশিন অপারেটিং করার সময় লেদ সিটের এ্যাপ্রোণ ও হাতে লেদের গ্লাবস রেডিয়েশন জেড মিটার পড়ার বিধান রয়েছে কিন্তু বাস্তবে এ সব মানা হচ্ছেনা। সব কিছু মিলে নরসিংদী স্বাস্থ্য বিভাগ হয়ে পড়েছে অভিভাবকহীন দূর্নীতি ও বেড়া জালের আখড়া ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাইভেট হাসপাতালে কর্মরত এক ব্যাক্তি জানান, হাসপাতালে কেউ চিকিৎসার জন্য আসলে চিকিৎসা দেবার আগেই কৌশলে জেনে নেওয়া হয় রোগির অর্থনেতিক অবস্থা । সে অনুযায়ী রোগির চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে বাড়ী যাবার সময় মোটা অংকের বিল ধরিয়ে দেওয়া হয় রোগীর হাতে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে চিকিৎসার আগেই রোগির সাথে বিলে ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হন। এতে করে অনেক মুমূর্ষ রোগি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সরকারী হাসপাতালগুলোর ওপর আস্থা হারানো জেলার সাধারণ মানুষগুলো উপায়ন্তর না পেয়ে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিক/ হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের ভুতুরে বিল আদায়ের পরও সার্ভিসের নামে ১৫/২০% টাকা যোগ করা হয়। এছাড়া ৩% ভ্যাট তো আছেই। অপারেশনের রোগিদের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিল আদায় করা হয়। উল্লেখ্য এসব বিলে একটা মোটা অংশ হচ্ছে ল্যাবরেটরী পরিক্ষা-নিরীক্ষার বিল। তবে কোন রোগি যদি চিকিৎসার পূর্বে বিলের চুক্তিবদ্ধ হয় সে ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় পরীক্ষার বেশী করানো হয়না।

এদিকে জেলার সরকারী হাসপাতালগুলোতে কোন জরুরি রোগিকে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত অনেক ডাক্তারই বলে এ হাসপাতালে রোগির চিকিৎসা দেওয়া যাবেনা। আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা নিতে হবে বা কোন প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। রোগির সাথে আসা লোকজন কোন ঝুকি না নিয়ে নিরুপায় হয়ে ডাক্তারের পরামর্শে তাদেরই পছন্দের ক্লিনিক/ হাসপাতালে ভর্তি । পরে দেখা গেল ওই ডাক্তারই সেখানে গিয়ে তার চিকিৎসা দিচ্ছে।

সিজারিয়ান রোগিদের ক্ষেত্রে ক্লিনিক/হাসপাতাল গুলোর সাথে ইউনিয়ন  ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারীভাবে কমিউনিটি হেথ প্রোফাইটর এবং পরিবার পরিকল্পনা সহকারীদের কমিশনের ভিত্তিতে চুক্তিবদ্ধ থাকে। তারা তাদের অবস্থানে থেকে প্রথমে রোগিদের ব্রেন ওয়াশ করে ফেলে প্রাইভেট হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে যাবার ব্যাপারে। পরবর্তীতে তাদের পছন্দসই প্রতিষ্ঠানেই রোগিদেরকে প্রেরণ করে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সিভিল সার্জন ডা: হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি এ জেলায় নতুন এসেছি, এখনও পর্যন্ত সব কিছু দেখা হয়ে উঠেনি। তবে জেলার প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোকে একটা নিয়মের মধ্যে আনার ব্যাপারে ৯ সেপ্টেম্বর বিএমএ নেতৃবৃন্দ, প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোর মালিকদের নিয়ে বৈঠক করেছি। বৈঠকে প্রত্যেকটি ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিকসেন্টারকে তালিকা ঝুলানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান , প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোর নিবন্ধনের বিষয়টি আগে সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের আওতাধীন থাকলেও বর্তমানে তা ডিজি অফিস সেগুলোর অনুমোদন দেন।

তিনি আরো বলেন, সরকারী হাসপাতালগুলোতে লোকবল ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রোগিদের মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবায় প্রাইভেট হাসপাতালগুলো উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করে। কিন্তু স্বাস্থ্য সেবার নামে যদি অপচিকিৎসা করা হয় সেক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবেনা।

(এসএইচআর/এসএএম/ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮)