
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা : পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বন, জলার বন, পাহাড়, নদী, ঝরনা সব ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার বাংলাদেশ। কিন্তু তার পরও বিদেশী পর্যটক আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ, এসব এলাকায় কখনই গড়ে ওঠেনি অবকাঠামো। পর্যটন নীতিমালা, প্রচার-প্রচারণা বাজেট সব থাকলেও যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে দেশেই আবেদন হারাতে শুরু করেছে। উপরন্তু ঘুরতে গিয়ে প্রতারণা, ভোগান্তিসহ বাজে অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরছে মানুষ। ফলে বাড়ছে বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা। অমিত সম্ভাবনা নিয়েও ধুঁকছে দেশের পর্যটন শিল্প।
আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘পর্যটন শিল্পের বিকাশে তথ্যপ্রযুক্তি’। যদিও ২০১৫ সাল থেকে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা এবং ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করে তেমন ফল মেলেনি। দেশে ফেসবুক, ইউটিউবের জনপ্রিয় তুঙ্গে, তার পরও এ প্রচারণা উল্লেখ করার মতো কোনো সাড়া ফেলতে পারেনি। পর্যটন বোর্ডের সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট এবং ওয়েবসাইটও হালনাগাদ নয়। দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ, ক্যাম্পেইন ও গুটিকয়েক রোড শোতে শেষ হয়ে গেছে পর্যটন বর্ষ।
অন্যান্য অবকাঠামোর কথা বাদ দিলেও কক্সবাজারের সৈকতে এখনো পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। সৈকতে বেসরকারিভাবে কর্মরত লাইফ গার্ড সদস্যদের তথ্যানুযায়ী, গত এক যুগে সৈকতে ডুবে ৯৮ জন আর সেন্ট মার্টিনে ১৪ জন পর্যটক মারা গেছেন। কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার সৈকতের ১১১ কিলোমিটার এখনো সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
১৯৯৫ সালে এক কলেজছাত্র সৈকতে চোরাবালিতে পড়ে হারিয়ে যাওয়ার পর তার বাবা কক্সবাজারে গড়ে তোলেন ‘ইয়াছির লাইফ গার্ড স্টেশন’। গত ১৩ বছরে এ স্টেশনের ডুবুরিরা ৯৮ জন পর্যটকের মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন। জীবিত উদ্ধার করেছেন আরো অন্তত তিন হাজার পর্যটককে। ট্যুরিস্ট পুলিশ প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত এ উদ্যোগই ছিল ভরসা। ইয়াছির লাইফ গার্ড স্টেশনের পরিচালক মোস্তফা কামাল জানান, ১২০ কিলোমিটার সৈকতের মধ্যে মাত্র নয় কিলোমিটারে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও উদ্ধারের বিশেষ ব্যবস্থা থাকলেও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, টেকনাফ, ইনানী, হিমছড়িসহ ১১১ কিলোমিটার সৈকত এখনো সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
তবে কোনো সতর্কতা সাইনবোর্ড না থাকায় অত্যন্ত মৃত্যুকূপে পরিণত হচ্ছে সেন্ট মার্টিন। গত ১৫ বছরে স্রোতের টানে অন্তত ১৪ জন মারা গেছেন। অথচ এ প্রবাল দ্বীপে প্রতিদিন আট থেকে ১০ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করতে যান।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার সি-বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানান, সৈকতের দেড় হাজার ফুট এলাকাকে বিশেষ জাল দিয়ে ঘিরে নিরাপদ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না।
একই অবস্থা সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর। বিশেষ করে জাফলং, বিছনাকান্দি, জলার বন রাতারগুল, হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ন্যূনতম অবকাঠামোও নেই। শহর থেকে এসব স্পটে যাওয়ার রাস্তার অবস্থাও বেহাল। কোথাও নেই পর্যটকদের বিশ্রামের স্থান, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। এখনো গড়ে ওঠেনি আবাসন সুবিধাও। ফলে অনেক সম্ভাবনা জাগিয়েও ক্রমেই পর্যটক হারাচ্ছে সিলেট।
সিলেটে পর্যটকরা আপনা থেকেই আসেন, তাদের ধরে রাখার কোনো উদ্যোগ কর্তৃপক্ষের নেই বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সাবেক সদস্য ডা. জাকারিয়া আহমদ। তবে সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরী জামান বলেন, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ওয়াশ ব্লকসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার সড়কগুলোরও সংস্কারকাজ চলছে।
১৯৯২ সালের জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০১০ সালে যুগোপযোগী করে হালনাগাদ করা হলেও গত আট বছরে কোনো অংশই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বিশেষ করে নীতিমালার পঞ্চম অধ্যায়ে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পর্যটন আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ থাকলেও তা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। এছাড়া কক্সবাজার-টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও সোনা দ্বীপকে কেন্দ্র করে আদর্শ অবকাশ পর্যটন গন্তব্য গড়ে তোলার কথাও নীতিমালায় বলা আছে।
এদিকে অবকাঠামো সংকটে প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো জনপ্রিয়তা হারাতে থাকলেও সেসব স্থানেই গড়ে উঠছে বাণিজ্যিক রিসোর্ট। কিন্তু পর্যটন আইন না থাকার কারণে রিসোর্ট, হোটেল, ট্যুর অপারেটরগুলোকে নিয়ম এবং জবাবদিহিতার মধ্যে আনা যাচ্ছে না। যথেচ্ছ হোটেল-রিসোর্ট করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পার্বত্যাঞ্চল। তাছাড়া বিদেশী পর্যটক প্রতারণার শিকার হলে সাধারণ ফৌজদারি মামলা করতে হয়। ফলে দ্রুততম সময়ে বিচার পাওয়া সম্ভব হয় না। তাছাড়া কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে অফ সিজনে কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়। তাদের সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। পর্যটন ব্যবসাগুলো গড়ে উঠছে সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে। নৌ-পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলে কোনো বিধি-বিধান নেই।
এছাড়া ২০১০ সালে পর্যটন শিল্প এবং সেবার মান উন্নয়ন, পরিচালনা ও বিকাশে প্রণীত পর্যটন বোর্ড আইনের বাস্তবায়নও চলছে শম্বুক গতিতে। বোর্ডের কার্যাবলির ১৫ নম্বর ধারায় ‘পর্যটন-সংক্রান্ত ডাটাবেজ তৈরি’ কথা বলা আছে। অথচ দেশে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটন খাতকে থ্রাস্ট সেক্টর (অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত) বলা হলেও এর উন্নয়নে যথাযথ থ্রাস্ট দেয়া হয়নি। সম্প্রতি ট্যুরিস্ট পুলিশসহ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি। নিরাপত্তা ইস্যুটিও পর্যটকদের কাছে অস্পষ্ট।
(এএইচএন / ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ )