Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়
Saturday, 18 Jul 2026 14:26
Biniyougbarta | বিনিয়োগবার্তা: ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগের খবর প্রতিদিন সবসময়

এ বি সিদ্দিক: খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গত কয়েক বছর ধরে বিপদ সংকেত বাজিয়ে যাওয়া বিষয়। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন খাতের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন এর বিপরীতে ব্যাংক খাতে উল্লেখযোগ্য অবনতির দাগ প্রকাশ করছে এই খেলাপি ঋণ। সরকারের অন্যান্য সাফল্যকে সবচেয়ে বেশি ঢেকে দিচ্ছে ব্যাংকিং খাতের এই কালো দাগ। খেলাপি ঋণের এই প্রভাব সুদূর প্রসারি। যদি শক্ত হাতে একে মোকাবেলা না করা হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধ্বসের কারণ হতে পারে ব্যাংকিং খাতের এই কালো ছায়া।

গত ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮০ হাজার কোটি টাকার উপরে, যা বছর শেষে কমে ৭৪ হাজার কোটি টাকার মতো হয়। এই কমানো সংখ্যা নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে। যাহোক যদি এই সংখ্যাও সঠিক হয় তাহলেও ২০১৮ সালের মার্চ শেষে আগের থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে ৮৯ হাজার কোটি হয়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যা মোট ঋণের ১০.৭৪ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের কারণে গোটা অর্থনীতি আসলে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়লেও, ঋণ গ্রহীতার যে কোন বিপদ নেই তা ভাবার কোন কারণ নেই। আখেরে ঋণগ্রহীতার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি ভাবা যেতে পারে। তবে তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। বর্তমান অবস্থা যদি চলতেই থাকে তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের জন্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে আমার মনে হয় না। ঋণখেলাপিরা যদি আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে সুবিধাভোগী দল বনে যায় তাহলে সাধারণ ভালো ব্যবসায়ী যারা ঋণের সঠিক ব্যবহার করে এবং নিয়মিত পরিশোধ করে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝামেলার শিকার হন। কারণ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সাবধানতা বা শুদ্ধাচার তাদের উপর চালানো হয়। অনেক সময় ভালো ব্যবসায়ী এমনকি ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।

এখন এই খেলাপি ঋণের বোঝা কিভাবে মাথা থেকে নামানো যেতে পারে তার পথ বের করা জরুরি। ঋণ দেওয়ার আগে ভালো করে যাচাই করতে হবে, ঋণের টাকা সঠিক পথে ব্যবহার হয় কিনা তা নিয়মিত নজরে রাখতে হবে, নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে ইত্যাদি পরামর্শ খুব কমন এবং এগুলো বর্তমানে খেলাপি ঋণের চেয়ে ভবিষ্যৎ খেলাপি হতে পারে এমন ঋণের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। তাহলে বর্তমানে যেগুলো খেলাপি সেক্ষেত্রে কি করা যেতে পারে। অনেক কিছুই করা যেতে পারে তবে তার বেশিরভাগই রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করে, কিছু কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে, কিছু ক্ষেত্রে কঠোর হয়ে আবার কিছু ক্ষেত্রে নরম হয়ে রাষ্ট্র তথা সরকার এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ বেছে নিতে পারে। এমন কিছু পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যার সবগুলো অথবা কিছু সংখ্যককে সংকট উত্তরণের পথ হিসেবে যাচাই বাছাই করা যেতে পারে।

প্রথমতঃ এখনই, সম্ভব হলে আজকেই আইন প্রণয়ন করা, যাতে করে খেলাপি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেকে খেলাপি না দেখানোর জন্য আদালতের স্থগিতাদেশ নিতে না পারে। বর্তমানে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল আদালতের স্থগিতাদেশ। বর্তমানে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের CIB তে রিপোর্ট করে। ফলে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সকলের কাছে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়। আর খেলাপি কোন ব্যক্তি নতুন ঋণ পাবে না, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না এমন আরও কিছু ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হয়। ফলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য খেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মহামান্য আদালত থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্থগিতাদেশ নিয়ে থাকেন যাতে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি না দেখানোর আদেশ দেওয়া হয়ে থাকে। এই অবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন চলতে থাকে এবং এই সুযোগে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নতুন ঋণ নিতে পারেন, নির্বাচন করতে পারেন এবং অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা থেকে বেরিয়ে আসেন। তাছাড়া বন্ধকীকৃত সম্পত্তি নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করতে গেলেও আদালতের স্থগিতাদেশ বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একটি উদাহরণ দেওয়া যাকঃ ধরা যাক মেসার্স ভাই বোন এন্টারপ্রাইজ ঋণখেলাপি। ব্যাংক ঐ ঋণ আদায় করার জন্য বন্ধকীকৃত সম্পত্তি নিলাম দিল। মোট ঋণের পরিমাণ ধরলাম ৫ কোটি টাকা এবং অন্য কোন প্রতিষ্ঠান ধরলাম মেসার্স টু স্টার লিমিটেড ৫ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা উল্লেখ করে নিলামে অংশগ্রহণ করল এবং সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হল। এখন কাজটি খুব সহজ কারণ ব্যাংক মেসার্স টু স্টার লিমিটেডকে বন্ধকীকৃত সম্পত্তি দিয়ে দিবে ৫ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে। ব্যাস, সমস্ত ঋণ আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু মাঝপথে সব সুর পাল্টে গেল। মেসার্স ভাই বোন এন্টারপ্রাইজ এর একজন পার্টনার আদালতে আবেদন করল সমস্ত নিলাম প্রক্রিয়া স্থগিত করার জন্য এবং ছয় মাসের জন্য তা স্থগিতের আদেশ দিলেন মহামান্য আদালত। ব্যাংক ঐ আদেশ বাতিল করার জন্য আবেদন করল। শুরু হলো আইনি লড়াই। দুই বা আড়াই বছর পর ওই আদেশ বাতিল হল। ফলে ব্যাংক এখন মেসার্স টু স্টার লিমিটেডকে সম্পত্তি লিখে দিতে পারে ৫ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে। কিন্তু সমস্যা হলো এই দীর্ঘ সময়ে লোন ৫ কোটি থেকে বেড়ে হয়ত ৭ কোটি টাকা হয়ে গেছে। এখন সম্পত্তি মেসার্স টু স্টার এর কাছে বিক্রি করে সমস্ত লোন শেষ হচ্ছে না কিন্তু আর কোন বন্ধকীকৃত সম্পত্তি থাকছে না। ফলে ব্যাংক নিলামে দেওয়া সম্পত্তি নিয়েও দোটানায় পড়ে যাচ্ছে। গত ৮ জুলাই ২০১৮ তারিখে একটি দৈনিক পত্রিকার সূত্র মতে বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২ লক্ষ ৮১ হাজার টি মামলার বিপরীতে ঝুলে আছে ১ লক্ষ ৫৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই রায়ের পর আদালতের স্থগিতাদেশ নেওয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরাই আদালতের স্থগিতাদেশ নেয় এবং দিনের পর দিন তা ঝুলিয়ে রাখে।

দ্বিতীয়তঃ খেলাপি ব্যক্তির এমনকি যদি আদালতে স্থগিতাদেশও থাকে খেলাপি না বলার জন্য বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে। যেকোনো এয়ারলাইসেন্স এর টিকেট বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে খেলাপি ব্যক্তির নামে।

তৃতীয়তঃ ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যক্তিগত গাড়ি থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে। যে খেলাপি যার টাকা নেই ঋণ পরিশোধের তার গাড়ি থাকবে কেন? বর্তমানে যেগুলো থাকবে সেগুলো পরবর্তী বছরের ফিটনেস দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে।

এছাড়া আরো যেসব বিষয়ে ভাবা যেতে পারে তা হলো খেলাপি ব্যক্তিরা সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে কেবিন পাবেনা, সাধারণ ওয়ার্ডে যেয়ে তাদের চিকিৎসা নিতে হবে, খেলাপি হওয়ার সাথে সাথে সকল ক্লাবের সদস্যপদ হারাবে, ঋণখেলাপি ব্যক্তি বাসায় এসি ব্যবহার করতে পারবে না, খেলাপি ব্যক্তি এবং তার স্বামী/স্ত্রী সন্তানদের নামে কোন সম্পত্তি ক্রয় করা যাবে না, খেলাপি ব্যক্তি নিজের বা সন্তানের বিয়েতে বা কোনো অনুষ্ঠানে প্রসিদ্ধ কোন কমিউনিটি সেন্টার; যেমন সেনাকুঞ্জ, দরবার হল, অফিসাস ক্লাব বা এই ধরনের অন্যান্য ভাড়া নিতে পারবে না। এমন আরো কিছু বিষয় ভাবা যেতে পারে যাতে করে খেলাপি ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা যায়। যেমন বাসায় ডিসসংযোগকারী ছেলেটি এসে বলবে স্যার/ম্যাডাম যেহেতু আপনি ঋণখেলাপি হয়ে গেছেন তাই আপনার বাসায় ডিস লাইন নিতে হলে সিটি কর্পোরেশনের কমিশনার বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি লাগবে, সিনেমা হল বা পার্কে গেলে অথরিটি বলবে বিশেষ অনুমতি লাগবে, নামকরা কোন স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তান ভর্তি হতে গেলে বিশেষ অনুমতি লাগবে ইত্যাদি। এতে করে ঋণখেলাপি ব্যক্তি ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক ভাবে প্রচন্ড চাপের মুখে পড়বে।

যেহেতু ধারণা করা হচ্ছে বর্তমান খেলাপিদের একটি বড় অংশই ইচ্ছাকৃত খেলাপি যারা ব্যাংকের টাকা লোপাট করার উদ্দেশ্যেই ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছে ফলে এইসব পদক্ষেপগুলো থেকে যাচাই বাছাই করে কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ নিলে হয়ত খুব দ্রুতই খেলাপি ঋণের অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাবে এবং ভবিষ্যতেও এর পরিমাণ কমে আসবে।

লেখক: এ বি সিদ্দিক, ব্যাংকার

(বিনিয়োগবার্তা, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮)